স্বাস্থ্য খাতে দ্বিগুণ বরাদ্দেও ব্যয় বাড়ছে রোগীর

দেশের স্বাস্থ্য খাতে গত পাঁচ বছরে সরকারি বরাদ্দ কাগজে-কলমে দ্বিগুণ হয়েছে। তবে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমেনি, উল্টো বেড়েছে।
২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায়। অথচ এই সময়ে রোগীর নিজস্ব খরচ কমার বদলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০ শতাংশ। চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে ৬১ লাখেরও বেশি মানুষ।
পর্যাপ্ত ওষুধের অভাব, প্রশাসনিক অপচয়, সরকারি হাসপাতালে সেবার দুর্বলতা আর কেনাকাটানির্ভর উন্নয়ন নীতির কারণে প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ঠিকাদারি কমিশন বাণিজ্য বন্ধ না করে বাজেটের আকার তিন থেকে পাঁচ গুণ বাড়ালেও দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হবে না। বরং সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে গিয়ে দিনশেষে নিঃস্ব হয়ে পড়বে।
বাজেটের অঙ্কে দ্বিগুণ, বাস্তবে কতটা
বাজেটের অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখার দাবি দীর্ঘদিনের। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন বাজেটের কমপক্ষে ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ৩২ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে তা বাড়িয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির মাত্র ১.০১ শতাংশ। বাজেটের খাতায় অঙ্ক দ্বিগুণ হলেও বাড়ন্ত জনসংখ্যা ও মূল্যস্ফীতির সাপেক্ষে তা একেবারেই নগণ্য।
রোগীর পকেট খরচ বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান অনুযায়ী, ২০৩২ সালের মধ্যে রোগীর পকেট খরচ ৩২ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা ছিল। ২০১২ সালে যখন এই লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়, তখন এই খরচ ছিল ৬৪ শতাংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার দিকে না গিয়ে উল্টো চিত্র দেখা গেছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সালে যা ছিল যথাক্রমে ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৯ থেকে ৮০ শতাংশে।
রাজশাহী মেডিকেল থেকে সম্প্রতি ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে আসা পিয়ারা বেগমের (৭৯) চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ লাখ টাকা। তার ছেলে ডালিম বলেন, ‘মায়ের আইসিডি ডিভাইস (পেসমেকার) কিনতেই গেছে ৯ লাখ টাকা। জমিজমা আর একমাত্র গরুটা বিক্রি করে মায়ের চিকিৎসা করাচ্ছি। আমরা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব।’
বাড্ডার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার দিন ভর্তি থেকে সাধারণ হামের চিকিৎসা নিতে ২৯ বছর বয়সি নাজমুন নাহার তামান্নার খরচ হয়েছে ৪২ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার-নার্সদের অবহেলা আর দীর্ঘ লাইনের কারণে বাধ্য হয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি হাসপাতালে।
ওষুধের পেছনে ব্যয়
১৯৯৮ সালের সেক্টর প্রোগ্রামে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও তা কখনও ৩০ শতাংশের বেশি বাস্তবায়ন হয়নি। এতে সাধারণ রোগীদের বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার সুযোগ কমে গেছে।
সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ হিসাব মতে, দেশে বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধের চাহিদা রয়েছে। সরকারের পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় ৩৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকার মেডিসিন সাধারণ মানুষকে নিজের পকেট থেকে কিনতে হয়। শতাংশের হিসাবে এই হার প্রায় ৯৩ ভাগ।
বিপাকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) ২০২২ সালে করা গবেষণার তথ্যমতে, একটি পরিবারকে গড়ে প্রতি মাসে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করতে হয়। এটি তাদের মোট আয়ের প্রায় ১০ শতাংশ। তবে দরিদ্র পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে এই হার তিন গুণের বেশি; তাদের আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশই চলে যাচ্ছে চিকিৎসার পেছনে। এতে প্রায় ১৮ শতাংশ পরিবার বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয়ের মুখে পড়ছে। একই সঙ্গে বছরে ৬১ লাখের বেশি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন।
বাজেট ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা
স্বাস্থ্য খাতে এমন বিপর্যয়কর অবস্থার পেছনে চাহিদার তুলনায় বাজেটের ঘাটতি ও অব্যবস্থাপনা দায়ী বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রুমানা হক।
এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। নতুন নতুন ওষুধ ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির কারণে সার্বিক চিকিৎসা ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। কাগজে-কলমে স্বাস্থ্যের বাজেট কিছুটা বাড়লেও বাড়তি জনসংখ্যা ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির তুলনায় তা একেবারেই নগণ্য। আবার যা বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক কাজে চলে যায়; প্রকৃত সেবা খাতে পৌঁছায় খুব সামান্য।’
দেশে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নেন, বাকি ৭০ শতাংশ সেবা নেন বেসরকারি খাত থেকে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, ‘দেশে কোনো স্বাস্থ্যবিমা না থাকা এবং সরকারি হাসপাতালে অসংক্রামক রোগের সমন্বিত সেবার অভাব থাকায় মানুষ দ্রুত চিকিৎসার আশায় বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে ছুটছে। সরকারি ব্যবস্থাপনার এই দুর্বলতার সুযোগে বেসরকারি খাতের পেছনে বিপুল অর্থ খরচ করতে গিয়ে বহু পরিবার হঠাৎ নিঃস্ব হয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।’
স্বজনপ্রীতি-দুর্নীতি থামানোর তাগিদ
টাকার অঙ্ক বড় দেখিয়ে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বৃদ্ধির দাবি করা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় তার প্রভাব পড়ছে না বলে মনে করেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান। তার মতে, কেবল বাজেট কিংবা ভবনের সংখ্যা বাড়িয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট কাটানো সম্ভব নয়, বরং উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
অধ্যাপক সবুর খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায় বড় অংশ চলে যাওয়া এবং দুর্নীতি ও কেনাকাটানির্ভর নীতির কারণে প্রান্তিক মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রাজনৈতিক স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির পথ বন্ধ না করে যদি বাজেট ৩ থেকে ৫ গুণও বাড়ানো হয়, তবুও সেবা খাতের কোনো পরিবর্তন হবে না।’
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘স্বাস্থ্য বাজেটের একটি বড় অংশ চলে যায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতায়। নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে হাসপাতালে রোগীদের জন্য বিনামূল্যে ওষুধ ও সরঞ্জাম কেনার বরাদ্দ কমে যাবে। বাধ্য হয়ে গজ, ব্যান্ডেজ থেকে শুরু করে ওষুধপত্র রোগীদের নিজের টাকায় কিনতে হয়, যা আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার বহু গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উপজেলার সব বিশেষজ্ঞ পদ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চিকিৎসককে জেলা বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগের সময়সীমা পরিবর্তন করে দুই শিফটে—সকাল ১০টা থেকে ১টা এবং বিকেল ৪টা থেকে ৭টা পর্যন্ত চালু করতে হবে। এতে চিকিৎসকদের বৈকালিক প্রাইভেট প্র্যাকটিসের প্রবণতা কমবে এবং রোগীরা প্রকৃত সেবা পাবেন।’




