প্লাস্টিকের চাল আর নকল ডিম কি সত্যিই বাজারে, ভাইরাল দাবির আসল সত্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই মাঝেমধ্যে এমন কিছু ভিডিও সামনে আসে, যা দেখে খাবার নিয়েই ভয় তৈরি হয়। কখনো দাবি করা হয় বাজারের চাল আসলে প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, আবার কখনো দেখা যায় নকল ডিম তৈরির ভিডিও। কোনো ভিডিওতে রান্না করা ভাতের বল মেঝেতে ফেললে সেটি লাফাচ্ছে, আবার কোনো ডিমের খোসার ভেতরের পাতলা আবরণ দেখে বলা হচ্ছে সেটি নাকি প্লাস্টিক।
এ ধরনের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, সত্যিই কি বাজারে প্লাস্টিকের চাল বা নকল ডিম পাওয়া যাচ্ছে?
সাম্প্রতিক সময়ে এই বিষয়টি নিয়ে আবারও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ভাইরাল ভিডিও দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানা দরকার, খাবারের অস্বাভাবিক আচরণের পেছনে সবসময় প্লাস্টিক থাকার কারণ নেই। বিভিন্ন খাদ্যনিরাপত্তা সংস্থা অতীতেও প্লাস্টিকের চাল ও নকল ডিম নিয়ে ছড়ানো দাবিকে গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভাতের বল লাফালেই কি চাল প্লাস্টিক?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্লাস্টিকের চাল চেনার একটি বহুল প্রচলিত পদ্ধতি হলো রান্না করা ভাতকে শক্ত করে বল বানিয়ে মেঝেতে ফেলানো। সেটি লাফালে বা কিছুটা স্থিতিস্থাপক মনে হলে ভিডিওতে দাবি করা হয়, চালের মধ্যে প্লাস্টিক রয়েছে।
কিন্তু এই পরীক্ষা দিয়ে চালের মধ্যে প্লাস্টিক আছে কি না বোঝা যায় না।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এ ধরনের দাবির ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, চাল মূলত শর্করাজাতীয় খাবার এবং এতে প্রচুর শ্বেতসার থাকে। রান্না করা ভাতের মধ্যে বাতাস আটকে গেলে সেটি বলের মতো কিছুটা লাফাতে পারে। তাই ভাতের এই আচরণকে প্লাস্টিক থাকার প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারও প্লাস্টিকের চাল নিয়ে ছড়ানো গুজব পরীক্ষা করে জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশে এ ধরনের দাবি ছড়ালেও সরকারি পরীক্ষায় প্লাস্টিকের চালের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি।
ভাত পুড়লে প্লাস্টিকের মতো দেখায় কেন?
আরেকটি ভাইরাল পরীক্ষা হলো চাল বা ভাত আগুনে ধরানো। পুড়তে থাকা ভাতের কিছু অংশ কালো হয়ে গেলে বা আঠালো অবশিষ্টাংশ তৈরি হলে সেটিকে প্লাস্টিক বলে দাবি করা হয়।
কিন্তু কোনো খাবার আগুনে পুড়লেই তাতে প্লাস্টিক রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না।
চাল মূলত শ্বেতসার বা কার্বোহাইড্রেটসমৃদ্ধ খাবার। আগুনের সংস্পর্শে কার্বোহাইড্রেটজাতীয় খাবারও পুড়তে পারে। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও চাল পোড়ার বিষয়টিকে স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
তাই ঘরে বসে আগুনে পুড়িয়ে চাল পরীক্ষা করা কোনো নির্ভরযোগ্য খাদ্যনিরাপত্তা পরীক্ষা নয়।
সত্যিই কি প্লাস্টিক দিয়ে চাল তৈরি করে বিক্রি করা হয়?
প্লাস্টিকের চাল নিয়ে গুজব নতুন নয়। কয়েক বছর ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়েছে।
২০১৭ সালে ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার প্লাস্টিকের চাল নিয়ে একটি তথ্যপত্র প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্লাস্টিকের চাল নিয়ে দাবি ছড়ালেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরীক্ষায় এমন চালের উপস্থিতি নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে খাদ্যে কোনো ধরনের প্লাস্টিক কণা কখনোই পাওয়া যায় না। সেটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক আর প্লাস্টিকের চাল এক নয়
বর্তমানে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে। পরিবেশ থেকে অত্যন্ত ছোট প্লাস্টিক কণা বিভিন্ন খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক বিভিন্ন খাদ্যে শনাক্ত হয়েছে। তবে মানুষের খাবারের মাধ্যমে কতটা মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢোকে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর কী প্রভাব পড়ে, সে বিষয়ে এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া বাকি।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনও বলছে, খাবারে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়ার প্রমাণ রয়েছে। তবে বর্তমানে যে মাত্রায় এসব কণা খাবারে শনাক্ত হচ্ছে, তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
অর্থাৎ পরিবেশগত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এবং বাজারে প্লাস্টিকের দানা মিশিয়ে চাল বিক্রির দাবি এক বিষয় নয়।
নকল ডিম কি তৈরি করা সম্ভব?
নকল বা কৃত্রিম ডিম তৈরি করা যায় কি না, এই প্রশ্নের উত্তর কিছুটা জটিল।
খাদ্যসদৃশ দেখতে কৃত্রিম বস্তু বা সাজসজ্জার জন্য ডিমের মতো জিনিস তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু বাজারে বিক্রি হওয়া সাধারণ ডিমের জায়গায় ব্যাপকভাবে কৃত্রিম রাসায়নিক দিয়ে তৈরি পুরো ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো ডিম কৃত্রিমভাবে তৈরি করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বা রাসায়নিক ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। পাশাপাশি স্বাভাবিক ডিম তুলনামূলক সহজলভ্য হওয়ায় কৃত্রিম ডিম বানিয়ে তা কম দামে বাজারে বিক্রি করাও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত নয়।
ডিমের খোসার ভেতর প্লাস্টিকের মতো পাতলা পর্দা কেন থাকে?
অনেক সময় ডিম ভাঙার পর খোসার ভেতরে শক্ত বা কাগজের মতো একটি পাতলা স্তর দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটিকে প্লাস্টিক বলে দাবি করা হতে পারে।
আসলে ডিমের খোসার ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই দুটি পাতলা ঝিল্লি থাকে। ডিমের বয়স বাড়ার সঙ্গে এসব ঝিল্লির গঠন ও স্থিতিস্থাপকতায় পরিবর্তন আসতে পারে।
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরোনো ডিমের ভেতরের খোসার ঝিল্লি কিছুটা শক্ত ও স্থিতিস্থাপক হয়ে যেতে পারে। এটিকে কৃত্রিম প্লাস্টিকের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
পুরোনো ডিমের সাদা অংশও বদলে যেতে পারে
ডিম কিছুদিন সংরক্ষণ করার পর তার ভেতরের অংশের গঠনেও পরিবর্তন আসে। ডিমের সাদা অংশ ধীরে ধীরে পাতলা ও তরল হতে পারে। তাপমাত্রার অনিয়ম বা দীর্ঘদিন সংরক্ষণের কারণে কুসুম ও সাদা অংশের গঠনও বদলাতে পারে।
এই পরিবর্তন দেখেও অনেকে ডিমটিকে নকল বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু শুধু ডিমের গঠন দেখে সেটিকে কৃত্রিম ডিম বলা যায় না।
তাহলে ভাইরাল ভিডিও দেখে কী করবেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খাবার নিয়ে চমকপ্রদ ভিডিও দেখলে সঙ্গে সঙ্গে সেটি বিশ্বাস বা শেয়ার না করাই ভালো।
বিশেষ করে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন।
প্রথমত, ভিডিওটি কোথা থেকে এসেছে দেখুন। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো পোস্ট বা ভিডিওকে খাদ্যনিরাপত্তার প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক নয়।
দ্বিতীয়ত, ঘরে করা কয়েকটি সহজ পরীক্ষাকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা মনে করবেন না। ভাত লাফানো, পোড়ালে কালো হওয়া বা ডিমের ঝিল্লি শক্ত হওয়া দিয়ে খাবারে প্লাস্টিক আছে কি না নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ণয় করা যায় না।
তৃতীয়ত, সন্দেহ হলে খাবারটি না খেয়ে স্থানীয় খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করা ভালো।
চতুর্থত, একই ভিডিও বা দাবি একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সূত্রে যাচাই করুন।
বাংলাদেশের বাজারের ক্ষেত্রে কী করবেন?
বাংলাদেশে কোনো নির্দিষ্ট চাল বা ডিমে ভেজাল আছে কি না, সেটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও দেখে বলা যায় না। কোনো পণ্যের বিষয়ে বাস্তব সন্দেহ থাকলে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করাই নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড, দোকান বা বাজারের বিরুদ্ধে ভেজালের অভিযোগ থাকলে প্রমাণ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।
খাদ্য নিয়ে ভয় তৈরি করার মতো ভাইরাল ভিডিও অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য, পুরোনো ঘটনা বা সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো বিষয়কে নতুন দাবির সঙ্গে জুড়ে তৈরি হতে পারে।
প্লাস্টিকের চাল ও নকল ডিম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের ভিডিও ছড়ায়, তার অনেকগুলোর দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রান্না করা ভাতের বল লাফানো বা ডিমের খোসার ভেতরের ঝিল্লি শক্ত হওয়া প্লাস্টিক থাকার প্রমাণ নয়।
তবে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মতো পরিবেশগত দূষণ নিয়ে আলাদা বৈজ্ঞানিক গবেষণা চলছে। সেটিকে প্লাস্টিকের চালের ভাইরাল দাবির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
তাই কোনো খাবার নিয়ে ভয় পাওয়ার আগে ভিডিওর উৎস যাচাই করুন, সরকারি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দেখুন এবং প্রয়োজন হলে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা একটি চমকপ্রদ ভিডিও কখনোই একা কোনো খাবারকে নকল বা বিষাক্ত প্রমাণ করে না।
সূত্র: টিভি ৯
