Advertisement

ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাহীনতায় দেশে লোডশেডিং: হাসনাত আব্দুল্লাহ

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
ভুল সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনাহীনতায় দেশে লোডশেডিং: হাসনাত আব্দুল্লাহ
সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশজুড়ে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত, অপেশাদারিত্ব ও পরিকল্পনাহীনতার সরাসরি পরিণতি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণ অঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতি বা যুদ্ধের দোহাই দিয়ে সরকার নিজের অব্যবস্থাপনাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।

Advertisement

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পোস্টে তিনি এনসিপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামের দেওয়া স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান প্রস্তাবনার কথা উল্লেখ করে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ধাপে ধাপে ভুল ও এর চরম পরিণতি তুলে ধরেন।

হাসনাত আবদুল্লাহ তার পোস্টে ধাপে ধাপে সরকার কোথায় এবং কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা উল্লেখ করেন।

তিনি জানান, প্রথম ধাপে দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত: ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেল ৬০ ডলার থেকে ৮৫-৯০ ডলারে উঠলো। সরকার সঠিক সময়ে মূল্য সমন্বয় করল না, যুক্তি ছিল মূল্যস্ফীতি। কিন্তু পরে ঠিকই মূল্য বাড়ানো হলো, ছোট শকের বদলে বড় শক দিল।

মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ যুক্তিসংগত। কিন্তু সিদ্ধান্তটি নেওয়ার সময় পাশাপাশি একটি অর্থায়ন পরিকল্পনা থাকা দরকার ছিল, ভর্তুকির বাড়তি চাপ কোথা থেকে আসবে? সেই পরিকল্পনা ছিল না। মার্চেই বিদ্যুৎ বিভাগ বাড়তি ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি চেয়ে চিঠি দেয়। ফলে বর্তমান অর্থ সংকট বিশ্ববাজারের চেয়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ফলেই তৈরি হয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে ভুল জায়গায় ভর্তুকি কর্তন: ক্যাপাসিটি চার্জে নয়। আইপিপির ফিক্সড পেমেন্টে নয়। কাটা হলো সেখানে, যেখান থেকে বিদ্যুৎ আসে, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র, এবং আমদানিকৃত বিদ্যুতে। ফলে বকেয়ার কারণে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো উৎপাদন বাড়াতে পারল না। কয়লার সরবরাহ বিপর্যস্ত হলো। আমদানি নামল। যারা এক ইউনিটও বিদ্যুৎ দেয় না, তাদের টাকা অক্ষত রইল; আর যারা বিদ্যুৎ দেয়, তাদের টাকা বন্ধ।

তৃতীয় ধাপে কন্টিনজেন্সি প্ল্যানের অভাব: গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির FSRU-তে আগুনের পর বিকল্প কোনো ফুয়েল বা কন্টিনজেন্সি প্ল্যান ছিল না। তাছাড়া ভারত থেকে ডিজেল, আদানি ও অন্যান্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনে যে ভাটা পড়েছে— তার মূল কারণ হরমুজ প্রণালি বা যুদ্ধ নয়, বরং বকেয়া বিল ও ক্রয়-শিডিউলের ব্যর্থতা।

চতুর্থ ধাপে সংকটের বাজারীকরণ: মূল্য সমন্বয়ের আগে পাম্পে তেল মিলছিল না, লম্বা লাইন। দাম বাড়ার পরদিন থেকে লাইন উধাও। সংকট ছিল মজুদজনিত। মজুদদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেননা অধিকাংশই দলীয় লোক।

পঞ্চম ধাপে সংকটকে যুক্তিতে রূপান্তর: অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের শিডিউল পিছাতে থাকল এবং ঠিক সেই সময়ে একটি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর চিঠির পর চার দিনের মধ্যে বেসরকারি আমদানি নীতিমালার খসড়া চাওয়া হলো। বিতরণেও একই ছক, ভুতুড়ে বিলকে প্রশ্রয়, তারপর বেসরকারীকরণের যুক্তি।

তিনি বলেন, সংকট সামলানোর বদলে সংকটকে পুঁজি করা হচ্ছে। পিজিসিবির তথ্যের বরাত দিয়ে পোস্টে উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে দেশ ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং প্রত্যক্ষ করছে। গত এপ্রিলে সর্বোচ্চ দৈনিক রেকর্ড ৪১,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা। জুলাইয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড ৩২,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টা। আগস্টে রেকর্ড লাফিয়ে ৫৩,০০০ থেকে ৬২,০০০ মেগাওয়াট-ঘণ্টায় পৌঁছেছে। গত ১০ আগস্ট রাত ১টায় দেশীয় ইতিহাসে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩,৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং নথিভুক্ত হয়।

গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে সত্য, তবে সংকটটি তৈরি করেছে সরকারের অব্যবস্থাপনা।

মন্ত্রণালয়ের নথি ও সোলার নীতি নিয়ে সমালোচনা করে হাসনাত আব্দুল্লাহ লেখেন, প্রতিটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে তিনটি মৌলিক নথি থাকা বাধ্যতামূলক— ফুয়েল প্ল্যান, কন্টিনজেন্সি প্ল্যান, এবং ডিজাস্টার রিকভারি প্ল্যান। এগুলো হালনাগাদ না থাকায় মন্ত্রণালয় আজ অসহায়ত্ব প্রকাশ করছে।

তাছাড়া, সোলার প্যানেলে প্রধানমন্ত্রীর শূন্য-শুল্ক প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ১৭ শতাংশ শুল্ক বসানো এবং সোলার হোম খাতে বড় ও ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে বৈষম্য তৈরির জন্য বর্তমান মন্ত্রীর নীতির তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রীর অতীত ব্যর্থতার প্রসঙ্গ টেনে এটি ব্যক্তির ব্যর্থতা ও অভিজ্ঞতাহীনতার প্রশ্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভারতের 'বিদ্যুৎ করিডোর' ও নদী রক্ষার হুঁশিয়ারি দিয়ে বিদ্যুৎ সংকটের অন্ধকারের সুযোগে গত ১২ আগস্ট থেকে ভারতের ৭৬৫ কেভি কাটিহার–পার্বতীপুর–বরনগর সঞ্চালন লাইন ও পাওয়ার কানেক্টিভিটি পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগের কড়া প্রতিবাদ জানান তিনি।

তিনি স্পষ্টত জানান, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে তাদের মূল ভূখণ্ডে বিদ্যুৎ নেওয়ার এই করিডোর অরুণাচলের ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার শতাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাথে যুক্ত। গঙ্গা ও তিস্তার পর যমুনার উজান ব্লক হলে বাংলাদেশ পরিবেশগত বিপর্যয় বহন করতে পারবে না। ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি আমদানিতে আমাদের আপত্তি নেই; কিন্তু আমাদের নদী ও ভবিষ্যতের ক্ষতি করে বিদ্যুৎ করিডোর বাস্তবায়ন মেনে নেওয়া হবে না। শেখ হাসিনা সরকারের আমলেও এর প্রতিবাদ ছিল জাতীয় স্বার্থের অবস্থান, দলীয় বিষয় নয়।

বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত দুই সপ্তাহ ধরে বরগুনা ও কক্সবাজারের জেলেদের ট্রলারগুলো বরফকল বন্ধ থাকায় সাগরে যেতে পারছে না বলে জানান তিনি। শিল্পকারখানা, কৃষি সেচ, হাসপাতালের চিকিৎসা ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা রক্ষায় বাকোয়াজ বন্ধ করে এনসিপির দেওয়া সমাধান প্রস্তাব মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান হাসনাত আব্দুল্লাহ।