logo

ঢাকার বাইরে ফাঁকা শয্যা, রাজধানীর হাসপাতালে মেঝেতে গাদাগাদি

• ঢাকা মেডিকেলে শয্যা ২ হাজার ৬০০, ভর্তি দ্বিগুণেরও বেশি

• রায়পুরা উপজেলা হাসপাতালে ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি থাকেন গড়ে ৩৮ থেকে ৪২ জন

• উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় অংশই আসেন মামলা জোরালো করতে

ঢাকার বাইরে ফাঁকা শয্যা, রাজধানীর হাসপাতালে মেঝেতে গাদাগাদি
শয্যা না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পেটে পানি জমেছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আব্দুল গাফফার মিয়ার (৫৫)। দ্রুত বাড়ছে ওজন। ভর্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। তবে ছয় দিনেও মেলেনি শয্যা। বাধ্য হয়ে মেঝেতে তোশক বিছিয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

শুধু আব্দুল গাফফার নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীর উপচে পড়া ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই দেশের সর্ববৃহৎ এই সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে। কাগজে-কলমে শয্যা সংখ্যা দুই হাজার ৬০০। অথচ প্রতিনিয়ত ভর্তি থাকছে দ্বিগুণেরও বেশি রোগী। ফলে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

প্রায় একই চিত্র সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝেতে গাদাগাদি করে চিকিৎসা নিতে হয় রোগীদের। অথচ একই সময়ে আব্দুল গাফফারের নিজ উপজেলা রায়পুরার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ফাঁকা থাকছে শয্যা। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে দিনে ভর্তি থাকেন গড়ে মাত্র ৩৮ থেকে ৪২ জন রোগী। স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে না পারাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ঢামেক হাসপাতালের সিঁড়ির পাশে কথা হয় আব্দুল গাফফারের ছেলে রিয়াজ হোসেনের সঙ্গে। বাবার অসুস্থতার বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালে ঠিকমতো ডাক্তার থাকে না। সদর হাসপাতালে গেলে না দেখে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়। পরে প্রাইভেটে পরীক্ষা করালে ক্যানসার ধরা পড়ে। তাই এখানে নিয়ে এসেছি। ভর্তি করালেও এখনও বেড মেলেনি।’

৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রায়ই ফাঁকা থাকছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও প্রায়ই ফাঁকা থাকছে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শয্যা। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রংপুরের মিঠাপুকুরের প্রায় ছয় লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা ৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে কাগজে-কলমে জনবল রয়েছে ৩১ শয্যার। রোগী ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুমূর্ষু রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই মিঠাপুকুর উপজেলা হাসপাতালে। সব বিভাগে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। নেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ। ফলে শয্যা ফাঁকা থাকলেও শহরমুখী হতে হয় রোগীদের।

উপজেলা হাসপাতাল থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (রমেক) হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি হয়েছেন মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের বাসিন্দা আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, ‘বুকে ব্যথা নিয়ে ২৮ আগস্ট অ্যাম্বুলেন্সযোগে উপজেলা হাসপাতালে ভর্তি হই। পরীক্ষা না করেই হৃদরোগ মনে করে রংপুর মেডিকেলে পাঠান চিকিৎসক।’

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মীর হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো অবস্থা এখানে নেই। ফলে গুরুতর ও সংকটাপন্ন রোগী এলে তাদের বিভাগীয় হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়।’

শুধু মিঠাপুকুর নয়, জেলার আটটি উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধাসহ বিভাগের অন্য জেলার রোগীর চাপ সামাল দিতে হয় রমেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। কাগজে-কলমে শয্যা সংখ্যা এক হাজার। তবে প্রতিদিন ভর্তি থাকেন গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। অথচ জনবল এক দশক আগের ৬০০ শয্যার। সক্ষমতার বেশি রোগী সামাল দিতে গিয়ে ওষুধ থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়; কোনোটিতেই পরিপূর্ণ সেবা দিতে পারছে না স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানটি।

রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘বাজেট ও আর্থিক স্বল্পতায় সব ওষুধ দিতে পারি না। জনবলের অভাবে রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রিএজেন্ট থাকা সত্ত্বেও সব টেস্ট ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা সম্ভব হয় না।’

রংপুরে আলাদা কোনো জেলা বা সদর হাসপাতাল না থাকাকে রোগীদের শহরমুখী হওয়ার বড় কারণ বলে মনে করেন আশিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রংপুরে আলাদা কোনো জেলা বা সদর হাসপাতাল না থাকা রোগীদের শহরমুখী হওয়ার বড় কারণ। অন্যান্য জেলায় ২৫০ বা ৫০০ শয্যার সদর হাসপাতাল থাকে। এখানে তা নেই। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল একটি টারশিয়ারি বা রেফারেল হাসপাতাল। এখানে শুধু জটিল রোগীদের আসার কথা। সদর হাসপাতাল হলে চাপ কমবে। ফলে রোগীরাও অপেক্ষাকৃত ভালো সেবা পাবেন।’

যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়নও রোগীদের শহরমুখী করার একটি বড় কারণ। গ্রাম থেকে সরাসরি বিভাগীয় ও রাজধানীর হাসপাতালে পৌঁছানো এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। ফলে সাধারণ সমস্যায়ও অনেকে সরাসরি শহরে গিয়ে চিকিৎসা নেন।

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর হোসেন বলেন, ‘আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। আবার এটাও ঠিক যে, আগের চেয়ে এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত। মানুষ ভাবে উপজেলায় বড় ডাক্তার থাকে না, তাই সরাসরি শহরের হাসপাতালে যাচ্ছে।’

রমেক হাসপাতালে ধারণক্ষমতার বাড়তি রোগীর চাপের পেছনে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি এবং বিকল্প হাসপাতালের অভাবের কথা উল্লেখ করেন পরিচালক আশিকুর রহমান। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আশপাশের জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার রোগীরা সামান্য সমস্যা হলেও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না গিয়ে সরাসরি বিভাগীয় হাসপাতালে চলে আসছেন।’

সরেজমিন অনুসন্ধানে উপজেলা পর্যায়ে শয্যা ফাঁকা থাকার পেছনে আরেকটি অদ্ভুত কারণ উঠে এসেছে। নরসিংদীর রায়পুরা ও রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলা হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ভর্তি রোগীদের প্রায় ৮০ ভাগই এসেছেন জমি বা পারিবারিক মারামারিসংক্রান্ত মামলায় ব্যবহারের জন্য মেডিকেল সার্টিফিকেট নিতে। অনেকে সুস্থ হওয়ার পরও প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ছাড়পত্র নিতে চান না।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার জনসংখ্যা ছয় লাখেরও বেশি। স্বভাবতই এখানকার ৫০ শয্যার হাসপাতালে রোগীর তীব্র চাপ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি তার উল্টো। উপজেলার উত্তর বাখরনগরের বাহাদুরপুর এলাকার বাসিন্দা নবী হোসেন জানান, জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে প্রতিপক্ষের আঘাতে আহত হয়েছেন তিনি। ঘটনা নিয়ে থানায় অভিযোগও দিয়েছেন। হাসপাতালের নার্স ইনচার্জ আফরোজা সুলতানা বলেন, ‘যত রোগী এখানে ভর্তি থাকে তার ৮০ ভাগই কোনো না কোনো মামলাসংক্রান্ত।’

মিঠাপুকুরের লতিবপুর থেকে আসা রোগী রিপন মিয়া বলেন, ‘ভাইয়ের সঙ্গে জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্ব। ভাই, ভাবি, ভাতিজাদের সঙ্গে মারামারি। থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। মামলা করতে মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে। এজন্য ভর্তি হয়েছি।’

মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার সোমা প্রামাণিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অধিকাংশ রোগী মারামারি তথা মামলাসংক্রান্ত। অনেককে ছাড়পত্র দিলেও বাড়িতে যেতে চান না।’

প্রান্তিক পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে উপজেলা পর্যায়ের ৩০ ও ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত ৩ জুন সচিবালয়ে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

জনবল ও বাজেট সুবিধা না বাড়িয়ে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অবশ্য ‘অর্থহীন’ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আব্দুস সবুর খান বলেন, ‘উপজেলায় অবকাঠামো বড় করে দালান বানালেও ডাক্তার না থাকলে তা খালি পড়ে থাকবে। আগে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞের পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’

একই মত চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুবের। তার মতে, হাসপাতালগুলোতে শুধু শয্যা বাড়িয়ে, ভবন তুলে বা চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনে স্বাস্থ্য খাতের মূল সমস্যার সমাধান হবে না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গত ২১ সেপ্টেম্বরের চিত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গত ২১ সেপ্টেম্বরের চিত্র। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির এই চেয়ারম্যান বলেন, ‘শয্যা বাড়ালে বাড়তি বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ লাগবে। চিকিৎসকদের বসার জায়গা লাগবে। পর্যাপ্ত জনবল প্রয়োজন হবে। কিন্তু এসব মৌলিক জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যেখানে বিদ্যমান পোস্টগুলোতেই চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে শয্যা বাড়িয়ে নতুন জনবল কোথা থেকে আসবে?’

পুরো দেশে ঢালাওভাবে শয্যা না বাড়িয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন বিএমএর সাবেক সভাপতি। তিনি বলেন, ‘পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাইলে আগে অন্তত দুই থেকে চারটি উপজেলা হাসপাতালে এটি শতভাগ কার্যকর করে দেখতে হবে। সেবা দেওয়ার সামগ্রিক সামর্থ্য না বাড়িয়ে কেবল ফাঁকা বেড ও দালানকোঠা বাড়ানো অর্থহীন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী বলেন, ‘জনসংখ্যার তুলনায় সরকারি হাসপাতালে বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসহ অন্যান্য জনবলের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এর মধ্যে বদলি তো আছেই। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও সেখানে জনবল ৫০ শয্যার। আবার আড়াইশ শয্যার হাসপাতাল চলছে ১০০ শয্যার জনবলে। উপজেলা পর্যায়ে গড়ে অর্ধেক পদ ফাঁকা। এর মধ্যে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে, এমন ৮০টি উপজেলা হাসপাতাল চিহ্নিত করেছি।’

পদ সৃষ্টি না করে নতুন করে উপজেলায় শয্যা বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা সুফল দেবে? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘নতুন অবকাঠামোকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে জনবলের স্ট্যান্ডার্ড সেটআপ চেয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মানুষ যাতে হাতের কাছে উন্নত মানের চিকিৎসা পায়, সেজন্য উপজেলা পর্যায়ে ১০১ শয্যায় রূপান্তর হচ্ছে। গণপূর্ত বিভাগ অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা মূল্যায়ন করবে। প্রধানমন্ত্রী এসব হাসপাতালে প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে শহরমুখী রোগীর চাপ অনেকটা কমে আসবে।’


প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন নরসিংদী ও রংপুর প্রতিনিধি।