logo

রাজপ্রাসাদের পর্দার আড়ালে ছিল ক্ষমতার আরেক দুনিয়া

রাজপ্রাসাদের পর্দার আড়ালে ছিল ক্ষমতার আরেক দুনিয়া
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

ইতিহাসের পাতায় বাংলার নবাবদের নাম আমরা অনেক শুনেছি। মুর্শিদ কুলি খান, আলীবর্দী খান, সিরাজউদ্দৌলা, মীর জাফর - তাদের যুদ্ধ, রাজনীতি, ক্ষমতার লড়াই কিংবা পলাশীর প্রান্তরের গল্পও কমবেশি সবার জানা।

কিন্তু এই ইতিহাসের আরেকটি দিকও আছে।

নবাবদের প্রাসাদের অন্দরমহলে, পর্দার আড়ালে বসবাস করতেন এমন কিছু নারী, যাদের হাতে সরাসরি কোনো সেনাবাহিনী ছিল না, প্রকাশ্যে দরবারও করতেন না। অথচ রাজপরিবার, সম্পদ, উত্তরাধিকার এবং রাজনীতির নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের প্রভাব ছিল। ইতিহাসে তারা পরিচিত বাংলার বেগম নামে।

অষ্টাদশ শতকের মুর্শিদাবাদের রাজদরবারে ‘বেগম’ শব্দটি শুধু নবাবের স্ত্রীকে বোঝাত না। নবাবের মা, প্রধান স্ত্রী, কন্যা ও রাজপরিবারের প্রভাবশালী নারীরাও বিশেষ মর্যাদা ও সম্পদের অধিকারী ছিলেন। অনেকের নিজস্ব ভাতা, জমি, সম্পত্তি ও কর্মচারী ছিল। কেউ কেউ মসজিদ, মাদ্রাসা ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তাই তাদের জীবন শুধু বিলাসিতার গল্প ছিল না। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল উত্তরাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পদের হিসাব ও ক্ষমতার রাজনীতি।

মুর্শিদাবাদে গড়ে উঠেছিল নতুন রাজদরবার

আঠারো শতকের শুরুতে বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরে যায়। ১৭১৭ সালে মুর্শিদ কুলি খান বাংলার সুবাদার হন এবং মুর্শিদাবাদকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে বাংলার নবাবরা বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা প্রায় স্বায়ত্তশাসিতভাবে পরিচালনা করতেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় ছিল।

মুর্শিদাবাদের প্রাসাদে তখন গড়ে উঠছিল বিশাল এক রাজপরিবার। পুরুষদের সামনে ছিল দরবার, প্রশাসন ও যুদ্ধ। নারীদের জন্য ছিল অন্দরমহল বা জেনানা।

তবে অন্দরমহল মানেই ক্ষমতাহীন জায়গা ছিল না। নবাবের মা ও প্রধান স্ত্রী ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নারীদের মধ্যে। তাদের নিয়মিত ভাতা, উপহার ও সম্পত্তি দেওয়া হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরগনাও দেওয়া হতো। নিজেদের সম্পদ ও অন্দরমহলের ব্যবস্থাপনায় তাদের অধীনে বিভিন্ন কর্মচারী থাকতেন।

অর্থাৎ পর্দার আড়ালে থেকেও প্রভাবশালী নারীরা নিজেদের সম্পদ ও অন্দরমহল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।

নাসিরি বানু বেগম: প্রাসাদের ভেতর থেকে জনকল্যাণ

মুর্শিদ কুলি খানের স্ত্রী নাসিরি বানু বেগম ছিলেন রাজপরিবারের উল্লেখযোগ্য নারীদের একজন। ধর্মীয় শিক্ষা, স্থাপত্য ও জনকল্যাণমূলক কাজেও তার ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।

চৌকবাজারে তার উদ্যোগে একটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল, যার সঙ্গে মাদ্রাসাও ছিল। এসব স্থাপনা দেখায়, বেগমদের সম্পদ শুধু প্রাসাদের বিলাসিতায় ব্যয় হতো না; ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কাজেও তা ব্যবহৃত হতো।

মুর্শিদ কুলি খানের স্ত্রী নাসিরি বানু বেগম, যিনি তার ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি একজন স্থপতির সাথে বসে চকবাজারের তার সেই ঐতিহাসিক মসজিদের নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পনা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যালোচনা করছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি
মুর্শিদ কুলি খানের স্ত্রী নাসিরি বানু বেগম, যিনি তার ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য পরিচিত ছিলেন। তিনি একজন স্থপতির সাথে বসে চকবাজারের তার সেই ঐতিহাসিক মসজিদের নকশা ও নির্মাণ পরিকল্পনা অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পর্যালোচনা করছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

তবে তাদের প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল সম্পদ। বিপুল সম্পদের ব্যবস্থাপনা তাদের রাজপরিবারের ভেতরে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছিল।

জিনাত-উন-নিসা বেগম: পর্দার আড়ালের রাজনীতি

মুর্শিদ কুলি খানের কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগম ছিলেন শিক্ষিত, ধর্মপরায়ণ ও দানশীল। তার ছেলে সরফরাজ খান পরবর্তী সময়ে বাংলার নবাব হন এবং ১৭৪০ সালে গিরিয়ার যুদ্ধে আলীবর্দী খানের কাছে পরাজিত ও নিহত হন।

মুর্শিদ কুলি খানের বিদুষী ও ধর্মপ্রাণ কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগমকে তার প্রাসাদের পাঠাগারে দেখা যাচ্ছে। তিনি তার পুত্র (ভবিষ্যতের নবাব সরফরাজ খান)-কে পড়াশোনায় সাহায্য করছেন, পাশেই একজন দরবারি পণ্ডিত বা গৃহশিক্ষক বসে আছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি
মুর্শিদ কুলি খানের বিদুষী ও ধর্মপ্রাণ কন্যা জিনাত-উন-নিসা বেগমকে তার প্রাসাদের পাঠাগারে দেখা যাচ্ছে। তিনি তার পুত্র (ভবিষ্যতের নবাব সরফরাজ খান)-কে পড়াশোনায় সাহায্য করছেন, পাশেই একজন দরবারি পণ্ডিত বা গৃহশিক্ষক বসে আছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

ছেলের মৃত্যুর পরও জিনাত-উন-নিসার রাজপরিবারে প্রভাবের উল্লেখ পাওয়া যায়। তিনি মসজিদ ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন এবং দরিদ্রদের সহায়তা করতেন। আজিমনগরে তার নির্মিত ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথাও জানা যায়।

তার জীবন দেখায়, মুর্শিদাবাদের বেগমদের ভূমিকা শুধু রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডেও তারা সক্রিয় ছিলেন।

ঘসেটি বেগম: রাজনীতির আলোচিত নারী

বাংলার নবাবি ইতিহাসে ঘসেটি বেগমের নাম অত্যন্ত আলোচিত। তার আসল নাম মেহের-উন-নিসা বেগম। তিনি ছিলেন আলীবর্দী খানের বড় মেয়ে। তার বিয়ে হয় নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের সঙ্গে, যিনি ঢাকার নায়েব নাজিম ছিলেন। ঘসেটি বেগম ছিলেন বিপুল সম্পদের অধিকারী।

তার নিজের কোনো সন্তান ছিল না। স্বামী নওয়াজিশ মুহম্মদ খানের সঙ্গে তারা ইকরাম-উদ-দৌলাকে দত্তক নিয়েছিলেন। ফলে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর সিংহাসনের উত্তরাধিকার প্রশ্নে তার ব্যক্তিগত স্বার্থও জড়িয়ে ছিল।

নবাব আলীবর্দী খানের বড় মেয়ে এবং বাংলার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী নারী ঘসেটি বেগমকে এখানে তার বিলাসবহুল মতিঝিল প্রাসাদে দেখা যাচ্ছে। বিপুল ধনসম্পদ ও স্বর্ণমুদ্রার সিন্দুকের পাশে বসে তিনি তার এক বিশ্বস্ত রাজনৈতিক পরামর্শদাতার সাথে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র বা রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি
নবাব আলীবর্দী খানের বড় মেয়ে এবং বাংলার ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও প্রভাবশালী নারী ঘসেটি বেগমকে এখানে তার বিলাসবহুল মতিঝিল প্রাসাদে দেখা যাচ্ছে। বিপুল ধনসম্পদ ও স্বর্ণমুদ্রার সিন্দুকের পাশে বসে তিনি তার এক বিশ্বস্ত রাজনৈতিক পরামর্শদাতার সাথে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র বা রণকৌশল নিয়ে আলোচনা করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তার নাতি সিরাজউদ্দৌলা নবাব হন। কিন্তু রাজপরিবারের সবাই তার পক্ষে ছিলেন না। ঐতিহাসিক বর্ণনায় ঘসেটি বেগমের সিরাজবিরোধী অবস্থান ও বিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগের কথা পাওয়া যায়।

তার বিপুল সম্পদ ও রাজপরিবারের অবস্থান তাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছিল। তবে ঘসেটি বেগমকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে নানা গল্প, অভিযোগ ও নাটকীয় বর্ণনাও যুক্ত হয়েছে। তাই নিশ্চিত প্রমাণিত ঘটনা ও পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনাকে আলাদা করে দেখা জরুরি।

লুৎফুন্নিসা বেগম: সিরাজের পাশে থাকা নারী

ঘসেটি বেগমের বিপরীতে ছিলেন লুৎফুন্নিসা বেগম, সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর সিরাজ পালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েন ও নিহত হন। তার পতনের সঙ্গে বাংলার নবাবি শাসনের রাজনৈতিক স্বাধীনতাতেও বড় পরিবর্তন আসে।

পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর তার স্ত্রী লুৎফুন্নিসা বেগমের বন্দিত্ব ও বিষাদময় জীবনের করুণ চিত্র এটি। বন্দিশালার একটি অন্ধকার কক্ষে জরাজীর্ণ সিন্দুকের পাশে বসে তিনি নবাবের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন, পাশে তার কন্যা ও এক সেবিকা বসে আছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি
পলাশীর যুদ্ধের পর নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর তার স্ত্রী লুৎফুন্নিসা বেগমের বন্দিত্ব ও বিষাদময় জীবনের করুণ চিত্র এটি। বন্দিশালার একটি অন্ধকার কক্ষে জরাজীর্ণ সিন্দুকের পাশে বসে তিনি নবাবের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন, পাশে তার কন্যা ও এক সেবিকা বসে আছেন।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

লুৎফুন্নিসা বেগমের পরবর্তী জীবন জড়িয়ে পড়ে বন্দিত্ব, অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে। তিনি ছিলেন পরাজিত নবাবের স্ত্রী এবং এমন এক রাজপরিবারের সদস্য, যার রাজনৈতিক ক্ষমতা অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল।

মন্নি বেগম: নর্তকী থেকে নবাবের প্রধান বেগম

বাংলার বেগমদের ইতিহাসে মন্নি বেগম অন্যতম আলোচিত চরিত্র। তার জন্ম হয়েছিল বর্তমান উত্তর প্রদেশের এলাকায়। অল্প বয়সে তিনি নাচের দলে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন রাজদরবারে নৃত্য পরিবেশন করতেন। পরে মুর্শিদাবাদে এসে তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

তিনি মীর জাফরের নজরে পড়েন এবং পরে তার স্ত্রী হন। পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফর বাংলার নবাব হলে মন্নি বেগমও রাজপরিবারের অন্যতম প্রভাবশালী নারী হয়ে ওঠেন।

মীর জাফরের এই প্রভাবশালী বেগম, যিনি নর্তকী থেকে নবাবের প্রধান বেগম এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশদের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠেছিলেন। এখানে বয়স্কা ও ক্ষমতাশালী মন্নি বেগমকে রাজকীয় দরবারে বসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি
মীর জাফরের এই প্রভাবশালী বেগম, যিনি নর্তকী থেকে নবাবের প্রধান বেগম এবং পরবর্তীতে ব্রিটিশদের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠেছিলেন। এখানে বয়স্কা ও ক্ষমতাশালী মন্নি বেগমকে রাজকীয় দরবারে বসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে কূটনৈতিক আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে।। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি ছবি

মীর জাফরের মৃত্যুর পরও তার প্রভাব কমেনি। সন্তানদের উত্তরাধিকার ও রাজপরিবারের সম্পত্তির কারণে তার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও বাড়ে। রাজপরিবারের অর্থ, কর্মচারী ও অন্দরমহলের ব্যবস্থাপনাতেও তিনি প্রভাবশালী ছিলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল।

পলাশীর পর কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছিল। নিজেদের ক্ষমতা ও সম্পদ ধরে রাখতে রাজপরিবারের কিছু সদস্য কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছিলেন। মন্নি বেগমও সেই রাজনৈতিক বাস্তবতার বাইরে ছিলেন না।

বেগমেরা কি সত্যিই পর্দার আড়াল থেকে রাজত্ব করতেন?

প্রশ্নটির উত্তর সরল নয়। তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নবাব ছিলেন না, রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বও তাদের হাতে ছিল না। তবে কিছু প্রভাবশালী বেগমের হাতে ছিল বিপুল সম্পদ, পরিবার ও উত্তরাধিকারের ওপর প্রভাব, অন্দরমহলের ব্যবস্থাপনা এবং দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ।

মুর্শিদাবাদের রাজপরিবারের নারীদের নিয়ে একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মুঘল আমলের অন্দরমহল সংস্কৃতির প্রভাব থাকলেও এখানকার বেগমদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান ছিল। বিশেষ করে প্রধান স্ত্রী ও রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ নারীরা রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতেন।

তাদের শক্তি ছিল মূলত পরোক্ষ। সিংহাসনে বসে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা নয়, বরং উত্তরাধিকার, রাজপরিবারের সম্পদ ও দরবারি রাজনীতির নানা বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগই ছিল তাদের বড় শক্তি।

মুঘল দরবার থেকে বাংলার বেগমদের ঐতিহ্য

বাংলার বেগমদের ইতিহাস বুঝতে হলে মুঘল দরবারের ঐতিহ্যও মনে রাখতে হয়। মুঘল সাম্রাজ্যে ‘বেগম’ ছিল রাজপরিবারের নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাধি। এর মধ্যে ‘পদশাহ বেগম’ ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। এটি সাধারণত সম্রাটের প্রধান স্ত্রী বা বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত কোনো রাজপরিবারের নারীকে দেওয়া হতো।

মহম বেগম, হামিদা বানু বেগম, মরিয়ম-উজ-জামানি ও নূরজাহান মুঘল রাজপরিবারের ইতিহাসে বিশেষভাবে পরিচিত।

এই রাজদরবারের সংস্কৃতি বাংলার নবাবি দরবারেও প্রভাব ফেলেছিল। তবে বাংলার বেগমদের ক্ষমতার গল্প গড়ে উঠেছিল নিজস্ব বাস্তবতায়। রাজপরিবার, জমিদারি সম্পদ, উত্তরাধিকার, ইউরোপীয় বণিক শক্তির উত্থান এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—সবকিছু মিলেই তাদের অবস্থান নির্ধারিত হয়েছিল।

পলাশীর পর বদলে গেল সবকিছু

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ মুর্শিদাবাদের রাজপরিবারের জন্যও ছিল বড় এক মোড়। এরপর নবাবের সিংহাসন থাকলেও তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা আগের মতো ছিল না। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার রাজনীতিতে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে থাকে।

রাজপরিবারের বেগমদের জীবনও বদলে যায়। একসময় যারা বিপুল সম্পদ ও প্রভাবের অধিকারী ছিলেন, তাদের অনেকের ক্ষমতা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রশাসনের অনুমতি, ভাতা ও রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

তবু তাদের সামাজিক মর্যাদা ও সম্পদের চিহ্ন পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। মুর্শিদাবাদের প্রাসাদ, মসজিদ, সমাধি ও পুরনো স্থাপনাগুলোতে আজও সেই সময়ের ছাপ পাওয়া যায়।

ইতিহাসের পর্দা সরালে যে ছবি দেখা যায়

বাংলার বেগমদের গল্পে রাজপ্রাসাদের ঝলমলানি যেমন আছে, তেমনি আছে ক্ষমতার জটিলতা। কেউ ছিলেন নবাবের স্ত্রী, কেউ মা, কেউ কন্যা। কেউ উত্তরাধিকারীর পক্ষে শক্তি হয়ে উঠেছিলেন, আবার কেউ ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হয়েছিলেন।

তাদের জীবনকে শুধু হারেমের বিলাসিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ইতিহাসের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। কারণ পর্দার আড়াল মানেই ক্ষমতার বাইরে থাকা নয়।

মুর্শিদাবাদের বেগমেরা হয়তো প্রকাশ্যে সিংহাসনে বসেননি, কিন্তু সেই সিংহাসনের চারপাশের রাজনীতিতে তাদের প্রভাব ছিল। সেই প্রভাবের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পদের লড়াই, উত্তরাধিকার নিয়ে হিসাব এবং ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা।

বাংলার নবাবি ইতিহাস তাই শুধু নবাবদের ইতিহাস নয়। তার এক অংশ লেখা হয়েছিল দরবারে, আর অন্য অংশ হয়তো লেখা হয়েছিল পর্দার আড়ালে।