শীতকালে মানসিক আচরণ কেন বদলে যায়, কী বলছে গবেষণা

শীতকাল মানে কারও কাছে পিঠাপুলি খাওয়া, ঘোরাঘুরি আর উৎসবের আমেজ। আবার কারও জন্য শীত মানেই বিষণ্ণতা আর ক্লান্তি। এ সময়ে অনেকেরই কাজে আগ্রহ কমে যায়, সারাদিন ঘুমঘুম ভাব থাকে, অকারণেই মন খারাপ লাগে। পছন্দের কাজ করতেও ভালো লাগে না। শীতকালে মানুষের মন-মেজাজ আর আচরণে এরকম বেশ কিছু পরিবর্তন আসে।
গবেষণা বলছে, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মেজাজ ও আচরণের সম্পর্ক আছে। দিনের আলো কমে যাওয়া, শরীরের জৈবিক পরিবর্তন আর সামাজিক অভ্যাস অনেক সময় এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।
বিভিন্ন গবেষণায় শীতকালে মানুষের মানসিক অবস্থা, ঘুম, খাওয়াদাওয়া, মনোযোগ ও সামাজিক আচরণে পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে।
শীতকালে কেন মন খারাপ হয়?
শীতকালে দিনের দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ায় মানুষ অনেক সময় সূর্যের আলো কম পায়। এর প্রভাব পড়তে পারে আপনার মানসিক অবস্থাতেও। এছাড়া ঘুমের চক্রকেও এটি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সেরোটোনিন নামের একটি রাসায়নিক পদার্থ মানুষের মেজাজ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আলো কম পাওয়ার সঙ্গে এর কার্যক্রমের পরিবর্তনের সম্পর্ক আছে। এর ফলেই কিছু মানুষের মধ্যে বিষণ্ণতা, ক্লান্তি, অলসতা ও কাজে অনীহা বাড়তে পারে।
তবে সবার ক্ষেত্রে শীতের প্রভাব এক রকম হয় না। কারও সামান্য মন খারাপ হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে সমস্যা গুরুতর আকার নিতে পারে।
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার কী?
সিজনাল অ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডার বা এসএডি হলো এক ধরনের ঋতুভিত্তিক বিষণ্ণতা। নির্দিষ্ট ঋতুতে মানুষের মধ্যে এর প্রভাব দেখা দেয়। সাধারণত শরৎ বা শীতের শেষ দিকে এর লক্ষণ শুরু হয়। বসন্ত বা গ্রীষ্মে কমে আসে।
এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
- দীর্ঘ সময় মন খারাপ থাকা
- স্বাভাবিক কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অলসতা
- বেশি ঘুম পাওয়া
- বেশি খাওয়ার প্রবণতা ও ওজন বেড়ে যাওয়া
- পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া
- মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা হওয়া
তবে শীতকালে মাত্র কয়েক দিন মন খারাপ থাকলেই সেটিকে এসএডি বলা যায় না। এসব লক্ষণ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় আর দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শীতকালে কি বেশি ঘুম পায়?
শীতকালে অনেকেরই সকালবেলা বিছানা ছেড়ে উঠতে কষ্ট হয়। দিনের দৈর্ঘ্য কম হওয়ায় অনেক সময় এমন হয়ে থাকে।
মেলাটোনিন হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। আলো ও অন্ধকারের পরিবর্তনের সঙ্গে এই হরমোনের কার্যক্রমের সম্পর্ক আছে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে শীতের সময় এই কার্যক্রমে পরিবর্তন হলে এটি ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া সব সময় স্বাভাবিক কোনো বিষয় নাও হতে পারে। এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা মন খারাপ থাকলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
শীতকালে ওজন বেড়ে যায় কেন?
শীতকালে অনেকেরই খাবারের প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। অন্যদিকে শারীরিক পরিশ্রম ও চলাফেরা কমে যেতে পারে। ফলে ওজন বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণা অনুযায়ী, বছরের শেষ দিকে শীতকালীন ছুটির মৌসুমে খাবারের ধরন ও পরিমাণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এই কারণেও অনেকের ওজন বাড়ে। বিভিন্ন গবেষণায়, ছুটির মৌসুমে গড়ে প্রায় ০.৫ থেকে ১.৩ কেজি ওজন বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ব্যক্তিভেদে এই পরিবর্তন ভিন্ন হতে পারে।
শীতকালে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত হাঁটাচলা করা, শরীরচর্চা ও সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি।
শীতকালে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখবেন যেভাবে
শীতের সময় মন-মেজাজ, ঘুম ও দৈনন্দিন কাজের আগ্রহ ঠিক রাখতে কয়েকটি অভ্যাস সাহায্য করতে পারে।
প্রতিদিন কিছু সময় দিনের আলোতে থাকুন: সম্ভব হলে দিনের বেলায় বাইরে হাঁটুন বা সূর্যের আলো পাওয়া যায় এমন স্থানে সময় কাটান।
নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: হাঁটা, হালকা ব্যায়াম বা ঘরে শরীরচর্চা শারীরিক সক্রিয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
ঘুমের নির্দিষ্ট সময় ঠিক রাখুন: প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমানো ও ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করুন।
সুষম খাবার খান: অতিরিক্ত মিষ্টি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বদলে শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার বেছে নিন।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন: মন খারাপ থাকলে নিজেকে পুরোপুরি একা করে ফেলবেন না। কাছের মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর চেষ্টা করুন।
প্রয়োজনে চিকিৎসকের সাহায্য নিন: দীর্ঘদিন বিষণ্ণতা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি থাকলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ শুরু করা উচিত না।
শীতের প্রভাব সবার ক্ষেত্রে এক না
একই গবেষণায় দেখা যায়, মানুষও অন্যান্য প্রাণীর মতো ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। শীতকালে কারও ঘুম ও খাওয়ার পরিমাণ বাড়তে পারে, কারও মেজাজ খারাপ হতে পারে, আবার কিছু পরিস্থিতিতে মনোযোগেও পরিবর্তন দেখা যায়।
তবে এসব পরিবর্তনের পেছনে আবহাওয়া ছাড়াও শরীরের জৈবিক প্রক্রিয়া, ব্যক্তিগত অভ্যাস ও সামাজিক পরিবেশও ভূমিকা রাখে। তাই শীতকালে নিজের মেজাজ ও আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করলে তা বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ত্বকের যত্নে নতুন রুটিন
শীতের শুষ্ক বাতাসে আমাদের ত্বক খসখসে ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে। বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, যা ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ভারী ক্রিমের পরিবর্তে ত্বকের জন্য তখন হালকা ময়েশ্চারাইজার দরকার হয়। এসময় ত্বক আরও কোমল মনে হয় আর টানটান ভাবও কমে যেতে পারে।
তবে আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে অনেকের ত্বকে কিছুটা সংবেদনশীলতা বা র্যাশের সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই ত্বকের প্রতি একটু যত্নশীল থাকা দরকার।
অ্যালার্জির সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে
যাদের একটু অ্যালার্জি আছে, তাদের জন্য বসন্তকাল বেশ ঝামেলার হতে পারে। এসময় গাছপালা, ঘাস এবং ফুল থেকে পরাগরেণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঘন ঘন হাঁচি, নাক বন্ধ থাকা, চোখ চুলকানো বা সর্দি-কাশির মতো সমস্যা দেখা দেয়। ঋতু বদল অনেক সময় আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও কিছুটা চাপ সৃষ্টি করে।
শরীরকে সুস্থ রাখতে আপনার করণীয় কী?
ঋতু বদলের এই সময়ে শরীরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা খুব কঠিন কিছু না। একটু সচেতন হলেই নিজেকে সুস্থ ও সতেজ রাখা সম্ভব।
খোলা বাতাসে সময় কাটান: সকালের মিষ্টি রোদে কিছুটা সময় হাঁটাহাঁটি করুন। এটি আপনার ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি মন ভালো রাখতে বেশ ভালো কাজ করবে।
হাইড্রেটেড থাকুন: শীতের তুলনায় বসন্তে পানির চাহিদা বাড়ে। তাই সারাদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি, ডাবের পানি বা ফলের রস পন করতে পারেন।
ফ্রেশ ও পুষ্টিকর খাবার খান: শীতের ভারী খাবার বাদ দিয়ে পাতে রাখুন তাজা শাকসবজি, ফলমূল এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার। এটি আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করবে।
অ্যালার্জি থেকে সাবধানে থাকুন: যাদের পরাগরেণু বা ধুলোবালিতে অ্যালার্জি আছে, তারা বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। ঘরের জানালা বন্ধ রেখেও কিছুটা রক্ষা পাওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম: ঘর থেকে বেরিয়ে একটু হালকা এক্সারসাইজ বা সাইক্লিং শুরু করতে পারেন। এটি মেটাবলিজম বাড়িয়ে শরীরকে চাঙা রাখবে।
শীতের জড়তা কাটিয়ে বসন্ত আমাদের জীবনে যেমন নতুন রঙের ছোঁয়া আনে। এর পাশাপাশি আমাদের শরীরকেও মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেয়। নিজের শরীরের ছোটোখাটো পরিবর্তনের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতিদিনের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকানে ‘How Winter Affects Our Mood and Behavior’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সাবিহা তাবাসসুম।


