চুল কতবার আঁচড়াবেন, উত্তর জানলে অবাক হতে পারেন

ঘন, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল ও সুন্দর চুলের জন্য নিয়মিত যত্নের বিকল্প নেই। তবে অনেকেরই ধারণা, যত বেশি চুল আঁচড়ানো হবে, তত দ্রুত চুল বাড়বে এবং তত বেশি সুস্থ থাকবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। চুল কতবার আঁচড়ানো উচিত, তা নির্ভর করে চুলের ধরন, ব্যবহৃত ব্রাশ এবং দৈনন্দিন অভ্যাসের ওপর।
একসময় বিশ্বাস করা হতো, প্রতিরাতে ১০০ বার চুল ব্রাশ করলে চুল ভালো থাকে। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত আঁচড়ানোও চুলের ক্ষতি করতে পারে।
চুল আঁচড়ানোর ইতিহাস
চুলের যত্নে চিরুনি ও ব্রাশের ব্যবহার হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন সভ্যতাগুলোতে মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যচর্চার জন্য বিভিন্ন ধরনের চিরুনি ব্যবহার করত। ভিক্টোরিয়ান যুগে নারীদের দীর্ঘ চুল সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। তখন নিয়মিত চুল আঁচড়িয়ে মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল পুরো চুলে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। এতে চুল মসৃণ ও উজ্জ্বল দেখাত।
বেশি আঁচড়ালে কি চুল দ্রুত বাড়ে?
সংক্ষেপে উত্তর হলো, না। ক্যালিফোর্নিয়ার সেলুন মালিক ও হেয়ার বিশেষজ্ঞ নিকি করজিনের মতে, চুল বেশি আঁচড়ালে চুল দ্রুত বাড়ে না। চুলের বৃদ্ধি নির্ভর করে জিনগত বৈশিষ্ট্য, খাদ্যাভ্যাস, হরমোন এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর।
বরং গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত জোরে বা বারবার আঁচড়ালে চুলের গোড়ায় এবং চুলের শ্যাফটে চাপ পড়ে, যা ফাটা আগা ও ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ায়।
অতিরিক্ত আঁচড়ানোর ক্ষতি
আয়ারল্যান্ডের ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিনের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড টেলর ও তার সহকর্মীরা চুলের ক্ষতি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা যায়, চুলের জট ছাড়াতে বারবার টান পড়লে চুলের ভেতরে সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুলে রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট, অতিরিক্ত হিট ব্যবহার বা রং করার তুলনায় সাধারণ আঁচড়ানোর ক্ষতি অনেক কম। তবুও অতিরিক্ত চাপ দিয়ে ব্রাশ করা এড়িয়ে চলা উচিত।
নিয়মিত আঁচড়ানোর উপকারিতা
অন্যদিকে, একেবারেই চুল না আঁচড়ানোও ভালো নয়। নিয়মিত চুল আঁচড়ালে-
- বড় ধরনের জট তৈরি হয় না
- চুল ভাঙার ঝুঁকি কমে
- নতুন চুল গজায়
- মাথার ত্বকে জমে থাকা ময়লা ও মৃত কোষ দূর হয়
- চুলের প্রাকৃতিক তেল সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে
হেয়ার কেয়ার বিশেষজ্ঞ জ্যারেড রেনল্ডসের মতে, সপ্তাহে একবার খুব জোরে জট ছাড়ানোর চেয়ে প্রতিদিন হালকাভাবে চুল আঁচড়ানো অনেক কম ক্ষতিকর।
কতবার চুল আঁচড়ানো উচিত?
সোজা বা ঢেউ খেলানো চুল
মিয়ামিভিত্তিক হেয়ার বিশেষজ্ঞ নিকোলা লিঞ্চের পরামর্শ অনুযায়ী, সোজা বা হালকা ঢেউ খেলানো চুল হলে সপ্তাহে অন্তত তিনবার চুল আঁচড়ানো উচিত। অনেকের ক্ষেত্রে দিনে এক থেকে দুইবার আঁচড়ানোও উপকারী হতে পারে।
তবে ভেজা অবস্থায় এ ধরনের চুল আঁচড়ানো এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ ভেজা চুল দেখতে শক্ত মনে হলেও আসলে তখন চুল সবচেয়ে বেশি দুর্বল থাকে এবং সহজেই ভেঙে যেতে পারে।
কোঁকড়ানো বা খুব ঘন কার্লি চুল
কোঁকড়ানো, কিঙ্কি বা কয়েলি ধরনের চুলের ক্ষেত্রে নিয়ম একেবারে উল্টো।
এই ধরনের চুল শুকনো অবস্থায় আঁচড়ানো উচিত নয়। বরং চুল ধোয়ার সময় কন্ডিশনার বা ডিট্যাংলিং পণ্য ব্যবহার করে ভেজা অবস্থায় ধীরে ধীরে জট ছাড়ানো সবচেয়ে নিরাপদ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেলম্যান কলেজের রসায়ন ও জীবরসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মিশেল গেইনসের গবেষণায় দেখা গেছে, কোঁকড়ানো চুলের গঠন সোজা চুলের তুলনায় আলাদা। ফলে এ ধরনের চুল সহজে শুষ্ক হয়ে যায় এবং জট বাঁধার প্রবণতা বেশি থাকে।
কোন ধরনের ব্রাশ ব্যবহার করবেন?
চুলের ধরন অনুযায়ী সঠিক ব্রাশ নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ।
ভেজা চুলের জন্য নরম ও নমনীয় ডিট্যাংলিং ব্রাশ ব্যবহার করুন। শক্ত চিরুনি বা শক্ত ব্রাশ এড়িয়ে চলুন।
অন্যদিকে, শুকনো চুলের জন্য নরম ব্রিসলযুক্ত ব্রাশ ব্যবহার করুন। এটি মাথার ত্বকের প্রাকৃতিক তেল পুরো চুলে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে।
বর্তমানে অনেক বিশেষজ্ঞ এমন ব্রাশের পরামর্শ দেন যেখানে প্লাস্টিক পিন এবং নরম ব্রিসল একসঙ্গে থাকে। এতে জট ছাড়ানো এবং চুল মসৃণ রাখা দুটোই সহজ হয়।
চুল আঁচড়ানোর কোনো নির্দিষ্ট জাদুকরি সংখ্যা নেই। দিনে ১০০ বার ব্রাশ করার প্রয়োজনও নেই। বরং চুলের ধরন বুঝে সঠিক পদ্ধতিতে আঁচড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সোজা বা ঢেউ খেলানো চুল হলে দিনে এক থেকে দুইবার হালকা করে আঁচড়ানো যথেষ্ট। আর কোঁকড়ানো চুল হলে ভেজা অবস্থায় ধীরে ধীরে জট ছাড়ানোই সবচেয়ে ভালো উপায়।
মনে রাখতে হবে, সুন্দর চুলের রহস্য শুধু কতবার আঁচড়ালেন তার মধ্যে নয়, বরং কতটা যত্ন নিয়ে আঁচড়ালেন তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
সূত্র: বিবিসি






