logo

সেদ্ধ ডিমের কুসুমে সবুজ-কালচে দাগ কেন, খাওয়া কি নিরাপদ

সেদ্ধ ডিমের কুসুমে সবুজ-কালচে দাগ কেন, খাওয়া কি নিরাপদ
ছবি: থট কো

সকালের নাশতায় সেদ্ধ ডিম বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ডিম কাটার পর যদি দেখা যায়, হলুদ কুসুমের চারপাশে সবুজ বা কালচে-ধূসর একটি আস্তরণ তৈরি হয়েছে, তখন অনেকেই ভাবেন ডিমটি বুঝি নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ আবার স্বাস্থ্যের কথা ভেবে এমন ডিম ফেলে দেন।

তবে কুসুমের চারপাশে সবুজ রং দেখা গেলেই ডিম নষ্ট হয়ে গেছে, এমন নয়। সাধারণত ডিম বেশি সময় ধরে বা অতিরিক্ত তাপে সেদ্ধ করলে কুসুমের চারপাশে এই সবুজাভ রিং তৈরি হতে পারে। এর পেছনে রয়েছে ডিমের সালফার ও আয়রনের একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া।

কুসুম সবুজ হয়ে যায় কেন?

ডিমের সাদা অংশে সালফারযুক্ত যৌগ থাকে। অন্যদিকে কুসুমে থাকে আয়রন। ডিম দীর্ঘ সময় ধরে বেশি তাপে সেদ্ধ করলে সাদা অংশের সালফার ও কুসুমের আয়রনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়। এর ফলে আয়রন সালফাইড তৈরি হয়ে কুসুমের বাইরের দিকে সবুজাভ বা ধূসর রঙের আস্তরণ দেখা দিতে পারে।

অর্থাৎ কুসুমের রং বদলানোর অর্থ এই নয় যে ডিমের মধ্যে কোনো বিষাক্ত পদার্থ তৈরি হয়েছে। মূলত অতিরিক্ত সেদ্ধ করার কারণে স্বাভাবিক রাসায়নিক পরিবর্তন থেকেই এই রং তৈরি হয়।

কিছু ক্ষেত্রে রান্নার পানিতে আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকলেও কুসুমে সবুজ রং দেখা দিতে পারে।

সবুজ কুসুমের ডিম কি খাওয়া নিরাপদ?

হ্যাঁ, শুধু কুসুমের চারপাশে সবুজ রিং তৈরি হয়েছে বলে ডিম ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের খাদ্যনিরাপত্তা সংস্থা ইউএসডিএ জানিয়েছে, অতিরিক্ত সেদ্ধ করার কারণে কুসুমের চারপাশে তৈরি হওয়া সবুজ রং খাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ।

তবে ডিম নিরাপদ কি না, তা শুধু কুসুমের রং দেখে বিচার করা উচিত নয়। ডিম নষ্ট হয়েছে কি না বোঝার ক্ষেত্রে দুর্গন্ধ, অস্বাভাবিক চেহারা এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।


বেশি সময় সেদ্ধ করলে শুধু রংই বদলায় না

অতিরিক্ত সময় ধরে ডিম সেদ্ধ করলে কুসুমের চারপাশে সবুজ রিং তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ডিমের গঠনও শক্ত ও কিছুটা রাবারের মতো হয়ে যেতে পারে। ফলে স্বাদ ও খাওয়ার আরাম কমে যেতে পারে।

তাই ডিম পুরোপুরি সেদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে ফোটানোর দরকার নেই। সঠিকভাবে সেদ্ধ করার পর দ্রুত ঠান্ডা করে নিলে অতিরিক্ত তাপের প্রভাবও কমানো যায়।

ডিম সেদ্ধ করার পর ঠান্ডা পানিতে রাখবেন কেন?

ডিম সেদ্ধ হয়ে গেলে গরম পানি থেকে তুলে ঠান্ডা পানিতে রাখা একটি ভালো অভ্যাস। এতে ডিমের ভেতরের তাপ দ্রুত কমে যায়। ফলে অতিরিক্ত রান্না চলতে থাকে না এবং কুসুমের চারপাশে সবুজ রিং তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও কমে।

সেদ্ধ করার পর ডিমকে ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে রাখা ভালো বলে বিভিন্ন গবেষণাও জানাচ্ছে।

কতক্ষণ ডিম সেদ্ধ করবেন?

সেদ্ধ ডিমের কাঙ্ক্ষিত গঠন অনুযায়ী সময় কিছুটা বদলাতে পারে। তবে ডিম নিরাপদভাবে রান্না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইউএসডিএর পরামর্শ অনুযায়ী, ডিমের সাদা অংশ ও কুসুম দুটোই ভালোভাবে জমাট হওয়া পর্যন্ত রান্না করা উচিত। ডিমজাত খাবারের নিরাপদ ন্যূনতম অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

অর্থাৎ শুধু কুসুমের রং দেখে ডিম নিরাপদ কি না সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। পর্যাপ্ত তাপে সঠিকভাবে রান্না করাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

কালচে কুসুম দেখলেই কি ডিম ফেলে দিতে হবে?

শুধু কুসুমের বাইরের দিকে সবুজ বা ধূসর রং দেখা গেলে সাধারণত ডিম ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি অতিরিক্ত রান্নার কারণে হওয়া রাসায়নিক পরিবর্তন হতে পারে।

তবে ডিমে যদি অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ থাকে, সাদা অংশ বা কুসুমের চেহারা অস্বাভাবিকভাবে বদলে যায় কিংবা ডিমটি দীর্ঘ সময় ঘরের তাপমাত্রায় পড়ে থাকে, তখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

ইউএসডিএর তথ্য অনুযায়ী, ডিম রান্নার পর দ্রুত পরিবেশন করা অথবা দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা উচিত। রান্না করা ডিম সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্যবহার করা ভালো।

ডিম নিরাপদ রাখতে কী করবেন?

ডিম রান্নার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা ভালো-

  • ডিম ভালোভাবে সেদ্ধ করুন
  • অতিরিক্ত সময় ধরে রান্না করবেন না
  • সেদ্ধ হওয়ার পর দ্রুত ঠান্ডা করুন
  • রান্না করা ডিম দ্রুত খেয়ে ফেলুন অথবা ফ্রিজে রাখুন
  • রান্না করা ডিম ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্যবহার করুন
  • দুর্গন্ধযুক্ত বা অস্বাভাবিক চেহারার ডিম খাবেন না
  • কাঁচা বা আধাসেদ্ধ ডিম খাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্ক থাকুন

কাঁচা বা কম সেদ্ধ ডিমে ক্ষতিকর জীবাণু থাকার ঝুঁকি থাকে। তাই বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তিদের ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়া উচিত।

সেদ্ধ ডিমের কুসুমের চারপাশে সবুজ বা কালচে রং দেখলেই ভয় পাওয়ার কারণ নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় বা বেশি তাপে সেদ্ধ করার কারণে ডিমের সাদা অংশের সালফার ও কুসুমের আয়রনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয়ে এই রং তৈরি হয়। এমন সবুজ রিংযুক্ত কুসুম সাধারণত খাওয়া নিরাপদ।

তবে ডিমের নিরাপত্তা শুধু রং দেখে বিচার করা উচিত নয়। ডিম কীভাবে রান্না ও সংরক্ষণ করা হয়েছে, দুর্গন্ধ আছে কি না এবং খাবারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিম ভালোভাবে রান্না করুন, অতিরিক্ত সেদ্ধ করা এড়িয়ে চলুন এবং রান্না করা ডিম দ্রুত ঠান্ডা করে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করুন।

সূত্র: টিভি ৯