Advertisement
ওয়াসার গন্ধবপুর প্রজেক্ট

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে দেড় হাজার কোটি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব

• অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্প পরিচালকের ১২৬ কোটি টাকার অর্থ ছাড়

• এক বছর কাজ বন্ধ থাকায় দৈনিক ২৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি ফরাসি ঠিকাদারের

• চুক্তির শর্ত ভেঙে কম দামি অননুমোদিত চীনা পাইপ ব্যবহার

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে দেড় হাজার কোটি ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব
গন্ধর্বপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট। ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীবাসীকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব সুপেয় পানি সরবরাহের বিশাল প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হয়েছিল ‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টাল সাস্টেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই’ (ডিইএসডব্লিউএসপি) প্রকল্প। তবে মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখন আটকে গেছে আর্থিক বিশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা ও আইনি জটিলতার গ্যাঁড়াকলে।

Advertisement

প্রকল্পের মূল প্যাকেজ-০১ এর ভৌত অগ্রগতি ৯৭ শতাংশে পৌঁছালেও পিপিআর-২০২৫-এর নতুন সরকারি ক্রয় আইন লঙ্ঘন করে শেষ মুহূর্তে দেড় হাজার কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্প মূল্যের প্রায় ৫০ শতাংশ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই প্রকল্প পরিচালকের একক সিদ্ধান্তে দুই ফরাসি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১২৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রকল্প এলাকায় কাজের অনুমতি না মেলায় কর্মী ও যন্ত্রপাতি অলস বসিয়ে রাখার অজুহাতে দীর্ঘ এক বছরের জন্য দৈনিক ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। একই সঙ্গে নিম্নমানের অননুমোদিত চীনা পাইপ ব্যবহারের ঘটনা পুরো প্রকল্পটির সুফল ও স্বচ্ছতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

অনুমোদন ছাড়াই ১২৬ কোটি টাকা অর্থ ছাড়

গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কোনো পূর্বানুমতি বা অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসে তিন কিস্তিতে প্রায় ১২৬ কোটি টাকা সমপরিমাণ অর্থ ফরাসি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া’ (গন্ধর্বপুর ওয়াটার ট্রিটমেন্ট এসএনসি)-কে পরিশোধ করেছেন প্রকল্প পরিচালক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ।

নথি অনুযায়ী গত ৩ জুন প্রথম কিস্তিতে ৩৬ কোটি ৯ লাখ ৮৯ হাজার ৯০৬ টাকা পরিশোধ করা হয়। ১০ জুন দ্বিতীয় কিস্তিতে ৩৫ লাখ ৫৯ হাজার ৪৮৮ ইউরো (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৯ টাকা) পরিশোধ করা হয়। ১৫ জুন তৃতীয় কিস্তিতে ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৪৮৮ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার ৯১৯ টাকা) প্রদান করা হয়।

তবে ওয়াসার প্রশাসনিক নথিপত্র বলছে, অনুমোদনহীন অর্থ ছাড়ের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি বা চুক্তি সংশোধন ব্যতিরেকে উক্ত যৌথ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অনিয়ম করে পরিশোধ করার রেকর্ড রয়েছে।

অনুমোদন ছাড়া শত কোটি টাকা অর্থ ছাড়ের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ বলেন, ‘এটি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারে থাকা প্রকল্প। এই প্রকল্প নিয়ে কোনো তথ্য বা অভিযোগের জবাব দেওয়া যাবে না।’

এক বছর কাজ বন্ধ, দৈনিক ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি

বকেয়া বিলের দাবিতে গত ২০২৫ সালের ১৫ জুন থেকে প্রকল্পের সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ ঘোষণা করেছিল মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সুয়েজ ও ওটিভি ভিওলিয়া’। আন্তর্জাতিক চুক্তি ফিডিক ইয়োলো বুক ১৯৯৯-এর ১৬.১ ধারা প্রয়োগ করে তারা দীর্ঘ এক বছর কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখে।

পরবর্তীতে গত জুন মাসে ঢাকা ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বিপুল বকেয়া বিল সরাসরি ব্যাংকে পরিশোধ করার পর গত ১৭ জুন এক চিঠির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানায়, ২১ জুন থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্প এলাকায় পুনরায় কাজ শুরু করেছে। একই সঙ্গে কাজ দ্রুত শেষ করতে তারা আগামী ৫.৫ মাসের (সাড়ে পাঁচ মাস) একটি ‘লুক-অ্যাহেড’ কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে। এতে শোধনাগারের বিভিন্ন ট্যাংকে ফিল্টার বালি স্থাপন, ত্রুটি সংশোধন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কালভার্ট, রূপসী রোড ক্রসিং এবং সিস্টেমের চাপ পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তবে এক বছর পর কাজ শুরু হলেও নতুন জটিলতা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, দীর্ঘ ১২ মাস কাজ বন্ধ থাকার কারণে পরিচালন ব্যয় ও আনুষঙ্গিক খরচ বহুগুণ বেড়েছে। এ কারণে তারা খুব শিগগিরই ‘ফাইনাল ক্লেইম’ এ বড় অঙ্কের একটি নতুন ক্ষতিপূরণের দাবি ওয়াসার কাছে পেশ করতে যাচ্ছে।

তদুপরি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে কাজের প্রশাসনিক অনুমতি সময়মতো না পাওয়ায় ঠিকাদারের দাবি অনুযায়ী কর্মী ও ভারী যন্ত্রপাতি অনভিপ্রেতভাবে বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ওয়াসার ঘাড়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা ডেমারেজ পরিশোধের বড় ধরনের আর্থিক সুযোগ ও দায় তৈরি হয়েছে।

৯৭ শতাংশ কাজ শেষে পিপিআর লঙ্ঘন করে ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব

প্রকল্পের সরকারি নথিতে দেখা যায়, রূপগঞ্জের গন্ধর্বপুর ৫০০ এমএলডি ক্ষমতার পানি শোধনাগার ও ইনটেক অবকাঠামোর ভৌত অগ্রগতি ইতোমধ্যেই ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। অথচ কাজ একেবারে শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর মূল চুক্তির ৩ হাজার ৬ কোটি ৪ লাখ টাকা থেকে ব্যয় বাড়িয়ে ৪ হাজার ৫০৮ কোটি ১ লাখ টাকা করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ একটি একক প্যাকেজেই (প্যাকেজ-০১) বাড়তি এক হাজার ৫০১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বা মূল চুক্তির ৪৯.৯৭ শতাংশ বাড়তি বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে।

এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবে দেশের বিদ্যমান সরকারি ক্রয় আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। সম্প্রতি কার্যকর হওয়া নতুন পিপিআর-২০২৫ বিধিমালা অনুযায়ী, বিদ্যমান কোনো চুক্তিতে অনধিক ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রকল্প ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ নতুন আইন উপেক্ষা করে পিপিআর-২০০৮ এর বিধি ৭৪(৪)-এর আশ্রয় নিয়ে সর্বোচ্চ ৪৯.৯৭ শতাংশ (প্রায় ৫০ শতাংশ) ব্যয় বৃদ্ধির ফাইল তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রস্তাবনায় ওয়াসা বলছে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পে ফিডিক আইন বহাল থাকবে, তাই পুরোনো চুক্তির পরিপত্র অনুযায়ী পুরোনো পিপিআর প্রযোজ্য।

কিন্তু সরকারের আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট আইনি পর্যালোচকরা বলছেন, পিপিআর-২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর পুরোনো তপশিলের সর্বোচ্চ সীমা ভেঙে ৫০ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব সরাসরি আইন ও বিধির চরম ব্যত্যয়।

সাড়ে চার বছরের সময়ক্ষেপণ

২০১৮ সালের ১৬ মে যখন ফরাসি যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে চুক্তি সই হয়, তখন কাজ শেষ করার মূল মেয়াদ ছিল ৪৮ মাস (চার বছর)। সেই হিসাবে সর্বোচ্চ ২০২২ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে এখন তা ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নথিপত্র ঘেটে দেখা যায়, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ শুরুর দিনেই ইনটেক ও প্ল্যান্টের শতভাগ সাইট এবং পাইপলাইনের ৫০ শতাংশ জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু ওয়াসার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পাইপলাইনের প্রথম ১০ কিলোমিটার জমি পেতেই ঠিকাদারকে ৬৪৩ দিন অপেক্ষা করতে হয়। আর শতভাগ সাইট বুঝিয়ে দিতে ওয়াসার সময় লাগে এক হাজার ২৬৯ দিন (প্রায় সাড়ে তিন বছর)। ফলে জমি হস্তান্তরে দেরি হওয়ার একক কারণেই ঠিকাদারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫৪ কোটি ৪ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে।

এ ছাড়া ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান পাইপলাইনের প্রাথমিক নকশায় মাত্র ৭ কিলোমিটার এলাকায় ভূমিকম্পজনিত মাটির তরলীকরণের (লিকুইফেকশন) ঝুঁকি ধরা হয়েছিল। কিন্তু কাজের মাঝপথে বিস্তারিত জরিপ করে দেখা যায়, পুরো ২২ কিলোমিটার এলাকাই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পরবর্তীতে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (আইইউটি) বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে পাইপলাইনের পুরো ডিজাইন বদলাতে গিয়ে বাড়তি খরচ হয় ৬০ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

২০১৬ সালের বেস ডেট ধরে প্রাক্কলন করায় দীর্ঘ ১০ বছরে নির্মাণসামগ্রীর (রড, সিমেন্ট, পাইপ ইত্যাদি) দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দর সমন্বয় বাবদই দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৬৬৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া সরকার ভ্যাট ও আয়করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭.৫ শতাংশ করায় এবং আমদানি শুল্ক বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ৩৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

২০১৯ সালের নভেম্বরে গন্ধর্বপুরে শোধনাগারের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের সময় স্থানীয় একটি সামাজিক কবরস্থানকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে ২০ দিন কাজ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। ওয়াসার ব্যর্থতায় সৃষ্ট এই ঘটনায় ঠিকাদারকে জনগণের ট্যাক্সের টাকা থেকে ৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কোভিডের কারণে ৩৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং ওয়াসার বিল প্রদানে ব্যর্থতায় ‘ডিলে পেমেন্ট’ বাবদ ৫৮ কোটি ৮৪ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে।

সড়ক ও জনপথের আপত্তিতে ঢাকা বাইপাস ও ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণে ৪৬.৮৯ কোটি টাকা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্দেশে পাইপলাইন মাটির গভীরে নেওয়া ও দুটি গভীর পুকুর অতিক্রম করতে অতিরিক্ত ৭১.৮৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হয়েছে।

যদিও ঠিকাদারের কিছু ‘ভ্যালু ইঞ্জিনিয়ারিং’ গ্রহণের ফলে ৮৩.৮২ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে, তবে সব মিলিয়ে মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ১৬২.২২ কোটি টাকায়।

অননুমোদিত চীনা পাইপ কেনা ও সওজ-ওয়াসা বৈরিতা

প্রকল্পের পাইপলাইন অংশে শুধু আর্থিক অনিয়মই নয়, বরঞ্চ কেনাকাটার মান নিয়েও বড় ধরনের জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদার ‘সুয়েজ’ ২৩ কিলোমিটার এলাকায় পাইপ সরবরাহের দায়িত্ব পেলেও, তারা সাশ্রয়ী মূল্যে চুক্তি বহির্ভূত ও অননুমোদিত চীনা কোম্পানি ‘শ্যানডং গুয়োমিং’-এর কাছ থেকে পাইপ কিনেছে। এই পাইপ কেনাকাটা ও গুণগত মান নিয়ে খোদ চীনের আদালতেই সুয়েজের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, ঢাকার আন্তর্জাতিক পাইপলাইনে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহারের বিরুদ্ধে ঢাকা ওয়াসা আজ পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক তদন্ত বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

পাশাপাশি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সংস্কারকাজের সময় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বারবার ওয়াসাকে পাইপ বসানোর জন্য তাগিদ দিয়েছিল। কিন্তু ওয়াসার চরম গাফিলতিতে ৯৫০ মিটার পাইপ এবং দুটি কালভার্ট নির্মাণ না করেই মহাসড়কের কাজ শেষ করে সওজ। এর ফলে ভবিষ্যতে নতুন তৈরি করা হাইওয়েটি পুনরায় খোঁড়াখুঁড়ি করতে হবে, যা সরাসরি জনগণের অর্থ অপচয় এবং প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুযায়ী প্রকল্পের ব্যয় সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হলেও এখানে প্রায় ৪৯ শতাংশ ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্টতই সরকারি নিয়মনীতির চরম লঙ্ঘন। প্রকল্পের ব্যয় বার বার বৃদ্ধি পাওয়া রোধ করতেই মূলত পিপিআর নিয়ম তৈরি করা হয়েছিল। এ ছাড়া অনুমোদন ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ১২৬ কোটি টাকার বিল পরিশোধ করা ওয়াসার চরম গাফিলতি ও জবাবদিহির অভাবের কারণে হয়েছে।’

প্রকল্পের সাইট বুঝিয়ে না দেওয়ায় কাজ বন্ধ থাকা এবং প্রতিদিন প্রায় ২৪ লাখ ৯০ হাজার টাকার ক্ষতিপূরণ দাবির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এ জাতীয় অব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। ওয়াসার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এবং বিধিবহির্ভূত অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি অবিলম্বে বন্ধ করতে মন্ত্রণালয় একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পানি সরবরাহ অনুবিভাগ) ড. মুহা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ওয়াসার এই প্রকল্পের কোনো ধরনের বিল প্রদানের অনুমোদন নিতে ফাইল মন্ত্রণালয়ে আসেনি।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (পানি সরবরাহ অধিশাখা) হোসনা আফরোজ বলেন, ‘মূলত প্রকিউরমেন্টের ক্ষেত্রে প্রজেক্ট ডিরেক্টর (পিডি) সবকিছু দেখে আমাদের কাছে পাঠালে, আমাদের কাজ হলো পেপারসগুলো যাচাই-বাছাই করা। যদি কোনো ভ্যারিয়েশন বা আর্থিক বিষয় থাকে তবে যাবতীয় বিষয় পর্যালোচনা করে তা সিসিজিবিতে পাঠানোই আমাদের কাজ। এমনকি কোনো ব্যর্থতা থাকলে সেটাও আমরা সামারিতে নিয়ে আসি। এই প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি যাচাই করে দেখেছি, তারা ভ্যারিয়েশন করলে সাধারণত প্রতিটি অংশের কাজ, মেজারমেন্ট ও ডেসক্রিপশন দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা ছিল না। আমরা সেগুলো চেয়ে পাঠালেও কোনো জবাব না আসায় বর্তমানে কাজটি স্থগিত রয়েছে।’

এ সময় তিনি বলেন, ‘অনুমোদন ছাড়া প্রজেক্ট ডিরেক্টরের আর্থিক বিল দেওয়ার বিষয়ে বলা যায়, কোনো কর্মকর্তা অনুমোদন ছাড়া বিল দিয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই। ডেলিগেশন অব ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার অনুযায়ী পিডির একটি নির্দিষ্ট আর্থিক সীমা বা লিমিট থাকে। সেই লিমিটের বাইরের কোনো বিল হলে তা প্রথমে ওয়াসা বোর্ডে এবং তাদের এখতিয়ারের বাইরে গেলে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো বিষয় বা বিলের তথ্য আমার কাছে আসেনি।’

বিষয় :