মানুষ কি সত্যিই মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করে

মানবদেহের সবচেয়ে জটিল অঙ্গ হলো মস্তিষ্ক। অনেকেই মনে করেন, মানুষ নাকি তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ প্রায় পুরো মস্তিষ্কই ব্যবহার করে, এমনকি ঘুমের সময়ও মস্তিষ্কের অনেক অংশ সক্রিয় থাকে।
মস্তিষ্ক আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি, আচরণ ও চারপাশের পৃথিবীকে বোঝার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় ৩ পাউন্ড ওজনের এই অঙ্গটিতে রয়েছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন, যা শরীরের বিভিন্ন অংশে তথ্য আদান-প্রদান করে।
মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহারের ধারণা কোথা থেকে এলো
২০১৩ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৬৫ শতাংশ আমেরিকান বিশ্বাস করেন মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করে। তবে স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ব্যারি গর্ডনের মতে, মস্তিষ্কের বেশির ভাগ অংশ প্রায় সব সময়ই কাজ করে।
ফাংশনাল এমআরআই বা এফএমআরআই নামের এক ধরনের স্ক্যানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, মানুষ যখন খুব সাধারণ কোনো কাজও করে, তখন মস্তিষ্কের অনেক অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি বিশ্রাম বা ঘুমের সময়ও মস্তিষ্ক পুরোপুরি বন্ধ থাকে না।
গবেষকদের ধারণা, ১০ শতাংশের এই ভুল ধারণার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ১৯০৭ সালে মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেমস লিখেছিলেন, মানুষ তার মানসিক সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগাতে পারে না। পরে এই কথাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। এ ছাড়া একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ কোষ নিউরন। সেটিও এই মিথ ছড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
মস্তিষ্ককে কীভাবে সুস্থ রাখা যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের অন্য অঙ্গের মতো মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যও নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও ব্যায়ামের ওপর।
সুষম খাবার খাওয়া: স্বাস্থ্যকর খাবার মস্তিষ্ক ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে কিছু খাবার মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সহায়ক।
গাঢ় রঙের ফল ও সবজি: পালং শাক, ব্রকলি, ব্লুবেরি, লাল ক্যাপসিকাম ও মিষ্টি আলুতে থাকা ভিটামিন ই ও বিটা ক্যারোটিন মস্তিষ্কের জন্য উপকারী।
তৈলাক্ত মাছ: ফ্যাট বা তেলযুক্ত মাছে থাকা ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড স্মৃতিশক্তি ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
বাদাম: আখরোট ও পেকানে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মস্তিষ্কের কোষ রক্ষা করতে সাহায্য করে।
নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা হালকা ব্যায়াম মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়ায় এবং স্মৃতিশক্তি ভালো রাখতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের পরামর্শ দেন।
মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা
নতুন কিছু শেখা, বই পড়া, ধাঁধা সমাধান, স্মৃতির খেলা বা ভাষা শেখার মতো কাজ মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ব্রেইন ট্রেনিং করলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
মস্তিষ্ক নিয়ে আরও কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা
ডান মস্তিষ্ক আর বাম মস্তিষ্ক
অনেকে মনে করেন, কেউ ডান মস্তিষ্কপ্রধান হলে সে বেশি সৃজনশীল, আর বাম মস্তিষ্কপ্রধান হলে বেশি যুক্তিবাদী। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ মানুষের মস্তিষ্কের দুই অংশই একসঙ্গে কাজ করে। যদিও ভাষা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে দুই অংশের কিছু ভিন্ন ভূমিকা রয়েছে।
অ্যালকোহল কি মস্তিষ্কের কোষ মেরে ফেলে
দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান করলে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে অ্যালকোহল সরাসরি মস্তিষ্কের কোষ মেরে ফেলে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। এর প্রভাব জটিল এবং ধীরে ধীরে ঘটে।
ঘুমের মধ্যে নতুন কিছু শেখা যায়
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের সময় আগে শেখা তথ্য মনে রাখতে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে। তবে নতুন কোনো বিষয় পুরোপুরি শেখা সম্ভব নয়।
নতুন কিছু শিখলে কি মস্তিষ্কে নতুন ভাঁজ পড়ে?
মস্তিষ্কের ভাঁজ বা রিঙ্কল জন্মের আগেই তৈরি হতে শুরু করে। নতুন কিছু শেখার কারণে নতুন ভাঁজ তৈরি হয় না। তবে মস্তিষ্ক সারাজীবন নতুন সংযোগ তৈরি করতে থাকে।
মস্তিষ্ক নিয়ে কিছু মজার তথ্য
- মানুষের শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২ শতাংশ মস্তিষ্কের ওজন হলেও এটি শরীরের প্রায় ২০ শতাংশ অক্সিজেন ও ক্যালরি ব্যবহার করে।
- মস্তিষ্কের প্রায় ৭৩ শতাংশই পানি। সামান্য পানিশূন্যতাও মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
- শরীরের মোট কোলেস্টেরলের প্রায় ২৫ শতাংশ মস্তিষ্কে থাকে। কোলেস্টেরল ছাড়া মস্তিষ্কের কোষ ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
বিজ্ঞানীরা এখনও মস্তিষ্ক নিয়ে নতুন নতুন তথ্য জানার চেষ্টা করছেন। তবে একটি বিষয় এখন নিশ্চিত, মানুষ তার মস্তিষ্কের মাত্র ১০ শতাংশ নয়, বরং প্রায় পুরো মস্তিষ্কই ব্যবহার করে। তাই মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখতে প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চর্চা।
সূত্র: মেডিক্যাল নেউজ টুডে


