হৃদয়ের রেকর্ডগড়া ২৪২, লিড নিয়ে দিন শেষ বাংলাদেশের
-edaf2f-720x405.webp)
সাত উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ তখন মাত্র ১৮৪ রান। ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের ৩৫৬ রানও অনেক দূরের পথ। চোটের কারণে ব্যাট করতে পারছেন না সাদমান ইসলাম। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যাট হাতে একাই লড়াই চালিয়ে গেলেন তাওহিদ হৃদয়। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি ভাঙলেন একের পর এক রেকর্ড। শেষ পর্যন্ত অপরাজিত ২৪২ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংসে বাংলাদেশকে এনে দিলেন ৩০ রানের লিড। তার ব্যাটে ভর করেই সিলেট টেস্টের তৃতীয় দিনে দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করল স্বাগতিকরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলা শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসের সংগ্রহ বিনা উইকেটে ৭ রান। আলোকস্বল্পতার কারণে মাত্র চার ওভার পরই দিনের খেলা শেষ ঘোষণা করেন আম্পায়াররা। ব্র্যান্ডন কিং ৫ ও জশুয়া ডা সিলভা ২ রানে অপরাজিত। প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড পাওয়া বাংলাদেশ দিন শেষে এগিয়ে ২৩ রানে।
আগের দিনের ৩ উইকেটে ৮৮ রান নিয়ে তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ। হৃদয় ২৯ ও মুশফিকুর রহিম ১৯ রানে অপরাজিত ছিলেন। দিনের শুরুতে দুজনের ব্যাটে প্রতিরোধের আশা জাগলেও দ্রুতই সেই জুটি ভাঙেন জোমেল ওয়ারিক্যান। তার ফ্লাইট দেওয়া বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে শর্ট কভারে ব্র্যান্ডন কিংয়ের দুর্দান্ত ক্যাচে ফেরেন মুশফিক। ৭৬ বলে ৩৪ রান করেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।
মুশফিকের বিদায়ের পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি লিটন দাসও। একই বোলারের বলে একই ফিল্ডারের হাতে ক্যাচ দিয়ে মাত্র ৮ রানে ফেরেন তিনি। এরপর হৃদয়ের সঙ্গে জুটি গড়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তবে রস্টন চেজের বলে জাস্টিন গ্রিভসের হাতে ক্যাচ দিয়ে ১৬ রানে থামে তার ইনিংস।
এরপর হাসান মাহমুদকেও ফিরিয়ে দেন ওয়ারিক্যান। ১ রান করা হাসানকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন এই বাঁহাতি স্পিনার। দলীয় ১৮৪ রানে সপ্তম উইকেট হারিয়ে তখন বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কায় বাংলাদেশ। সাদমানের চোটের কারণে কার্যত হাতে ছিল আর মাত্র একটি উইকেট। কিন্তু অন্য প্রান্তে অবিচল ছিলেন হৃদয়।
দলের বিপর্যয়ের মধ্যেই ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ১৭১ বলে শতক পূর্ণ করে ব্যাট উঁচিয়ে দর্শকদের অভিবাদনের জবাব দেন। পরে সিজদায় মাথা নত করেন তরুণ এই ব্যাটার। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাড়ায় ৭ উইকেটে ২০৫ রান। হৃদয় অপরাজিত ছিলেন ঠিক ১০০ রানে।
বিরতির পর আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন হৃদয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্পিনারদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে দ্রুত রান বাড়াতে থাকেন। অন্য প্রান্তে তাকে দারুণ সঙ্গ দেন তাইজুল ইসলাম। অষ্টম উইকেটে দুজন গড়েন ১১৭ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। এই জুটিতেই বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা অনেকটা কাটিয়ে ওঠে বাংলাদেশ।
তবে ৫৬ বলে ২২ রান করে ওয়ারিক্যানের বলে স্টাম্পিং হয়ে ফেরেন তাইজুল। এরপর তাসকিন আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান হৃদয়। চা বিরতির আগে ওয়ারিক্যানের এক ওভারে ছক্কা ও চার মেরে পৌঁছে যান ১৯০ রানে। ৮ উইকেটে ৩১৮ রান নিয়ে চা বিরতিতে যায় বাংলাদেশ।
শেষ সেশনে আরও বড় ইতিহাসের জন্ম দেন হৃদয়। ওয়ারিক্যানের বলে এক রান নিয়ে ৩০৪ বলে পূর্ণ করেন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিকে দ্বিশতকে রূপ দেন তিনি। মুশফিকুর রহিম, তামিম ইকবাল ও সাকিব আল হাসানের পর দেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবেও স্পর্শ করেন এই মাইলফলক। দেশের হয়ে টেস্টে এটি ষষ্ঠ ডাবল সেঞ্চুরি।
সেখানেই শেষ নয়। এরপর মুশফিকের গড়া বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংসের রেকর্ডও ভেঙে দেন হৃদয়। ২০১৮ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মুশফিকের অপরাজিত ২১৯ রান ছিল আগের সর্বোচ্চ। সেই রেকর্ড পেরিয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছান তিনি।
একই সঙ্গে এক টেস্ট ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ ১১টি ছক্কা মারার রেকর্ডও গড়েন হৃদয়। তার ব্যাট থেকে বাউন্ডারিতে এসেছে ১৫৪ রান, যা বাংলাদেশের আরেকটি রেকর্ড। শুধু তা-ই নয়, আগের দিন ২৯ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয় তৃতীয় দিনে একাই করেছেন ২১৩ রান। এতে এক দিনে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ রান করার সাকিব আল হাসানের ২১২ রানের রেকর্ডও ভেঙেছেন তিনি।
হৃদয়ের এই অসাধারণ ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের সংগ্রহও ছাড়িয়ে যায় বাংলাদেশ। জশুয়া বিশপের বলে ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে লিড এনে দেন তিনি। তাসকিনের সঙ্গে নবম উইকেটে যোগ করেন আরও ৮৫ রান। শেষ দুই জুটিতে তাঁর নেতৃত্বে ২০২ রান যোগ করে বাংলাদেশ।
শেষ পর্যন্ত ১১২তম ওভারে তাসকিনকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি টানেন জেইডেন সিলস। শর্ট বল পুল করতে গিয়ে ফাইন লেগে জশুয়া বিশপের হাতে ক্যাচ দেন তাসকিন। ২৯ বলে ১২ রান করেন তিনি।
চোটের কারণে সাদমান ব্যাট করতে না নামায় ১১১.৫ ওভারে ৯ উইকেটে ৩৮৬ রানেই থামে বাংলাদেশ। ৩৫৯ বলে ২২টি চার ও ১১টি ছক্কায় ২৪২ রানে অপরাজিত থাকেন হৃদয়। ক্যারিবীয়দের হয়ে ১০৪ রানে ৪ উইকেট নেন ওয়ারিক্যান।
দিনের শেষ ভাগে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। শুরুতেই তাসকিনের বলে দুটি রিভিউ নিয়ে সফল হতে পারেনি বাংলাদেশ। তবে ক্যারিবীয় ওপেনাররাও খুব বেশি রান তুলতে পারেননি। ব্র্যান্ডন কিং ও জশুয়া ডা সিলভা সতর্ক ব্যাটিংয়ে প্রথম চার ওভার পার করেন। এরপর আলোকস্বল্পতায় নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয় দিনের খেলা।
প্রথম টেস্টে আট উইকেটে হেরে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সামনে এখন সমতায় ফেরার সুযোগ। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে এখনো কোনো উইকেট পড়েনি। ফলে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে চতুর্থ দিনের প্রথম সেশন।
হৃদয়ের ইতিহাসগড়া ইনিংসে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা কাটিয়ে লিড নিয়েছে বাংলাদেশ। এবার সেই লড়াইকে জয়ে রূপ দিতে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ স্বাগতিক বোলারদের সামনে।


