logo

সকালের নাশতা থেকে ব্যায়ামের আগে, কখন কলা খাওয়া সবচেয়ে ভালো

সকালের নাশতা থেকে ব্যায়ামের আগে, কখন কলা খাওয়া সবচেয়ে ভালো
ছবি: ভেরি ওয়েল হেল্থ

কলা এমন একটি ফল, যা প্রায় সারা বছরই সহজে পাওয়া যায়। দাম তুলনামূলক কম, খেতে সহজ এবং পুষ্টিগুণও রয়েছে বেশ। তাই সকালের নাশতা থেকে শুরু করে ব্যায়ামের আগে বা বিকেলের ক্ষুধায় অনেকেই কলা খান। কিন্তু কলা খাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময় কি আছে? সকালে খাওয়া ভালো, নাকি শরীরচর্চার আগে? আবার রাতে কলা খেলে কি কোনো সমস্যা হতে পারে?

আসলে কলা খাওয়ার জন্য সবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সেরা সময় নেই। কখন এবং কতটা কলা খাবেন, তা অনেকটাই নির্ভর করে আপনার দৈনন্দিন কাজ, শারীরিক পরিশ্রম, খাবারের ধরন ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের ওপর। তবে দিনের বিভিন্ন সময়ে কলা খেলে শরীরে এর উপকার কিছুটা ভিন্নভাবে কাজে লাগতে পারে।

সকালে কলা খেলে কী হয়?

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের জন্য দ্রুত শক্তির প্রয়োজন হতে পারে। কলায় কার্বোহাইড্রেট রয়েছে, যা শরীরকে শক্তি দিতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে পটাশিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং আঁশও রয়েছে।

তাই সকালের নাশতার সঙ্গে কলা রাখা যেতে পারে। তবে শুধু একটি কলা খেয়ে সকালের খাবার শেষ না করে এর সঙ্গে ডিম, দই, দুধ, বাদাম বা অন্য কোনো পুষ্টিকর খাবার রাখলে নাশতা আরও ভারসাম্যপূর্ণ হয়।

কলা খেলে কিছু সময়ের জন্য পেট ভরা অনুভূতিও হতে পারে। ফলে সকালের ব্যস্ত সময়ে সহজে খাওয়া যায় এমন খাবার হিসেবে কলা বেশ সুবিধাজনক।

ব্যায়ামের আগে কলা খাওয়া কি ভালো?

যাঁরা নিয়মিত হাঁটা, দৌড়ানো বা শরীরচর্চা করেন, তাঁদের জন্য ব্যায়ামের আগে কলা একটি সহজ খাবার হতে পারে।

কলা থেকে পাওয়া কার্বোহাইড্রেট শরীরকে ব্যায়ামের সময় প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে সাহায্য করতে পারে। এতে থাকা পটাশিয়ামও শরীরের স্বাভাবিক পেশি ও স্নায়ুর কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ব্যায়ামের আগে কলা খেলে কতটা উপকার হবে, তা ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে ব্যায়ামের কিছুক্ষণ আগে কলা খেলে ভালো লাগে, আবার কারও পেট ভার লাগতে পারে। তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে সময় ঠিক করা ভালো।

ব্যায়ামের কতক্ষণ আগে কলা খাবেন?

এক্ষেত্রে সবার জন্য একই সময় নির্ধারণ করা যায় না। সাধারণভাবে ব্যায়ামের আগে খুব ভারী খাবার না খেয়ে সহজপাচ্য কিছু খাওয়া সুবিধাজনক।

একটি কলা অনেকের জন্য ব্যায়ামের আগে হালকা খাবার হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে ব্যায়ামের ধরন, সময় ও ব্যক্তির হজমক্ষমতার ওপর নির্ভর করে খাবারের সময় পরিবর্তন করা যেতে পারে।

দীর্ঘ সময় বা বেশি পরিশ্রমের ব্যায়াম করলে শুধু কলার ওপর নির্ভর না করে সামগ্রিক খাবারের পরিকল্পনার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ব্যায়ামের পর কলা খাওয়া যায়?

হ্যাঁ, ব্যায়ামের পরও কলা খাওয়া যেতে পারে।

শরীরচর্চার পর শরীরের শক্তির ঘাটতি পূরণ করতে কার্বোহাইড্রেট প্রয়োজন হতে পারে। কলা সেই খাবারের একটি অংশ হতে পারে। তবে পেশির পুনরুদ্ধারের জন্য শুধু কলা যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে দুধ, দই, ডিম, বাদাম বা অন্য কোনো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা যেতে পারে।

রাতে কলা খাওয়া কি ক্ষতিকর?

রাতে কলা খাওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যে নানা ধারণা রয়েছে। কিন্তু সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের জন্য রাতে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়া নিজে থেকেই ক্ষতিকর, এমন প্রমাণ নেই।

রাতে ক্ষুধা লাগলে একটি কলা হালকা খাবার হিসেবে নেওয়া যেতে পারে। তবে কারও যদি কলা খেলে পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা অন্য কোনো সমস্যা হয়, তাহলে রাতে না খাওয়াই ভালো।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মোট খাবারের পরিমাণ এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যের অবস্থা।

রাতে কলা খেলে কি ওজন বাড়ে?

শুধু রাতে কলা খাওয়ার কারণে ওজন বেড়ে যাবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। ওজন বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে সারাদিনে মোট কত ক্যালরি গ্রহণ করছেন এবং কতটা শারীরিক পরিশ্রম করছেন, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কলায় প্রাকৃতিক শর্করা ও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে কতটা কলা খাচ্ছেন এবং দিনের অন্যান্য খাবারের সঙ্গে সেটি কীভাবে মিলছে, সেদিকে নজর রাখা উচিত।

কলায় কী কী পুষ্টি রয়েছে?

কলা শুধু মিষ্টি স্বাদের ফল নয়। এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে।

পটাশিয়াম: কলা পটাশিয়ামের পরিচিত উৎস। পটাশিয়াম শরীরের তরল ভারসাম্য, স্নায়ুর কার্যক্রম এবং পেশির স্বাভাবিক কাজের জন্য প্রয়োজনীয়।

আঁশ (ফাইবার): কলা থেকে খাদ্যআঁশ পাওয়া যায়। খাদ্যআঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে এবং পেট ভরা অনুভূতি দিতে পারে।

ভিটামিন বি৬: কলায় ভিটামিন বি৬ রয়েছে। এই ভিটামিন শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।

কার্বোহাইড্রেট: কলা কার্বোহাইড্রেটের একটি সহজ উৎস। তাই ব্যস্ত দিনের শুরুতে বা শরীরচর্চার আগে এটি দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

খালি পেটে কলা খাওয়া উচিত?

খালি পেটে কলা খাওয়া নিয়ে অনেক ধরনের কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু সুস্থ মানুষের জন্য খালি পেটে কলা খাওয়া সবার ক্ষেত্রেই ক্ষতিকর, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই।

তবে কারও যদি খালি পেটে কলা খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি হয়, তাহলে অন্য খাবারের সঙ্গে খেতে পারেন।

সকালে কলা খেলে এর সঙ্গে প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বির উৎস যোগ করলে খাবারটি আরও ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।

ডায়াবেটিস থাকলে কলা খাওয়া যাবে?

ডায়াবেটিস থাকলে কলা একেবারেই খাওয়া যাবে না, এমন নয়। তবে কলায় কার্বোহাইড্রেট ও প্রাকৃতিক শর্করা রয়েছে। তাই পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।

কলা কতটা খাবেন এবং কখন খাবেন, তা ব্যক্তির রক্তে শর্করার মাত্রা, অন্যান্য খাবার ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে পারে।

বিশেষ করে ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন ব্যবহার করলে নিজের খাদ্যতালিকায় বড় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

যাদের কিডনির সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা

কলায় পটাশিয়াম রয়েছে। কিডনির কিছু রোগে শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের করে দেওয়া কঠিন হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা রক্তে পটাশিয়াম বেশি থাকার সমস্যা থাকলে নিজের ইচ্ছায় বেশি পরিমাণে কলা খাওয়া ঠিক নয়।

এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী ফলের পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত।

দিনে কতটা কলা খাবেন?

সুস্থ মানুষের জন্য কলার পরিমাণ নির্ধারণে সবার জন্য একই নিয়ম নেই। বয়স, দৈনিক শারীরিক পরিশ্রম, মোট খাবারের পরিমাণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

সাধারণভাবে একটি কলা খাবারের অংশ হিসেবে রাখা যেতে পারে। তবে দিনে অনেকগুলো কলা খেয়ে অন্য ফল, শাকসবজি ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়।

একটি সুষম খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল রাখা ভালো।

কলা খাওয়ার সময় নিয়ে সহজ নিয়ম

আপনি যদি কলা খাওয়ার সঠিক সময় নিয়ে দ্বিধায় থাকেন, তাহলে কয়েকটি সহজ নিয়ম মনে রাখতে পারেন।

সকালে: নাশতার সঙ্গে কলা খেতে পারেন।

ব্যায়ামের আগে: দ্রুত শক্তির প্রয়োজন হলে কলা হালকা খাবার হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।

ব্যায়ামের পরে: অন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে কলা খাওয়া যেতে পারে।

বিকেলে: ক্ষুধা লাগলে অস্বাস্থ্যকর নাশতার পরিবর্তে কলা একটি সহজ বিকল্প হতে পারে।

রাতে: সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত কলা খাওয়া সাধারণত সমস্যা নয়, যদি এতে ব্যক্তিগত অস্বস্তি না হয়।

কলা খাওয়ার জন্য সকাল, দুপুর বা রাতের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট সময়কেই সবার জন্য সেরা বলা যায় না। আপনার শরীর, দৈনন্দিন কাজ, ব্যায়ামের সময় এবং মোট খাবারের ওপর নির্ভর করেই কলা খাওয়ার সময় ঠিক করা ভালো।

সকালে নাশতার সঙ্গে, ব্যায়ামের আগে বা পরে কিংবা বিকেলের হালকা খাবার হিসেবে কলা খাওয়া যেতে পারে। রাতে খাওয়াও সুস্থ মানুষের জন্য সাধারণভাবে নিষিদ্ধ নয়।

তবে ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলে কতটা কলা খাবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো। আর শুধু কলার সময় নিয়ে চিন্তা না করে সারাদিনের খাবারে ফল, শাকসবজি, প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ভারসাম্য রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র: আনন্দবাজার