আলজাজিরার কলাম/সুদানে বারবার কেন গণহত্যা হচ্ছে

গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার তুর্ক এল-ওবেইদ শহরের জন্য ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছেন। শহরটি মধ্য সুদানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও পণ্য পরিবহন কেন্দ্র। ৪০ মাস ধরে চলা সুদানের সেনাবাহিনী এবং আরএসএফ বাহিনীর যুদ্ধে শহরটি এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। চলমান যুদ্ধের ফলে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছে এবং দেশের অর্ধেক মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভর করছে।
জুন মাসে আরএসএফ এই শহরে ২৭টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা যুদ্ধের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল জ্বালানি ডিপো, পানির পাম্প এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো। ফলে ৫ লাখ বাসিন্দার জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আরএসএফ শহর থেকে বের হওয়ার রাস্তাগুলোও বন্ধ করে দিয়েছে। তবে সুদানের সেনাবাহিনী একটি গুরুত্বপূর্ণ হাইওয়ে পুনরায় দখল করায় সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। আমেরিকা এবং অন্যান্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে।
গত বছর আরএসএফ যখন এল-ফাশের শহর ঘেরাও করেছিল, তখন মাত্র কয়েক দিনে ৬ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে। একই সময় অসংখ্য মানুষ নির্যাতন ও ধর্ষণের শিকার হয়। জাতিসংঘ একে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর আগে এল-জেনেইনা শহরেও একই ধরনের গণহত্যা হয়েছিল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন একে গণহত্যা বললেও সহিংসতা থামানোর জন্য বড় কোনো আন্তর্জাতিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
ইতিহাস বলছে, শুধু ‘গণহত্যা’ নাম দিলেই তা থেমে যায় না। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় গণহত্যার সময়ও আমেরিকা জানত কী ঘটছে, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ারেন ক্রিস্টোফার এটি মানতে দ্বিধা করেছিলেন, কারণ ‘গণহত্যা’ হিসেবে ঘোষণা করলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তা থামানোর বাধ্যবাধকতা তৈরি হতো।
রুয়ান্ডা এবং বসনিয়ার ব্যর্থতার পর বিশ্ব নেতারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এর মতো সংস্থা তৈরি করেছিলেন যাতে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়। ২০০৪ সালে জর্জ বুশ প্রশাসন দারফুরের হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে বিশ্বকে সজাগ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০ বছর পর সেই একই অপরাধ সুদানে আবারও ঘটছে। এখন এটি শুধু একটি গণহত্যা নয়, বরং অনেকগুলো গণহত্যা একসঙ্গে ঘটছে।
বর্তমানে আমেরিকা নিজেই আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, বর্তমানে কোনো দেশই এই যুদ্ধ থামাতে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ করতে চায় না। সুদান একটি বড় এবং সম্পদশালী দেশ হলেও বড় শক্তিগুলোর কাছে এটি তাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমেরিকা তার বন্ধু দেশগুলোকে (যেমন তুরস্ক, মিশর, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত) সুদানে অস্ত্র বিক্রি এবং স্বর্ণ উত্তোলনের সুযোগ করে দিচ্ছে, যা এই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করছে। জি-৭ ভুক্ত দেশগুলো শুধু এই যুদ্ধের নিন্দা জানাচ্ছে, কিন্তু হামলা থামানোর জন্য তারা কার্যকর কিছুই করছে না।
শুধু নিন্দা জানিয়ে এল-ওবেইদ শহরের পরবর্তী গণহত্যা থামানো সম্ভব নয়। প্রশ্ন থেকে যায়, আর কতগুলো গণহত্যা ঘটলে বিশ্ব নেতারা এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন?
লেখক: ক্যামেরন হাডসন একজন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বিশ্লেষক। তিনি মূলত আফ্রিকা নিয়ে কাজ করেন। এর আগে তিনি বুশ প্রশাসনের সময় মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি সুদানের জন্য নিযুক্ত আমেরিকার বেশ কয়েকজন বিশেষ দূতের চিফ অফ স্টাফ হিসেবেও কাজ করেছেন।
.png)


