চায়ের সঙ্গে কোন খাবার ভালো, কোনটি ক্ষতিকর? যে সতর্কতা জরুরি

সকালে বা বিকেলে এক কাপ চা অনেকেরই অভ্যাসের অংশ। কাজের ফাঁকে চা, আড্ডায় চা কিংবা নাশতার সঙ্গে চা! বাঙালির জীবনে এই পানীয়ের উপস্থিতি বেশ পুরোনো। তবে শুধু চা খাওয়ার অভ্যাসই নয়, চায়ের সঙ্গে কী খাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করছে বিভিন্ন গবেষণা।
কারণ কিছু খাবার চায়ের সঙ্গে খেলে পেটের অস্বস্তি বা গ্যাসের সমস্যা বাড়তে পারে। আবার কিছু খাবার চায়ের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে মানিয়ে যায়। বিশেষ করে চায়ের ট্যানিন শরীরে উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শোষণে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিদিন চা পান করার অবভ্যাস থাকলে খাবারের সঙ্গে এর সময়ের ব্যবধানের দিকেও নজর দেওয়া দরকার।
চলুন জেনে নিই চায়ের সঙ্গে যে ৫ খাবার খেতে পারবেন এবং যেসব খাবার এড়িয়ে যাবেন।
যে ৫ খাবার খেতে পারেন
আঁশযুক্ত হালকা খাবার
চায়ের সঙ্গে খুব ভারী খাবারের বদলে আঁশযুক্ত হালকা খাবার বেছে নিতে পারেন। মুড়ি, ভাজা মাখানা, পূর্ণশস্যের বিস্কুট বা ছোলা হতে পারে ভালো বিকল্প। এ ধরনের খাবার পেট কিছুটা ভরা রাখে এবং চায়ের সঙ্গে হালকা নাশতা হিসেবে খাওয়া যায়।
হালকা প্রোটিনযুক্ত খাবার
চায়ের সঙ্গে সেদ্ধ ডিম, ভাজা ছোলা বা অল্প পরিমাণ পনিরের মতো হালকা প্রোটিনযুক্ত খাবার খাওয়া যেতে পারে। তবে এগুলো যেন অতিরিক্ত তেল বা মসলা দিয়ে তৈরি না হয়। বিকেলের নাশতায় এমন খাবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবারের প্রতি ঝোঁক কমাতে পারে।
কম আয়রনযুক্ত হালকা খাবার
চায়ের ট্যানিন উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণ কমাতে পারে। তাই চায়ের সঙ্গে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার না খেয়ে হালকা খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। সাধারণ বিস্কুট, টোস্ট বা হালকা ভাতের তৈরি নাশতা চায়ের সঙ্গে খাওয়া যায়।
কলা বা হালকা নাশতা
চা খেলে যাদের পেটে অস্বস্তি বা অম্বলের প্রবণতা থাকে, তারা খালি পেটে চা না খেয়ে সামান্য খাবার সঙ্গে রাখতে পারেন। কলা, অল্প চিনাবাদাম, হালকা চিড়া বা শসার স্যান্ডউইচের মতো খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে এসব খাবার অম্বল সারানোর চিকিৎসা নয়। কারও নিয়মিত অম্বল হলে কারণটি খুঁজে দেখা জরুরি।
হালকা মসলাযুক্ত খাবার
আদা বা মৌরির মতো মসলা ব্যবহার করা হালকা নাশতা চায়ের সঙ্গে খেতে পারেন। তবে খাবারে মসলা যেন অতিরিক্ত না হয়। বিশেষ করে যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের জন্য বেশি ঝাল বা তেলযুক্ত খাবারের বদলে হালকা নাশতা ভালো পছন্দ হতে পারে।
চায়ের সঙ্গে যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলা ভালো
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার
চায়ের ট্যানিন উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে শোষণের পরিমাণ কমাতে পারে। ডাল, মসুর ডাল, বিভিন্ন শাক এবং অন্যান্য উদ্ভিজ্জ আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে একই সময়ে চা পান না করাই ভালো। বিশেষ করে যাদের আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতা রয়েছে, তাদের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। খাবারের সঙ্গে চায়ের অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টার ব্যবধান রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
কমলা বা অন্যান্য টক ফল
চায়ের সঙ্গে কমলা, লেবু বা অন্যান্য টক ফল কিংবা টক ফলের সালাদ খেলে কারও কারও পেটে অস্বস্তি বা অম্বল হতে পারে। তাই চা এবং টক ফল আলাদা সময়ে খাওয়াই ভালো, বিশেষ করে যাদের অম্বলের সমস্যা রয়েছে।
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার
চায়ের সঙ্গে সিঙ্গারা, সমুচা, পেঁয়াজু, পাকোড়া বা অন্যান্য ভাজাপোড়া খাবার খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই আছে। কিন্তু অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়া হজমের জন্য ভালো নয়। চায়ের সঙ্গে এমন খাবার খেলে পেট ভার, গ্যাস বা অস্বস্তি হতে পারে। তাই নিয়মিত চা খাওয়ার সময় ভাজাপোড়ার পরিমাণ কমিয়ে হালকা নাশতা বেছে নেওয়া ভালো।
অতিরিক্ত দুধ বা দইজাতীয় খাবার
দুধ-চা নিজেই অনেকের পছন্দের পানীয়। তবে এর সঙ্গে আবার অতিরিক্ত দুধ বা দইজাতীয় ভারী খাবার খেলে কারও হজমে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে দুধজাতীয় খাবারে যাদের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের এ ধরনের খাবারের সঙ্গে চা পান করলে পেটের অস্বস্তি হতে পারে।
অতিরিক্ত ঝাল বা টক খাবার
চায়ের সঙ্গে খুব ঝাল, মসলাদার বা টক খাবার খেলে যাদের পেট সংবেদনশীল, তাদের অম্বল বা বদহজমের সমস্যা বাড়তে পারে। তাই দুপুর বা রাতের ভারী খাবারের পরপরই এক কাপ চায়ের সঙ্গে ঝাল খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
কখন চা খাওয়া ভালো
খালি পেটে চা খাওয়ার অভ্যাস অনেকের রয়েছে। কিন্তু এতে সবার সমস্যা হবে এমন নয়। তবে যাদের অম্বল, গ্যাস বা পেটের সংবেদনশীলতা রয়েছে, তাদের খালি পেটে চা না খাওয়াই ভালো।
নাশতা বা দুপুরের খাবারের পর চা পান করা যেতে পারে। আবার বিকেলের পর বেশি দেরি করে চা খেলে ক্যাফেইনের কারণে কারও ঘুমে সমস্যা হতে পারে। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে সন্ধ্যার পর চা পান কমানো ভালো।
চা বেশি খেলেও সমস্যা হতে পারে
চা পরিমিত পরিমাণে পান করা হলেও অতিরিক্ত চা খাওয়ার অভ্যাস ভালো নয়। বেশি চা খেলে কারও অম্বল, পেট ফাঁপা, অস্থিরতা বা ঘুমের সমস্যা হতে পারে। চায়ের ক্যাফেইন এসব সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এ ছাড়া নিয়মিত চা খাবারের সঙ্গে পান করলে আয়রন শোষণে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তাদের চা পান ও খাবারের সময়ের মধ্যে ব্যবধান রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
এক কাপ চায়ের সঙ্গে হালকা নাশতা খাওয়ার অভ্যাসে সমস্যা নেই। তবে প্রতিদিনের খাবারে আয়রনসমৃদ্ধ খাবার থাকলে তার সঙ্গে একই সময়ে চা না খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া, ঝাল বা টক খাবারের বদলে মুড়ি, ছোলা, সেদ্ধ ডিম বা হালকা নাশতা বেছে নেওয়া যেতে পারে।
তবে চায়ের সঙ্গে কোনো খাবার খেলেই সবার একই ধরনের সমস্যা হবে, এমন নয়। ব্যক্তিভেদে হজমের ক্ষমতা ও খাবারের প্রতি সংবেদনশীলতা আলাদা। নিয়মিত অম্বল, পেটের সমস্যা বা আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
সূত্র: এনডিটিভি
-19c334.jpg)