টানা ১৪ দিন সকালে ডিম খেলে শরীরে কী ঘটে

সকালের নাশতায় ডিম খাওয়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। কখনো সেদ্ধ ডিম, কখনো পোচ বা অমলেট। নানা ভাবেই খাওয়া হয় এই খাবার। ডিমে ভালো মানের প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় বেশ কিছু ভিটামিন ও খনিজও রয়েছে। তাই প্রতিদিন পরিমিত ডিম খেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন হতে পারে, তা নিয়েও মানুষের আগ্রহ অনেক।
সম্প্রতি ভারতীয় গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডা. সৌরভ শেঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টানা দুই সপ্তাহ ডিম খাওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডিম খেলে মস্তিষ্ক, চোখ, হৃদ্যন্ত্র এবং চুল ও ত্বকের উপকার হতে পারে। তবে শুধু ১৪ দিন ডিম খেলেই শরীরে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে তা বলা যায় না। পাশাপাশি খাবারের ধরন, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং পুরো খাদ্যাভ্যাসের ওপর এর ফল অনেকটাই নির্ভর করে।
ডিমের পুষ্টিগুণ
একটি ডিমে প্রায় ৭৫ বা ৭৬ ক্যালরি এবং ৬ থেকে ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকে। পাশাপাশি এতে চর্বি, সামান্য সম্পৃক্ত চর্বি, আয়রন, আয়োডিন, ভিটামিন এ, ডি, ই ও বি১২, কোলিন এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান রয়েছে। ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো উপাদানও পাওয়া যায়।
তাই সকালের নাশতায় একটি ডিম রাখলে দিনের শুরুতেই শরীর কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে। চলুন জেনে নিই টানা ২ সপ্তাহ সকালের নাশতায় ডিম খেলে শরীরে কী ঘটে।
পেট কিছুটা বেশি সময় ভরা থাকতে পারে
ডিমে থাকা প্রোটিন পেট ভরা রাখার ক্ষেত্রে সাহায্য করতে পারে। সকালে শুধু চা-বিস্কুট বা মিষ্টি খাবারের বদলে ডিমের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে দ্রুত ক্ষুধা লাগার প্রবণতা কমতে পারে।
ফলে সকাল থেকে দুপুরের মধ্যে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার ইচ্ছাও কিছুটা কম হতে পারে।
মস্তিষ্কের জন্য উপকারী পুষ্টি মিলতে পারে
ডিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হলো কোলিন। এটি শরীর অ্যাসিটাইলকোলিন তৈরিতে কোলিন ব্যবহার করে। অ্যাসিটাইলকোলিন মস্তিষ্কের স্মৃতি ও মনোযোগের সঙ্গে যুক্ত একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক।
তাই নিয়মিত ডিম খাওয়া মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও মনোযোগ ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারে। তবে মাত্র ১৪ দিন ডিম খেলেই স্মৃতিশক্তি বেড়ে যাবে, এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই।
কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে কী হতে পারে
ডিম নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি থাকে, তা হলো কোলেস্টেরল। ডিমে খাদ্য কোলেস্টেরল থাকলেও এর প্রভাব সবার শরীরে এক রকম নয়।
ডা. সৌরভ শেঠির বক্তব্য অনুযায়ী, নিয়মিত ডিম খেলে অনেক মানুষের ক্ষেত্রে এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে। তবে হৃদ্স্বাস্থ্যের বিষয়টি শুধু ডিম খাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। পুরো খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা, ওজন এবং অন্যান্য শারীরিক অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই ডিমকে একেবারে ক্ষতিকর বা সবার জন্য উপকারী, কোনোটিই এক কথায় বলা ঠিক নয়।
চোখের জন্য কিছু উপকারী পুষ্টি মিলতে পারে
ডিমের কুসুমে লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিন রয়েছে। এগুলো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং চোখের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ডা. সৌরভ শেঠির মতে, এই উপাদানগুলো চোখকে ক্ষতিকর উচ্চশক্তির আলোর প্রভাব থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে চোখ ভালো রাখার জন্য শুধু ডিমের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। শাকসবজি, ফল এবং অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও খাদ্যতালিকায় রাখা জরুরি।
চুল ও ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান পেতে পারেন
ডিমে থাকা প্রোটিন শরীরের কোষ ও টিস্যু তৈরিতে এবং মেরামতে ভূমিকা রাখে। ডিমে থাকা সালফারযুক্ত অ্যামাইনো অ্যাসিড শরীরে কেরাটিন তৈরিতে সাহায্য করে। কেরাটিন চুল, ত্বক ও নখের গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান।
তাই নিয়মিত ও পরিমিত ডিম খাওয়া চুল ও ত্বকের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগাতে পারে। তবে শুধু ডিম খেলে চুল পড়া বন্ধ হবে বা ত্বক দ্রুত ভালো হয়ে যাবে, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পেশি ও শরীরের টিস্যু তৈরিতে সাহায্য করতে পারে
ডিমের প্রোটিন শরীরের জন্য ভালো মানের প্রোটিনের উৎস। প্রোটিন পেশি, ত্বক ও শরীরের বিভিন্ন টিস্যু তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।
যারা নিয়মিত শরীরচর্চা করেন, তাদের খাদ্যতালিকায় ডিম একটি সহজ প্রোটিনের উৎস হতে পারে। তবে শরীরের মোট প্রোটিনের চাহিদা বয়স, ওজন ও শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে।
শরীর বেশ কিছু ভিটামিন ও খনিজ পেতে পারে
ডিমে প্রায় ১৩ ধরনের ভিটামিন ও খনিজ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভিটামিন এ, ডি, ই, বি১২, আয়োডিন ও আয়রনের মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে ওমেগা ৩ ফ্যাট ও কোলিন।
অর্থাৎ সকালের নাশতায় ডিম রাখলে শুধু প্রোটিন নয়, একসঙ্গে বেশ কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টিও পাওয়া যায়।
১৪ দিনে কি চোখে পড়ার মতো পরিবর্তন হবে
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি মনে রাখা দরকার। টানা ১৪ দিন ডিম খেলেই সবার শরীরে একই ধরনের পরিবর্তন হবে না। কারও ক্ষেত্রে পেট বেশি সময় ভরা থাকার অনুভূতি হতে পারে, আবার কারও খাদ্যতালিকায় আগে থেকেই পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকলে তেমন পার্থক্য বোঝা নাও যেতে পারে।
মস্তিষ্ক, চোখ, হৃদ্যন্ত্র, চুল বা ত্বকের ওপর ডিমের পুষ্টি উপাদানগুলোর ভূমিকা থাকলেও এগুলো দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। শুধু দুই সপ্তাহের একটি খাবারের অভ্যাস দিয়ে স্বাস্থ্যগত বড় পরিবর্তন আশা করা ঠিক নয়।
কীভাবে ডিম খাওয়া ভালো
সকালের নাশতায় সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করা ডিম রাখা সহজ একটি উপায়। ডিমের সঙ্গে সবজি, আটার রুটি বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার যোগ করলে নাশতা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
অতিরিক্ত তেল, মাখন বা লবণ দিয়ে ডিম রান্না করলে খাবারের মোট ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই ডিমের পাশাপাশি কী দিয়ে এবং কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সবার জন্য কি প্রতিদিন ডিম একইভাবে উপকারী
না। একজন সুস্থ মানুষের জন্য যে পরিমাণ ডিম ঠিক আছে, অন্য কারও জন্য সেটি একই নাও হতে পারে। যাদের রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের ব্যক্তিগত খাদ্যতালিকা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করা ভালো।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিমকে একমাত্র স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে না দেখে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে রাখা। ডিমের সঙ্গে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার থাকলে খাদ্যতালিকা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।
টানা ১৪ দিন সকালের নাশতায় একটি ডিম খাওয়া অনেকের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। ডিম থেকে ভালো মানের প্রোটিন, কোলিন, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ পাওয়া যায়। এগুলো মস্তিষ্ক, চোখ, পেশি, ত্বক ও চুলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে।
তবে ১৪ দিন ডিম খেলেই ওজন কমে যাবে, স্মৃতিশক্তি বেড়ে যাবে বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। স্বাস্থ্য ভালো রাখতে নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবারের পাশাপাশি ডিমকে খাদ্যতালিকার একটি অংশ হিসেবে রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ইকোনমিক টাইমস
