আলজাজিরার কলাম/রাশিয়ার পুরোনো পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর নিষ্ক্রিয়করণের খরচ কে দেবে

বিশ্ব প্রায়শই রাশিয়ার তৈরি পারমাণবিক হুমকির কথা আলোচনা করে, তবে রাশিয়ার ভেতরে থাকা পারমাণবিক ঝুঁকিগুলো নিয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক কম মনোযোগ দেওয়া হয়, বিশেষ করে পুরনো পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর কারণে তৈরি হওয়া ঝুঁকিগুলো, যার কিছু চুল্লির (রিয়্যাক্টর) বয়স ইতোমধ্যে ৫০ বছরেরও বেশি।
একই সাথে, রাশিয়া তুরস্ক থেকে শুরু করে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির এক ‘টেকসই’ বিকল্প হিসেবে পারমাণবিক শক্তির প্রসার ঘটাচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বিদ্যমান ও সম্ভাব্য পারমাণবিক প্রকল্পগুলো নিয়ে আলোচনা করতে নিয়মিত বিদেশি নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
তবে একটি প্রশ্ন অনেকাংশেই উপেক্ষিত থেকে যায়: এই পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো যখন তাদের কর্মক্ষমতার মেয়াদ শেষ করবে, তখন এগুলোর পরিণতি কী হবে?
সোভিয়েত আমলে পুরো সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে (যার মধ্যে লিথুয়ানিয়াও অন্তর্ভুক্ত ছিল) পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নে লিথুয়ানিয়ার অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে, দেশটির ইগনালিনা পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দুটি সোভিয়েত-নির্মিত চুল্লি বন্ধ করা আবশ্যক ছিল। প্রথম চুল্লিটি ২০০৪ সালে এবং দ্বিতীয়টি ২০০৯ সালে বন্ধ করা হয়।
ডিকমিশনিং বা নিষ্ক্রিয়করণের এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ প্রমাণিত হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে, এর আনুমানিক ব্যয় ৩.৩ বিলিয়ন ইউরো স্পর্শ করেছিল, যেখানে নির্ধারিত কাজের মাত্র ৪৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। মূলত ২০৩৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, এই প্রক্রিয়াটি এখন ২০৪৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাশিয়া নিজে এই প্রশ্নটিতে খুব বেশি মনোযোগ দিচ্ছে বলে মনে হয় না। রোসেনারগোঅ্যাটম ৩৫টি রিয়্যাক্টর নিষ্ক্রিয় করার পরিকল্পনা করছে। তবুও কোম্পানির নিজস্ব আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী তহবিলের ঘাটতি প্রায় ১৮.৭ বিলিয়ন ইউরো, যেখানে নিষ্ক্রিয়করণের মোট আনুমানিক ব্যয় প্রায় ২১ বিলিয়ন ইউরো।
আর এগুলো হলো রোসেনারগোঅ্যাটমের নিজস্ব হিসাব। বাস্তবে নিষ্ক্রিয়করণের ব্যয় সাধারণত প্রাথমিক অনুমানের চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানির লুবমিনের সাবেক পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়করণ ব্যয় শুরুতে ১ বিলিয়ন ইউরো ধরা হলেও এখন তা ১০ বিলিয়ন ইউরো ধরা হচ্ছে।
তবে আপাতত, রাশিয়া ডিকমিশনিংয়ের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ধাপগুলো পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। রিয়্যাক্টর বন্ধ করার পরপরই তা সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার বদলে, এটি প্রায়শই এগুলোকে দীর্ঘমেয়াদী "নিরাপদ" সংরক্ষণে রাখে, যার মাধ্যমে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বোঝার বড় একটি অংশ ভবিষ্যতে স্থানান্তরিত হয়। বিলম্বিত নিষ্ক্রিয়করণ সমস্যার সমাধান করে না, বরং কেবল ব্যয়বহুল ধাপগুলোকে পিছিয়ে দেয়, যা রাশিয়ার বিদ্যমান অর্থায়নের ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বিশেষ উদ্বেগের বিষয়।
পরিবেশবাদী এনজিও বেলোনা ফাউন্ডেশন, রোসাটমের নিজস্ব প্রাক্কলনের ভিত্তিতে রিপোর্ট করেছে যে, ২০৩৭ সালের দিকে রোসাটমের ডিকমিশনিং ও দূরীকরণের বাধ্যবাধকতা তাদের নিট মুনাফাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাছাড়া, নিষ্ক্রিয়করণ যত বিলম্বিত হবে, সংশ্লিষ্ট আর্থিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তা ঝুঁকি তত বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের উত্তরাধিকার। রাশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৭ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। আটটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩৬টি রিয়্যাক্টর ইউনিট নিষ্ক্রিয় করার ফলে আরও ৮ লাখ ঘনমিটার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শিল্প খাতগুলো বড় পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা ও ঝুঁকি ফেলে গেলে কী ঘটে, সে বিষয়ে রাশিয়ার ইতিমধ্যেই অভিজ্ঞতা রয়েছে। কেমেরোভো অঞ্চলে, যেখানে রাশিয়ার প্রায় অর্ধেক কয়লা উৎপাদিত হয়, কয়লা উত্তোলনের বর্জ্যের পাহাড় প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই বর্জ্যের কিছু অংশ জ্বলে ওঠে এবং নিকটবর্তী এলাকাগুলোকে দুষিত করে। কয়লা কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হয়ে গেলে, তাদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য মোকাবিলার খরচ রাষ্ট্র ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর এসে পড়ে।
কিন্তু অর্থ ফুরিয়ে গেলে পারমাণবিক বর্জ্য এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রিয়্যাক্টরগুলোকে সহজে ফেলে রাখা সম্ভব নয়। তাই রাশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির সাথে সাথে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: এই বিশাল প্রকল্পগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, নিষ্ক্রিয় করা এবং শেষ পর্যন্ত ভেঙে ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ যদি আর পাওয়া না যায়, তবে এগুলো নিয়ে কী ঘটবে?
অতএব যেসব দেশে রাশিয়া অসংখ্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে, তাদের ভেবে দেখা উচিত যে পরিকল্পনা অনুযায়ী এই প্রকল্পগুলো রক্ষণাবেক্ষণ বা পরে নিষ্ক্রিয় করা না গেলে কী ঘটবে। রাশিয়ায় কোনো সমস্যা তৈরি হলে তাদের একটি ‘প্ল্যান বি’ থাকা দরকার। এবং ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে যে, রাশিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতি অপ্রত্যাশিতভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
পারমাণবিক অব্যবস্থাপনার রাজনৈতিক পরিণতিও সুদূরপ্রসারী হতে পারে। চেরনোবিল দুর্ঘটনা দেখিয়েছিল কিভাবে সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের তথ্য গোপন করার এবং দুর্ঘটনার তীব্রতা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস ও মোহভঙ্গ তৈরি করেছিল, যা সোভিয়েত আমলের শেষের দিকে ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষে অবদান রেখেছিল।
আজ, পারমাণবিক বর্জ্যের প্রতি রাশিয়ার ক্রমাগত অবহেলা এবং পারমাণবিক কেন্দ্র নিষ্ক্রিয়করণের বারবার স্থগিতকরণ একইভাবে আরেকটি পরিবেশগত বিপর্যয় এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক অসন্তোষ উভয়ের জন্যই পরিবেশ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যদি কর্তৃপক্ষ আবারও নীরবতা বা ঘটনার ভয়াবহতা লুকানোর চেষ্টার মাধ্যমে এমন সংকটের প্রতিক্রিয়া দেখায়।
রাশিয়ার অবনতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এই ঝুঁকিগুলো আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতি বজায় রাখার প্রচেষ্টায়, রুশ সরকার পরিবেশগত নিয়মাবলীকেও মারাত্মকভাবে শিথিল করেছে। জাতীয় প্রতিরক্ষা এখন রাশিয়ার ফেডারেল বাজেটের একক বৃহত্তম অংশ, যেখানে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ের অতি সামান্য অংশ বরাদ্দ রয়েছে।
পরিবেশগত বিপর্যয়গুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে রুশ শাসনব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে অনিচ্ছুক। রাশিয়া তেল পরিবহনের জন্য একটি পুরনো ছায়া বহর পরিচালনা অব্যাহত রেখেছে, এবং সেই বহরের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো ২০২৪ সালের কৃষ্ণসাগরীয় তেল নিঃসরণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল, যখন দুটি পুরনো রাশিয়ান ট্যাঙ্কার সমুদ্রে হাজার হাজার টন জ্বালানি তেল নিঃসরণ করেছিল।
এই তেল নিঃসরণকে কয়েক দশকের মধ্যে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল। পরিবেশগত অবহেলার এই সামগ্রিক ধরণ প্রশ্ন তোলে যে দেশটি কীভাবে তার পুরনো পারমাণবিক অবকাঠামো এবং পারমাণবিক বর্জ্যের ক্রমবর্ধমান সমস্যা মোকাবিলা করবে।
তাই আন্তর্জাতিক যে সমস্ত ফোরামে রাশিয়া তার পারমাণবিক শিল্পের প্রচার করে, যেমন কপ সম্মেলনগুলোতে (যেখানে রাশিয়ার পারমাণবিক লবিস্টদের মুখোমুখি হওয়া একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা), সেখানে এই বিষয়গুলো উত্থাপিত হওয়া উচিত। রাশিয়া বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে শক্তিকে ব্যবহার অব্যাহত রেখে জ্বালানির ভবিষ্যতে তার অবস্থান নিশ্চিত করতে চাইছে।
রাশিয়ার বাইরের পরিবেশবাদী সংস্থাগুলো এই ঝুঁকিগুলোর দিকে মনোযোগ আকর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। নির্বাসনে থাকা ইকোডিফেন্স অন্যান্য জার্মান কর্মীদের সাথে নিয়ে রাশিয়ার পারমাণবিক শিল্পের সাথে ইউরোপীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে, যা রাশিয়ার জ্বালানি খাতের অন্যান্য অংশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে অনেকাংশেই বেঁচে গেছে।
ইকোডিফেন্সের সহ-সভাপতি ভ্লাদিমির স্লিভিয়াকের মতে, রাশিয়ান পারমাণবিক প্রযুক্তি এবং পরিষেবার ওপর এই ধারাবাহিক নির্ভরতা নিজেই এমন একটি দুর্বলতা তৈরি করতে পারে যা রাশিয়া নাশকতা বা রাজনৈতিক চাপের জন্য ব্যবহার করতে পারে।
এর ফলে রাশিয়ার অভ্যন্তরে পরিবেশগত ঝুঁকিগুলো স্বাধীনভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রকাশ করার ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে। এটি একটি বিপজ্জনক তথ্যের ঘাটতি তৈরি করে: একটি পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, এর ভয়াবহতা কর্তৃপক্ষ গোপন করতে পারে বা কমিয়ে দেখাতে পারে, এবং জনগণ দুর্ঘটনার কয়েক বছর বা এমনকি কয়েক দশক পরে এর পূর্ণ পরিধি সম্পর্কে জানতে পারে।
১৯৫৭ সালের মায়াক বিপর্যয়ের পর ঠিক এটিই ঘটেছিল, যখন সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনা এবং এর পরিণতি গোপন করেছিল এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত (তিন দশকেরও বেশি সময় পরে) প্রকাশ্যে এই বিপর্যয়টি স্বীকার করেনি, অথচ হাজার হাজার মানুষ তেজস্ক্রিয় দূষণের দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি সহ্য করতে বাধ্য হয়েছিল।
স্বচ্ছতার এই অভাব রাশিয়ার পারমাণবিক শিল্পকে কেবল একটি জ্বালানি সমস্যা না করে একটি আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত করেছে। এর পুরনো অবকাঠামো, দুর্বল পরিবেশগত তদারকি এবং গোপনীয়তার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এমন সব ঝুঁকি তৈরি করে যা রাশিয়ার সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
লেখক পরিচিতি
আরশাক ম্যাকিচিয়ান একজন রুশ-আর্মেনীয় জলবায়ু কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।



