logo

ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় বা চিৎকার করেন, কখন সতর্ক হওয়া জরুরি

ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় বা চিৎকার করেন, কখন সতর্ক হওয়া জরুরি
ছবি: ফ্রম নিউট্রিশন

ঘুমের মধ্যে হঠাৎ কথা বলা, বিড়বিড় করা কিংবা কখনো জোরে চিৎকার করে ওঠার ঘটনা অনেকেরই হয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের এই আচরণের কথা মনে না থাকাও স্বাভাবিক। পাশে থাকা মানুষই হয়তো জানান, রাতে আপনি কথা বলেছেন বা কিছু বলেছেন।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে কথা বলা বা স্লিপ টকিং গুরুতর কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। এটি একটি ধরনের প্যারাসমনিয়া, অর্থাৎ ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ বা ঘটনা। তবে এর সঙ্গে যদি চিৎকার, হাত-পা ছোড়া, লাথি মারা কিংবা স্বপ্নের দৃশ্য অনুযায়ী শরীর নড়াচড়া করার মতো আচরণ যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি আলাদা করে দেখা প্রয়োজন।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা কেন হয়?

ঘুমের মধ্যে কথা বলাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সমনিলোকুই (somniloquy) বলা হয়। ঘুমের যেকোনো পর্যায়েই এটি হতে পারে। কেউ ফিসফিস করে কথা বলেন, কেউ অস্পষ্ট শব্দ করেন, আবার কেউ পরিষ্কার বাক্য বা কথোপকথনের মতো শব্দও বলতে পারেন। অনেক সময় ঘুমন্ত ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারেন না যে তিনি কথা বলছেন।

ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটলে এমন ঘটনা বাড়তে পারে। যেমন-

  • ঘুমের ঘাটতি
  • অনিয়মিত ঘুমের সময়
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগ
  • জেট ল্যাগ বা সময়ের বড় পরিবর্তন
  • ঘুমের মান খারাপ হওয়া
  • স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো ঘুমের সমস্যা
  • অ্যালকোহল বা কিছু পদার্থের ব্যবহার

তবে ঘুমের মধ্যে কথা বলার সঠিক কারণ সবসময় শনাক্ত করা যায় না।

স্বপ্ন দেখার সময়ই কি মানুষ কথা বলে?

সবসময় নয়। ঘুমের মধ্যে কথা বলা REM এবং non-REM, দুই ধরনের ঘুমের পর্যায়েই হতে পারে। তাই কেউ ঘুমের মধ্যে কথা বলছেন মানেই তিনি যে স্বপ্ন দেখছিলেন এবং সেই স্বপ্নের কথাই বলছিলেন, এমন ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

অনেক ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে বলা কথার সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোনো অর্থপূর্ণ সম্পর্কও থাকে না। তাই ঘুমের মধ্যে কেউ কিছু বললে সেটিকে তার গোপন কথা বা সত্যিকারের মনের কথা হিসেবে ধরে নেওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

কখন ঘুমের মধ্যে কথা বলা চিন্তার বিষয়?

শুধু বিড়বিড় করা বা মাঝেমধ্যে কয়েকটি কথা বলা সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। কিন্তু আচরণটি হঠাৎ প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে শুরু হলে, খুব ঘন ঘন হলে বা এর সঙ্গে অন্য অস্বাভাবিক আচরণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বিশেষ করে নিচের লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার

ঘুমের মধ্যে জোরে চিৎকার করা

ঘুমের মধ্যে নিয়মিত চিৎকার, ভয় পাওয়ার মতো শব্দ বা তীব্র আবেগ প্রকাশ করা সাধারণ ঘুমের মধ্যে কথা বলার চেয়ে আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে এটি যদি নতুন করে শুরু হয় বা ক্রমে বাড়তে থাকে, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

হাত-পা ছোড়া বা লাথি মারা

ঘুমের মধ্যে ঘুষি মারা, লাথি দেওয়া, হাত-পা ছোড়া কিংবা বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠার মতো আচরণ হলে সতর্ক হওয়া দরকার। এ ধরনের আচরণ রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার (REM sleep behavior disorder) বা অন্য কোনো প্যারাসমনিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

স্বপ্ন অনুযায়ী শরীর নড়াচড়া করা

কেউ যদি ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে কাউকে তাড়া করার মতো আচরণ করেন, আত্মরক্ষার মতো হাত-পা চালান বা স্বপ্নের ঘটনার সঙ্গে মিল রেখে চিৎকার করেন, সেটি রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডারের একটি লক্ষণ হতে পারে। এই অবস্থায় স্বাভাবিক REM ঘুমের সময় শরীরের পেশিতে যে সাময়িক স্থিরতা তৈরি হয়, তা ঠিকমতো কাজ না করায় মানুষ স্বপ্নের আচরণ বাস্তবে করে ফেলতে পারেন।

নিজের বা পাশে থাকা মানুষের আঘাত লাগছে

ঘুমের মধ্যে অতিরিক্ত নড়াচড়ার কারণে নিজে বিছানা থেকে পড়ে যাওয়া বা পাশে থাকা ব্যক্তিকে আঘাত করার ঘটনা ঘটলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে এমন আঘাতের ঝুঁকি থাকতে পারে।

দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম ঘুম ভাব থাকে

ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণের পাশাপাশি দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব থাকলে ঘুমের মান ভালো হচ্ছে কি না, সেটিও দেখা প্রয়োজন। স্লিপ অ্যাপনিয়াসহ কিছু ঘুমের সমস্যা রাতে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করতে পারে।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা আর রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার কি এক?

না। দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়।

সাধারণত এ সমস্যা থাকলে মানুষ ঘুমের মধ্যে কথা বলতে পারেন, কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর সঙ্গে বিপজ্জনক শারীরিক আচরণ থাকে না। অন্যদিকে রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডারের সমস্যা থাকলে মানুষ স্বপ্নের বিষয়বস্তু অনুযায়ী কথা বলা, চিৎকার করা, হাত-পা ছোড়া, ঘুষি বা লাথি মারার মতো আচরণ করতে পারেন।

রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার বিশেষভাবে চিকিৎসকের মূল্যায়নের দাবি রাখে। কিছু ক্ষেত্রে এটি স্নায়বিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে ঘুমের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ হলেই কারও এমন রোগ আছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত নয়।

ঘুমের মধ্যে কথা বলা কমাতে কী করবেন?

যদি অন্য কোনো গুরুতর লক্ষণ না থাকে, ঘুমের মান ভালো করার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। নিয়মিত সময়ে ঘুমানো, পর্যাপ্ত ঘুম নেওয়া এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনা কমানো উপকারী হতে পারে। এ ছাড়া-

  • প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যান ও উঠুন
  • ঘুমের ঘাটতি হতে দেবেন না
  • অতিরিক্ত ক্যাফেইন এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর
  • ঘুমের আগে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
  • ঘুমের পরিবেশ শান্ত ও আরামদায়ক রাখুন
  • অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকলে তা কমানোর চেষ্টা করুন

ঘুমের নিয়ম ঠিক করার পরও সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

ঘুমের মধ্যে কথা বলা হঠাৎ প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে শুরু হলে, নিয়মিত চিৎকার বা হিংস্র নড়াচড়া হলে কিংবা নিজের বা অন্যের আঘাতের ঝুঁকি তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ঘুমের পাশাপাশি অতিরিক্ত দিনের ঘুম, বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া বা হাঁসফাঁস করে ওঠার মতো সমস্যা থাকলেও মূল্যায়ন প্রয়োজন।

প্রয়োজনে চিকিৎসক ঘুমের ইতিহাস, ওষুধ ব্যবহারের তথ্য এবং অন্যান্য উপসর্গ বিবেচনা করতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে sleep study বা polysomnography করা হতে পারে, বিশেষ করে রেম স্লিপ বিহেভিয়ার ডিসঅর্ডার সন্দেহ হলে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ঘুমের মধ্যে মাঝেমধ্যে কথা বলা সাধারণ একটি ঘটনা হতে পারে। তাই শুধু কথা বলার কারণে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এর সঙ্গে যদি চিৎকার, ঘুষি, লাথি, বিছানা থেকে পড়ে যাওয়া বা স্বপ্নের দৃশ্য অনুযায়ী শরীরের তীব্র নড়াচড়া যুক্ত হয়, তখন সেটিকে সাধারণ ঘুমের মধ্যে কথা বলার সমস্যা ধরে উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

সূত্র: নিউজ ১৮