সেবায় অসন্তোষ রোগীদের, ‘সঠিক চিকিৎসা’ দিয়েও নিরাপত্তাহীনতায় চিকিৎসকরা
• সেবা নিয়ে অসন্তুষ্ট ৮৫ শতাংশ রোগী, সময় না পাওয়ার অভিযোগ ৮৯ শতাংশের।
• চিকিৎসক মন দিয়ে সমস্যার কথা শোনেন না, মত ৮১ শতাংশ রোগীর।
• সামাজিক অবস্থান দেখে বৈষম্যের অভিযোগ।
• সঠিক চিকিৎসা দিয়েও নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন ৭৭ শতাংশ চিকিৎসক।

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১৪ আগস্ট ফুসফুসে ক্যানসার আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান রোগীর স্বজনরা। দেশে চিকিৎসকদের এভাবে আক্রমণের শিকার হওয়ার ঘটনা নতুন নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের জরিপ বলছে, ৭৭ শতাংশেরও বেশি চিকিৎসকের মধ্যে সঠিক চিকিৎসা দিয়েও এভাবে আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা কাজ করে।
২০২১ সালে রাজধানীর ছয়টি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের সাত শতাধিক রোগীর ওপর এই সমীক্ষা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট। এর মধ্যে দুটি বড় সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগ এবং চারটি লাভজনক বেসরকারি হাসপাতাল ছিল। রোগীদের পাশাপাশি ৬২ চিকিৎসকেরও সাক্ষাৎকার নেওয়া হয় জরিপে। অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ব্যবসায়ী, শ্রমিক, চাকরিজীবী, গৃহিণী, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন।
লাইনে দীর্ঘ অপেক্ষা, চেম্বারে দুই-তিন মিনিট
সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের হাসপাতালেই পর্যাপ্ত সময় না দেওয়ার অভিযোগ করেছেন জরিপে অংশগ্রহণকারী রোগীদের ৮৯ শতাংশ। ৮১ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হয় না। মানসিক সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ ৮২ শতাংশের। সেবা নিয়ে অসন্তুষ্টি বা চিকিৎসকদের প্রতি নেতিবাচক ধারণার কথা জানিয়েছেন প্রায় ৮৫ শতাংশ রোগী।
সরেজমিনে জরিপের এই বাস্তবতার মিল পাওয়া গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) হাসপাতালের বহির্বিভাগে দীর্ঘ তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে চিকিৎসককে দেখানোর সুযোগ পান নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে আসা নাজনীন আকতার (৪১)। কান দিয়ে পানি পড়া ও তীব্র জ্বালাপোড়ার সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি ও তার মেয়ে।
নাজনীন আকতার বলেন, ‘ভোরে বের হয়ে সকাল ৭টায় পৌঁছাই। দুপুর ১২টার পর ডাক্তার দেখতে পারলাম, কিন্তু ভেতরে সময় দিলেন সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন মিনিট। কেন সমস্যা হচ্ছে, কী জটিলতা—কোনো কিছুই বললেন না, শুধু ওষুধ লিখে হাতে দিয়ে দিলেন।’
একই অভিজ্ঞতা রাজবাড়ী থেকে চর্মরোগ বিভাগে আসা নিশাত ইসলামের। আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ভেতরে ঢোকার পর হাত ও শরীর দেখে কোনো প্রশ্ন না করেই প্রেসক্রিপশন লিখে বিদায় করা হয় তার মাকে। তিনি বলেন, ‘কী সমস্যা, আগে কী ওষুধ খেয়েছি—কোনো কিছুই জানতে চাইলেন না।’
বাণিজ্যিক মানসিকতা ও বৈষম্য
সরকারি হাসপাতালে অতিরিক্ত ভিড়ের অজুহাত থাকলেও বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চ ফি দিয়েও সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতা সুখকর নয় বলে জানান রোগীরা। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ রোগীর অভিযোগ, সামাজিক অবস্থা ও পরিচয় বিবেচনা করে রোগীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়।
অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নবজাতক বা সংকটাপন্ন রোগীদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) পাঠানোর মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল চার মাসের শিশু নিয়াজকে। তার পরিবারের সদস্যরা জানান, কোনো পরীক্ষা ছাড়াই শিশুটিকে এনআইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়, যেখানে খরচ ধরা হয় অর্ধলক্ষ টাকা। পরে মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালে নেওয়া হলে সাধারণ ওয়ার্ডে তিন দিনেই সুস্থ হয়ে ওঠে নিয়াজ।
দিনে দেখতে হয় দেড় শ রোগী
রোগীদের নানা ক্ষোভ ও নেতিবাচক ধারণার বিপরীতে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে উঠে এসেছে কাজের প্রচণ্ড চাপের কথা। বিএমইউয়ের নাক, কান ও গলা বিভাগের রেসিডেন্ট ট্রেইনি ডা. শাহাবুদ্দিন রাজু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রোগীদের পর্যাপ্ত সময় চাওয়ার দাবি শতভাগ যৌক্তিক। কিন্তু সকাল থেকে দুপুরের মাত্র ৩৬০ মিনিটের (৬ ঘণ্টা) ডিউটিতে একজন চিকিৎসককে ১০০ থেকে ১২০ জন রোগী দেখতে হয়। প্রাকৃতিক বিরতি বা ওয়াশরুমে যাওয়ার সময়টুকুও মেলে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘চারটি রুমে এক একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন এত রোগী সামলাতে হলে চাইলেও বেশি সময় দেওয়া সম্ভব নয়। এই বিপুল চাপ সামলে কাঙ্ক্ষিত মানের সেবা দেওয়া বাস্তবে অসম্ভব।’
অনিরাপদ মনে করেন চিকিৎসকরাও
চিকিৎসা দেওয়ার পরও নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শয্যা না পাওয়ায় গত ১৪ আগস্ট রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফুসফুসে ক্যানসার আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসকদের ওপর হামলা চালান রোগীর স্বজনরা। হাসপাতালের অনারারি মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মোশরারফ হোসেন এবং একজন ওয়ার্ড বয়কে টেনেহিঁচড়ে মেঝেতে ফেলে মারধর করা হয়।
চিকিৎসা দেওয়ার পরও কর্মস্থলে এমন প্রতিকূল পরিবেশ ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির কারণে ৭৭ শতাংশের বেশি চিকিৎসক সঠিক চিকিৎসা দেওয়ার পরও নিজেদের অনিরাপদ মনে করেন বলে জরিপে উঠে এসেছে।
প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার
স্বাস্থ্য খাতের এই মুখোমুখি অবস্থান চিকিৎসকদের একক কোনো অবহেলা নয়, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ফল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘উপজেলা ও স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। এগুলোকে শতভাগ সচল করে কড়া রেফারেল ব্যবস্থা চালু করতে হবে। অর্থাৎ উপজেলা ও জেলা হাসপাতাল পার হয়ে রেফার ছাড়া মেডিকেল কলেজগুলোতে সরাসরি আসা বন্ধ না হলে ভিড় কমবে না, চিকিৎসকরাও সময় দিতে পারবেন না। আর এতে খুব সহজেই চিকিৎসকদের প্রতি সাধারণ মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তি উপজেলা পর্যায়ে যদি কাঙ্ক্ষিত সেবা পান, তিনি শখ করে জেলা সদর হাসপাতালে যাবেন না। আমাদের কাঠামো আছে কিন্তু চিকিৎসার গুণগত মান নেই। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। সবার আগে এগুলো পুরোমাত্রায় সচল করতে হবে। একই সঙ্গে রেফারেল সেন্টার চালু রাখতে হবে। অর্থাৎ উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা না নিলে জেলা পর্যায়ে এবং সদর হাসপাতাল রেফার না করলে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন না; এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। এতে জেলা ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী কমবে এবং ডাক্তারও সময় নিয়ে রোগী দেখতে পারবেন। শুধু গরিব মানুষ নয়, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষের যদি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার মানসিকতা থাকে, তবেই এই অবস্থার পরিবর্তন হবে।’
বিএমইউয়ের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. শহীদুল্লাহ সিকদার বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা অনুযায়ী চিকিৎসকের ডেস্ক বা বুথ বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে দুই শিফটে হাসপাতাল পরিচালনা করতে হবে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের দিনে ১০ থেকে ২০ জনের বেশি রোগী দেখা উচিত নয়।’
তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের কাছ থেকে মানবিক সেবা পেতে হলে শুধু অর্থ নয় বরং উপযুক্ত কর্মপরিবেশ, পরিবহন, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে যে চিকিৎসকের চেম্বারে বেশি ভিড়, তিনিই ভালো; রোগীদের এমন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।’




