নিজের অনুভূতি বোঝা ও প্রকাশে সমস্যা হয়, কোনো মানসিক রোগ নয়তো

অনেক মানুষ আছেন যারা নিজের অনুভূতিগুলো ঠিকভাবে বুঝতে বা প্রকাশ করতে পারেন না। আনন্দ, দুঃখ, রাগ বা উদ্বেগ- এসব আবেগ তারা অনুভব করলেও সেগুলোকে শব্দে প্রকাশ করা বা বোঝা তাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। এই অবস্থাকেই বলা হয় অ্যালেক্সিথাইমিয়া, যাকে অনেক সময় ‘ইমোশনাল ব্লাইন্ডনেস’ বা আবেগগত অন্ধত্বও বলা হয়।
এটি কোনো মানসিক রোগ নয়, বরং একটি ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্য। তবে এটি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
অ্যালেক্সিথাইমিয়া (Alexithymia) কী
অ্যালেক্সিথাইমিয়া শব্দটির অর্থ হলো আবেগের জন্য শব্দ না থাকা। এই অবস্থায় একজন মানুষ নিজের আবেগ চিনতে বা বুঝতে পারে না, আবেগকে শব্দে প্রকাশ করতে পারে না এবং এ ধরনের মানুষদের অন্যের অনুভূতি বুঝতেও অসুবিধা হয়।
ফলে অনেক সময় তাদেরকে আবেগহীন মনে হতে পারে, যদিও বাস্তবে তাদের ভেতরে আবেগ থাকে।
এই অবস্থার বৈশিষ্ট্য
অ্যালেক্সিথাইমিয়ায় থাকা একজন ব্যক্তির মধ্যে কিছু সাধারণত বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন-
- নিজের অনুভূতি ব্যাখ্যা করতে অসুবিধা
- শরীরের ভেতরের অনুভূতি যেমন রাগের সময় বুক চাপা লাগা—এসব বুঝতে না পারা
- আবেগের শব্দভান্ডার সীমিত থাকা
- বাইরে থেকে আবেগ কম বা নির্লিপ্ত মনে হওয়া
- সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি হওয়া
কেন অ্যালেক্সিথাইমিয়া হয়
গবেষণায় দেখা গেছে, এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করতে পারে।
জেনেটিক বা বংশগত প্রভাব: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালেক্সিথাইমিয়া পরিবারে চলতে পারে। অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে এটি জিনগতভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
পরিবেশ ও জীবনের অভিজ্ঞতা: শৈশবে মানসিক আঘাত, অবহেলা বা নির্যাতনের অভিজ্ঞতা থাকলে আবেগ বোঝা ও প্রকাশ করার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মস্তিষ্কের আঘাত বা রোগ: মস্তিষ্কে আঘাত বা কিছু স্নায়বিক সমস্যার কারণেও এই বৈশিষ্ট্য দেখা দিতে পারে।
সম্পর্কের ওপর প্রভাব
অ্যালেক্সিথাইমিয়ার কারণে একজন মানুষের জন্য নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা কঠিন হয়ে যায়। এর ফলে-
- সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে
- আবেগগত দূরত্ব তৈরি হয়
- অন্যের অনুভূতি বোঝায় সমস্যা হয়
ফলে ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোতে ভুল-বোঝাবুঝি দেখা দিতে পারে।
মানসিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্ক
অ্যালেক্সিথাইমিয়া একা কোনো রোগ না হলেও এটি কিছু মানসিক অবস্থার সঙ্গে দেখা যেতে পারে, যেমন-
- বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন
- উদ্বেগজনিত সমস্যা
- পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)
- অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার
- কিছু খাওয়াজনিত সমস্যা (eating disorder)
গবেষণায় দেখা গেছে, এসব অবস্থায় অনেক মানুষের মধ্যে আবেগ বোঝা ও প্রকাশের সমস্যা থাকে।
কীভাবে বোঝা যায়
চিকিৎসকরা কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্র ব্যবহার করেন, যেমন টরন্টো অ্যালেক্সিথাইমিয়া স্কেল বা বেরমন্ড-ভরস্ট প্রশ্নাবলি। তবে এগুলো শুধু আত্মমূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে, তাই অন্যান্য ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।
যদিও এটি সম্পূর্ণভাবে চিকিৎসাযোগ্য কোনো রোগ নয়, তবে কিছু উপায় সাহায্য করতে পারে।
মাইন্ডফুলনেস অনুশীলন: নিজের অনুভূতির প্রতি সচেতন থাকা এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে আবেগ বোঝার ক্ষমতা বাড়ানো যায়। যেমন - সৃজনশীল কাজ, ডায়েরি লেখা, আঁকাআঁকি ও গল্প বা বই পড়া।
এসব কাজ আবেগের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।
থেরাপি
কিছু থেরাপি কার্যকর হতে পারে। যেমন - কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT) ও সাইকোডাইনামিক থেরাপি। এই থেরাপিগুলো ধীরে ধীরে আবেগ চেনা ও প্রকাশের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে।
অ্যালেক্সিথাইমিয়া কোনো মানসিক রোগ নয়, তবে এটি মানুষের আবেগ, সম্পর্ক এবং সামাজিক জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। সময়ের সঙ্গে সঠিক সচেতনতা, থেরাপি এবং অনুশীলনের মাধ্যমে এই অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং উন্নতি করা সম্ভব।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে