logo

ডাম্পিংয়ের যানে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের কাজ

• ৩০ শতাংশ জায়গায় ডাম্পিং করে রাখা হয়েছে পুলিশের যানবাহন

• ওই জায়গায় রাইড, ফুডকোর্ট ও ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের

• দুই দফায় স্থগিত রাইড আমদানির উন্মুক্ত দরপত্র, সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত

ডাম্পিংয়ের যানে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের কাজ
পুলিশের ডাম্পিংয়ের কারণে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পুলিশের ডাম্পিংয়ের যানবাহনের কারণে আটকে আছে রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। পার্কের ৩০ শতাংশ জায়গাজুড়ে ডাম্পিং করে রাখা হয়েছে এসব পরিবহন। ফলে সেখানে ছয়টি রাইড, ফুডকোর্ট, কেনাকাটার জন্য নির্ধারিত বিপণিবিতান বা শেড ও ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না।

উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নোটিশ টাঙিয়ে ২০১৯ সালে পার্কটি বন্ধ করে দেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এরপর অর্থ সংস্থানের জটিলতা এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ডিএসসিসির মধ্যে দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে পাঁচ বছর পর কাজ শুরু হয়। তবে এখনও বিপত্তি কাটেনি।

একদিকে শাহবাগ থানা নিয়ে জটিলতা। অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ডাম্পিং করা যানবাহন ও মালামাল। এমন বাস্তবতায় থমকে আছে পার্কের মূল উন্নয়নকাজ। এ ছাড়া রাইড আমদানির দরপত্র নিয়ে জটিলতা তৈরিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে (ওটিএম) দুইবার দরপত্র স্থগিতের পর সংস্থাটি এখন সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার (ডিপিএম) দিকে এগোচ্ছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পার্কের রাইড আমদানির জন্য দুবার উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হলেও তা সফল হয়নি। তাই এখন সেনাবাহিনী বা নৌবাহিনীর কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

শুরুতে ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়)’ প্রকল্প থেকে ২৬৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেয় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তবে এ অর্থ দিয়ে আধুনিকায়ন সম্ভব নয় জানিয়ে ডিএসসিসি আপত্তি তোলে। বেশ কয়েক দফা চিঠি আদান-প্রদানের পর মন্ত্রণালয় ডিএসসিসিকে নতুন প্রকল্প তৈরির পরামর্শ দেয়।

আটকে আছে রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
আটকে আছে রাজধানীর শাহবাগের শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

২০২৩ সালের অক্টোবরে ডিএসসিসির প্রস্তাবিত ৬০৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পায়। নতুন এই বাজেটের ৮০ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন (জিওবি), যার অর্ধেক অনুদান এবং বাকি অর্ধেক ৫ শতাংশ সুদে ঋণ হিসাবে নেবে ডিএসসিসি।

প্রকল্প অনুমোদনের পর নকশা অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু হয়। অবকাঠামোগত নির্মাণের অগ্রগতি ইতিমধ্যেই ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। সার্বিক প্রকল্পের ছয়টি প্যাকেজের মধ্যে ৭৩ শতাংশজুড়ে রয়েছে বিদেশ থেকে আনা আধুনিক রাইড স্থাপন এবং ২৭ শতাংশ জায়গাজুড়ে অবকাঠামো নির্মাণ। অবকাঠামো প্রস্তুত হলে ১৫টি আধুনিক ও যুগোপযোগী রাইড স্থাপন করা হবে।

রাইড আমদানির ক্ষেত্রে ই-জিপিতে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া নিয়ে জটিলতা দেখা দেওয়ায় পরপর দুই দফায় দরপত্র স্থগিত করতে হয়।

পার্কের আধুনিকায়ন রাইডের বাজেট ধরা হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই বিশাল অঙ্কের কাজে নজর পড়ে ডিএসসিসির যান্ত্রিক বিভাগের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও সাবেক পরিচালক আনিছুর রহমানের। কাজ নির্দিষ্ট তিনটি প্রতিষ্ঠানকে (ওরিয়ন, এনডিই ও ইউসিসি) পাইয়ে দিতে জোর চেষ্টা চালান তিনি।

অন্য কোনো কোম্পানি যেন দরপত্রে অংশ নিতে না পারে, সেই ব্যবস্থা করেন আনিসুর। রাইডের কারিগরি পরিমাপ ইতালীয় কোম্পানি ‘জাম্পেরলা’র নির্দিষ্ট মডেলের মাপে জুড়ে দেন। শর্ত দেন, আগে ২২০ কোটি টাকার কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

একজন প্রতিমন্ত্রী দরপত্রের এসব যোগ্যতা পরিবর্তন করে তার পছন্দের কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা দিলেও প্রকল্প পরিচালক রাজি হননি। এর মধ্যে প্রকৌশলী আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ জুন তার বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দেয় স্থানীয় সরকার বিভাগ। একই দিনে তাকে বগুড়া সিটি করপোরেশনে বদলি করা হয়।

পুলিশের ডাম্পিংয়ের যানবাহনের কারণে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পুলিশের ডাম্পিংয়ের যানবাহনের কারণে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

প্রকল্প পরিচালকের বদলির পর রাইডের মালামাল আমদানির দরপত্র স্থগিত করা হয়। বর্তমানে সংস্থাটি কাজ দ্রুত শেষ করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) মাধ্যমে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

শিশু পার্কের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ও রাইড কেনার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান।

এই নগর পরিকল্পনাবিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল রাইড কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এড়াতে ও নির্দিষ্ট কিছু পছন্দসই কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কঠোর শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে, যা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির (ডিপিএম) দিকে যাওয়া পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তি।’

তিনি বলেন, ‘জুলাই-পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে এসব বন্ধের আশা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্বচ্ছতার অভাব ও প্রতিযোগিতাহীন কেনাকাটার কারণে রাইডের ব্যয় বাড়বে। এর চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষ ও শিশুদের টিকিটের চড়া দাম দিয়ে। তাই অবিলম্বে এই দরপত্র প্রক্রিয়ার সব বাধা দূর করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া চালু করা এবং এর পেছনের দুর্নীতিবাজ চক্রকে চিহ্নিত করা জরুরি।’

এদিকে গত ৮ সেপ্টেম্বর ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান স্বাক্ষরিত চিঠিতে ডিএমপি কমিশনারের কাছে স্থানটি দ্রুত খালি করার অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের আওতায় ছয়টি প্যাকেজে উন্নয়নমূলক কাজ চলমান থাকলেও নির্ধারিত এলাকার ৩০ শতাংশজুড়ে পুলিশ অটোরিকশা, সিএনজি, মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন ডাম্পিং করে রেখেছে। জায়গাটিতে পার্কের ছয়টি রাইড, ফুডকোর্ট, মলশেড (বিপণিবিতান) ও ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

২০২৪ সালে কাজ শুরুর প্রায় আড়াই বছর অতিবাহিত হলেও ডিএমপি এলাকা খালি না করায় সংশ্লিষ্ট কাজ শুরু করা যায়নি। তবে বাকি ৭০ শতাংশ এলাকার অবকাঠামোগত কাজ প্রায় সমাপ্তির পথে।

এ ছাড়া সংলগ্ন এলাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউটের উল্টো পাশে ও শাহবাগ থানা সংলগ্ন এলাকায় এখনও আনসার ক্যাম্প, গোডাউন, লেবার শেড ও অস্থায়ী মসজিদ থাকায় সীমানাপ্রাচীরের ভেতর নির্ধারিত স্থাপনা নির্মাণ করা যাচ্ছে না। পার্কের মূল্যবান রাইড বিদেশ থেকে আনা হলে সেগুলোর নিরাপত্তার জন্য দ্রুত সীমানাপ্রাচীর দেওয়া দরকার। কিন্তু এসব স্থাপনা ও জমি হস্তান্তরিত না হওয়ায় সীমানা বাউন্ডারি পুরোপুরি তৈরি করা যাচ্ছে না।

উদ্যানের মূল নকশায় থাকা গ্লাসের দেয়াল বা গ্লাস ব্যারিয়ার নিয়ে আপত্তি উঠেছে। এই নকশাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন ডিএসসিসির কর্মকর্তারা। তবে মূল মাস্টারপ্ল্যান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হওয়ায় বাধ্য হয়ে সেই ডিজাইন অনুসরণ করতে হচ্ছে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই বাইরে থেকে ব্যবহারের উপযোগী নতুন মসজিদ নির্মাণ করেছে। স্থাপত্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় নতুন থানা ভবনের জায়গাও নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অবস্থায় কাজ দ্রুত শেষ করতে অস্থায়ী মসজিদ এবং ডাম্পিংকৃত যানবাহন দ্রুত সরাতে ডিএমপিকে অনুরোধ জানিয়েছে করপোরেশন।

পুলিশের ডাম্পিংয়ের যানবাহনের কারণে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
পুলিশের ডাম্পিংয়ের যানবাহনের কারণে আটকে আছে শহীদ জিয়া শিশু পার্কের উন্নয়নকাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

এর আগেও ডিএসসিসি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়ে শাহবাগ থানা ও পুলিশ কন্ট্রোল রুমের জায়গা ডিএসসিসির কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় উল্টো শাহবাগ থানা স্থানান্তর করতে পরীবাগের সাকুরা মার্কেটের জায়গা চেয়ে চিঠি দেয়। সাকুরা মার্কেটের জায়গায় ডিএসসিসির ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ও ২০ তলা ভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ায় ডিএসসিসি তা নাকচ করে দেয়।

নতুন থানা ভবন নির্মাণ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও কোনো সুরাহা করতে পারেনি। এমন অবস্থায় থানার পাশের নির্ধারিত জায়গায় পার্কের মাইন্ড কোস্টার রাইডের অংশ পড়ে যাওয়ায় এখন ডিএসসিসিকে তাদের রাইডের নকশা ও লেআউট পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

স্বাধীনতা স্তম্ভ প্রকল্পসূত্রে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আন্ডারগ্রাউন্ড গাড়ি পার্কিং, ভূগর্ভস্থ জলাধার, আন্ডারপাস ও হাঁটার পথ নির্মাণের কাজ ২০১৮ সালে শুরু হলেও তা এখনও শেষ হয়নি। আন্ডারগ্রাউন্ডের সংযোগ পথ ও পার্কিং শেষ না হওয়ায় পার্কটি প্রস্তুত হলেও দর্শনার্থীরা এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার পূর্ণ সুবিধা পাবেন না। এই কাজের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগ-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদ রানার মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম জয় এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রেসকোর্স ময়দানের পুরোনো স্থাপনাগুলো সংরক্ষণের কথা থাকলেও থানা এখনও জায়গা ছাড়েনি। আবার নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা বাউন্ডারি করতে পারছি না। আনসার ক্যাম্প, লেবার শেড এবং গাড়ি ডাম্পিংয়ের কারণে কাজ আটকে আছে। এসব জটিলতা না কাটলে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে বিদেশ থেকে আনা মূল্যবান রাইড স্থাপন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।’