রাতে কি আলো জ্বালিয়ে ঘুমান, হার্ট নিয়ে নতুন গবেষণায় যা জানা গেল

রাতে ঘুমানোর সময় ঘরে আলো জ্বালিয়ে রাখা, নাইট ল্যাম্প ব্যবহার করা কিংবা জানালা দিয়ে বাইরে থেকে আসা আলো ঘরে ঢুকতে দেওয়া অনেকেরই অভ্যাস। বিষয়টি নিয়ে অনেকে শুধু ঘুমের মানের কথা ভাবলেও, নতুন এক গবেষণায় এর সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার কিছু পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অর্থাৎ রাতে কতটা আলোতে ঘুমাচ্ছেন, সেটিও হয়তো স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্ব রাখে।
তাহলে রাতে ঘুমানোর সময় ঘর পুরো অন্ধকার রাখা কি ভালো, নাকি হালকা আলো থাকলেও সমস্যা নেই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষকেরা ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। গবেষণাটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালে European Heart Journal-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা দেখেছেন, রাতে বেশি মাত্রায় আলোতে থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্যন্ত্রের কিছু গঠনগত ও কার্যগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাতে আলো জ্বালিয়ে ঘুমালেই হৃদ্রোগ হবে। এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। তাই আলোতে থাকার সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেলেও আলোই যে এসব পরিবর্তনের সরাসরি কারণ, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
নতুন গবেষণায় কী দেখা গেছে?
গবেষকরা ১১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাদের রাতে আলোর সংস্পর্শের মাত্রা এবং হৃদ্যন্ত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্ক পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, রাতে বেশি আলোতে থাকা ব্যক্তিদের হৃদ্যন্ত্রের কিছু প্রকোষ্ঠের দেয়াল তুলনামূলক মোটা ও শক্ত হওয়ার এবং হৃদ্যন্ত্রের পাম্প করার কার্যকারিতায় প্রাথমিক পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের ভাষায়, এই ধরনের পরিবর্তনকে cardiac remodelling বলা হয়।
হৃদ্যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে চাপ বা ক্ষতির মুখে পড়লে তার গঠন ও কাজের ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এবং হার্ট ফেইলিউরের মতো সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
রাতে আলো কীভাবে হৃদ্যন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে?
এর পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীরা ভাবছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শরীরের circadian rhythm বা জৈবিক ঘড়ি।
আমাদের শরীর কখন জাগবে এবং কখন ঘুমাবে, তার ওপর আলো ও অন্ধকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। রাতে উজ্জ্বল আলো চোখে পৌঁছালে মেলাটোনিনের স্বাভাবিক নিঃসরণ ব্যাহত হতে পারে। এতে ঘুমের সময় ও ঘুমের মানে প্রভাব পড়তে পারে।
ঘুমের ব্যাঘাত আবার রক্তচাপ, বিপাকক্রিয়া এবং শরীরের স্ট্রেস-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আগের গবেষণাতেও রাতে কৃত্রিম আলোর বেশি সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক, অ্যাট্রিয়াল ফাইব্রিলেশন, হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে এখানেও সম্পর্ক এবং কারণের মধ্যে পার্থক্য মনে রাখা জরুরি।
কোন ধরনের আলো বেশি চিন্তার?
শুধু ঘরের একটি ছোট নাইট ল্যাম্প নয়, রাতে বিভিন্ন উৎস থেকে আলো আসতে পারে। যেমন-
- মোবাইল ফোনের স্ক্রিন
- টেলিভিশন
- ট্যাব বা কম্পিউটারের স্ক্রিন
- উজ্জ্বল ঘরের আলো
- বিছানার পাশের ল্যাম্প
- জানালা দিয়ে আসা রাস্তার আলো
- বাইরের সাইনবোর্ড বা ভবনের আলো
আলোর তীব্রতা, কতক্ষণ চোখে পৌঁছাচ্ছে এবং আলো কতটা সরাসরি ঘুমের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমানোর সময় মোবাইলের আলোও কি সমস্যা?
মোবাইল ফোনের স্ক্রিন শুধু চোখের সামনে থাকা একটি আলোর উৎস নয়। ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার করলে মস্তিষ্কের জাগ্রত থাকার প্রবণতা বাড়তে পারে এবং ঘুমের সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
এ কারণে ঘুমের আগে ফোন ব্যবহার কমানো ভালো ঘুমের অভ্যাসের একটি অংশ। তবে নতুন গবেষণাটি শুধু মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের নিয়ে করা হয়নি। তাই গবেষণার ফলকে শুধু মোবাইলের আলো বা নীল আলোর ক্ষতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।
ঘরে আলো জ্বালিয়ে ঘুমালে কি হার্ট অ্যাটাক হবেই?
একেবারেই নয়। এই গবেষণায় রাতে বেশি আলোতে থাকা এবং হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার কিছু পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে কেউ কয়েক রাত আলো জ্বালিয়ে ঘুমালেই তার হার্ট অ্যাটাক হবে।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণে বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ধূমপান, ওজন, শারীরিক কর্মকাণ্ড, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম এবং পারিবারিক ইতিহাসসহ অনেক বিষয় ভূমিকা রাখে।
তাই শুধু ঘরের আলোকে হৃদ্রোগের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
ঘুমের ঘর অন্ধকার রাখার উপকার কী?
ঘুমের পরিবেশ যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা ভালো ঘুমের অভ্যাসের অংশ হতে পারে। বাইরে থেকে রাস্তার আলো ঘরে ঢুকলে পর্দা ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজন না হলে ঘরের প্রধান আলো বন্ধ করে দেওয়া ভালো।
যাদের রাতে আলো প্রয়োজন, তারা খুব উজ্জ্বল আলো ব্যবহার না করে কম তীব্রতার আলো ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে আলো যেন সরাসরি চোখে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখা ভালো।
তবে যাদের রাতে চলাফেরার নিরাপত্তার জন্য আলো প্রয়োজন, তাদের একেবারে অন্ধকারে ঘুমানোর জন্য বাধ্য হওয়ার প্রয়োজন নেই। নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে আলো, রাতে অন্ধকার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দিনের আলো এবং রাতের অন্ধকার শরীরের জৈবিক ঘড়ির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
সকালে প্রাকৃতিক আলোতে কিছু সময় থাকা ঘুম ও জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে রাতে অপ্রয়োজনীয় উজ্জ্বল আলো কমানো শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করতে পারে।
তাই শুধু রাতে আলো বন্ধ করাই নয়, দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো পাওয়া এবং রাতে নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখাও ভালো ঘুমের অভ্যাসের অংশ।
হার্ট ভালো রাখতে শুধু আলো কমালেই হবে না
রাতে অপ্রয়োজনীয় আলো কমানো সহজ একটি অভ্যাস হতে পারে। তবে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে এর পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে।
নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা, ধূমপান না করা, সুষম খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ঘুমের সমস্যা দীর্ঘদিন থাকলে সেটিকেও অবহেলা করা উচিত নয়। বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া, অতিরিক্ত নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দিনের বেলা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
তাহলে রাতে কীভাবে ঘুমাবেন?
রাতে ঘুমানোর সময় কয়েকটি সহজ অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে-
ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখুন: বাইরে থেকে আলো ঢুকলে পর্দা ব্যবহার করতে পারেন।
ঘুমের আগে স্ক্রিন কমান: মোবাইল, ট্যাব বা টেলিভিশনের ব্যবহার ঘুমানোর আগে কমিয়ে দিন।
নিয়মিত ঘুমের সময় রাখুন: প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমানো ও ওঠার অভ্যাস করুন।
উজ্জ্বল আলো এড়িয়ে চলুন: রাতে প্রয়োজন হলে কম তীব্রতার আলো ব্যবহার করুন।
সকালের আলো নিন: দিনের শুরুতে প্রাকৃতিক আলো শরীরের জৈবিক ঘড়ির জন্য উপকারী হতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতাও মনে রাখতে হবে
নতুন গবেষণাটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর ফলকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক। গবেষকরা মানুষের রাতে আলোর সংস্পর্শ এবং হৃদ্যন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সম্পর্ক দেখেছেন।
কোনো নির্দিষ্ট মাত্রার আলো কতক্ষণ ব্যবহার করলে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হবে, তা এই গবেষণা থেকে বলা যায় না। একইভাবে রাতে আলো পুরোপুরি বন্ধ করলেই হৃদ্যন্ত্রের গঠন আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
তাই গবেষণার ফলকে সম্ভাব্য ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা উচিত, নিশ্চিত কারণ-ফল সম্পর্ক হিসেবে নয়।
রাতে ঘুমানোর সময় অপ্রয়োজনীয় আলো কমিয়ে রাখা শুধু ভালো ঘুমের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদি হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে বলে গবেষণায় নতুন করে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ১১ হাজারের বেশি মানুষের ওপর করা গবেষণায় রাতে বেশি আলোর সংস্পর্শের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্রের গঠন ও কার্যকারিতার কিছু পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। একটি গবেষণার ফল দিয়ে বলা যাবে না যে রাতে আলো জ্বালিয়ে ঘুমালেই হার্টের অসুখ হবে। বরং অপ্রয়োজনীয় রাতের আলো কমানো, নিয়মিত ঘুম, পর্যাপ্ত দিনের আলো, স্বাস্থ্যকর খাবার, শরীরচর্চা এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মতো প্রমাণভিত্তিক অভ্যাসগুলো একসঙ্গে বজায় রাখাই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: সিএনএন


-e12a9b.jpg)