গভীর খাদে বাংলাদেশ: মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান সংকটে, মানুষ নষ্টের প্রক্রিয়া সক্রিয়

একটি শিশু ভালো বা মন্দ, সৎ বা অসৎ, মানবিক বা নিষ্ঠুর হয়ে জন্মায় না। ধীরে ধীরে তার পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চারপাশের পরিবেশ তাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তার ভাষা, আচরণ, মূল্যবোধ, রুচি, জীবনযাপন, অন্যের প্রতি সম্মান এবং ভালো-মন্দের বোধ তৈরি হয় এই পরিবেশের মধ্য দিয়েই।
সাধারণভাবে চারটি প্রধান প্রতিষ্ঠান একটি শিশুকে মানুষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে: পরিবার, কমিউনিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় উদ্বেগের বিষয় হলো, মানুষ গড়ার এই প্রতিষ্ঠানগুলোই নানা সংকটে পড়েছে। একই সময়ে, মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল, অসুস্থ ও মানবিকতাহীন করে তোলার প্রক্রিয়াগুলোও সমাজে অত্যন্ত সক্রিয় ও শক্তিশালী। অনিরাপদ খাবার, মাদক, অশালীনতা ও অশ্লীলতা, প্রতারণা এবং নানা ধরনের অনৈতিক প্রবণতা ধীরে ধীরে মানুষের দেহ, মন ও আত্মাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ভালো মানুষ হয়ে ওঠার পথ কঠিন হচ্ছে, অথচ খারাপ হয়ে যাওয়ার উপাদানগুলো সহজলভ্য হয়ে উঠছে। এটি জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়।
মানুষ গড়ার চার প্রতিষ্ঠানই যখন গভীর সংকটে
একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় পরিবার। সে কথা শেখার আগেই আচরণ শেখে। পরিবারের বড়রা কীভাবে কথা বলেন, একে অপরকে কতটা সম্মান করেন, ভুল করলে তা স্বীকার করেন কি না, অন্যের প্রতি কেমন আচরণ করেন, অসহায় মানুষকে কীভাবে দেখেন, এমনকি খাবার ও জীবনযাপনের অভ্যাসও শিশু পর্যবেক্ষণ করে শেখে। তাই শিশুকে সততা বা মানবিকতার উপদেশ দেওয়ার চেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিজেদের আচরণ অনেক বেশি কার্যকর শিক্ষা দেয়।
পরিবারে যদি ভালোবাসা, সততা, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ ও সহমর্মিতার চর্চা থাকে, শিশুর চরিত্রে তার ভিত্তি তৈরি হয়। বিপরীতে মিথ্যা, প্রতারণা, অসহিষ্ণুতা, অশালীনতা বা অন্যের প্রতি অসম্মান যদি স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়, শিশুও সেগুলোকে স্বাভাবিক বলে গ্রহণ করে।
কিন্তু শিশুর পৃথিবী পরিবারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটু বড় হলেই সে প্রতিবেশী, বন্ধু, খেলার মাঠ এবং স্থানীয় সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়। এভাবেই তৈরি হয় তার কমিউনিটি। কমিউনিটিও এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়। সেখানে সে ভাগাভাগি করতে শেখে, বন্ধুত্ব করতে শেখে, মতের অমিল মোকাবিলা করতে শেখে, অন্যকে সম্মান করতে শেখে।
একটি এলাকায় খেলার মাঠ, পাঠাগার, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ থাকলে তা শিশুর সুস্থ বিকাশে সহায়তা করে। বিপরীতে মাদক, অপরাধ, সহিংসতা, অসামাজিক আচরণ কিংবা নিরাপত্তাহীনতা যদি কমিউনিটির স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে ওঠে, শিশুর ওপর তার প্রভাব পড়বেই।
আমাদের নগরজীবনে শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। খেলার মাঠ কমছে, অবাধে খেলাধুলার সুযোগ কমছে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসরও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। এর জায়গা নিচ্ছে ঘরবন্দি জীবন ও অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা। ফলে শিশুর স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের জায়গাটিও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এরপর আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পরিবার ও কমিউনিটির বাইরে শিশুকে জ্ঞান, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব শেখানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান হলো বিদ্যালয়। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সাফল্যকে ক্রমেই পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে বেশি করে যুক্ত করা হয়েছে। কে কত নম্বর পেল, কোন প্রতিষ্ঠানের ফলাফল কত ভালো, কে কোথায় ভর্তি হলো, এসব নিয়ে আমাদের উদ্বেগ আছে। কিন্তু একজন শিক্ষার্থী কতটা সৎ, দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল বা আত্মনিয়ন্ত্রিত মানুষ হয়ে উঠল, সে প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
অবশ্যই ভালো ফলাফল ও দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু শিক্ষা যদি মানুষকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে না পারে, তাহলে তার উদ্দেশ্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়। জ্ঞান ও দক্ষতা নৈতিকতার সঙ্গে যুক্ত না হলে তা সবসময় সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
চতুর্থ শক্তিশালী প্রভাবক হলো সংস্কৃতি ও গণমাধ্যম। ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের সন্তানদের জন্য জ্ঞান, যোগাযোগ ও সৃজনশীলতার অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে অশালীনতা ও অশ্লীলতা, সহিংসতা, ভোগবাদ, মিথ্যা তথ্য, প্রতারণা ও দায়িত্বহীন আচরণের নানা উপস্থাপনাও এখন হাতের মুঠোয়।
সমস্যা প্রযুক্তি নিজে নয়। সমস্যা হলো, আমরা শিশু-কিশোরদের এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে ছেড়ে দিচ্ছি, যেখানে ভালো-মন্দ বেছে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হওয়ার আগেই তারা অসংখ্য কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি মূল্যবোধ ও বিচারবোধ তৈরি করাও এখন জরুরি।
মানুষ নষ্ট করার প্রক্রিয়াগুলো যখন অত্যন্ত সক্রিয়
মানুষ তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার পাশাপাশি কয়েকটি শক্তিশালী নেতিবাচক প্রবণতা আমাদের সমাজকে আঘাত করছে।
প্রথমত, অনিরাপদ খাদ্য। খাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, অথচ খাদ্যে ভেজাল, দূষণ বা অনিরাপদ উপাদানের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। এর প্রভাব শুধু বর্তমানের অসুস্থতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার ওপরও পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও গভীর। একটা প্রজন্মকে সুস্থভাবে গড়ে তুলতে হলে নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়, মৌলিক অধিকার।
দ্বিতীয়ত, মাদক। এটি শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি পরিবার, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং মানবসম্পদের সমস্যা। একজন তরুণ মাদকে আক্রান্ত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার পরিবার এবং সমাজের ভবিষ্যৎও।
তৃতীয়ত, অশ্লীলতার বিস্তার এখন আমাদের সমাজের জন্য একটি গুরুতর হুমকি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অশালীন কনটেন্টের সহজলভ্যতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেক ক্ষেত্রে তা বিনোদনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। যখন অশালীন ভাষা, যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কনটেন্ট বা নারীর প্রতি অসম্মানজনক উপস্থাপনাকে আমরা হাসি-তামাশা ও বিনোদন হিসেবে গ্রহণ করি, তখন অস্বাভাবিকতাই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এর প্রভাব ব্যক্তির চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পরিবার, পারস্পরিক সম্মান ও সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে।
চতুর্থত, প্রতারণা এখন সমাজের গভীরে শিকড় গেড়েছে। অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া পরিচয়, আর্থিক জালিয়াতি, প্রতারণামূলক ব্যবসা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন লেনদেনেও অসততার নানা রূপ ছড়িয়ে পড়ছে। আরও ভয়াবহ হলো, অনেক ক্ষেত্রে অন্যকে ঠকিয়ে লাভবান হওয়াকে ‘চতুরতা’ এবং অসততাকে ‘স্মার্টনেস’ হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
সমাধান কীভাবে
অনিরাপদ খাদ্য, মাদক, অশ্লীলতা ও প্রতারণা বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এগুলো মানুষের শরীর, মন, চরিত্র ও সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে। আর মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দুর্বল থাকে, তখন এসব নেতিবাচক শক্তি আরও দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তাই এই সংকটকে আর শুধু সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সমস্যা হিসেবে নিতে হবে।
সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে নিরাপদ খাদ্য, মাদক নিয়ন্ত্রণ ও অনলাইন প্রতারণা মোকাবিলায় কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারকে মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সর্বস্তরে গণজাগরণ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং সরকারকে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সরকার একা পারবে না, আবার জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও সফল হবে না।
সংকট যত গভীরে যাবে, বাংলাদেশকে সেই খাদ থেকে তুলে আনা তত কঠিন হবে। তাই এখনই সময় মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং মানুষ নষ্ট করার প্রক্রিয়াগুলোকে প্রতিহত করা।
আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের জন্য শুধু ভালো স্কুল, ভালো চাকরি বা ভালো অর্থনীতি নয়, একটি ভালো সমাজও তৈরি করতে হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র পরিচালনা করবে মানুষ, অর্থনীতি চালাবে মানুষ, প্রযুক্তি ব্যবহার করবে মানুষ এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে মানুষ।
একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানুষ। তাই মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা এবং মানুষ নষ্ট করার শক্তিগুলোকে প্রতিহত করা এখন আর শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার জাতীয় দায়িত্ব। এখনই সময় জাগার, এখনই সময় সম্মিলিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার।
লেখক: সৈয়দ আব্দুল হামিদ। অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ (ওয়েফি)।


