logo

হজের ১৪০ রানে সিলেটে দাপট উইন্ডিজের, কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ

হজের ১৪০ রানে সিলেটে দাপট উইন্ডিজের, কঠিন পরীক্ষায় বাংলাদেশ
হজের শতকে চতুর্থ দিন শেষে বড় বিপদে উইন্ডিজ। ছবি: এএফপি

তাওহিদ হৃদয়ের রেকর্ডগড়া ডাবল সেঞ্চুরিতে সিলেট টেস্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৩০ রানের লিড নিয়ে জয়ের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল স্বাগতিকরা। কিন্তু চতুর্থ দিনেই বদলে গেল ম্যাচের চিত্র। কাভেম হজের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি আর ক্যারিবীয় ব্যাটারদের দাপটে উল্টো বড় বিপদে পড়েছে বাংলাদেশ।

সারা দিনে মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ৩৩৮ রান যোগ করেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাতে শেষ দিনে স্বাগতিকদের সামনে অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা। জিততে হলে ভাঙতে হতে পারে নিজেদের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার রেকর্ডও।

রোববার (৮ নভেম্বর) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের চতুর্থ দিনের খেলা শেষ হয়েছে আলোকস্বল্পতায়। দিন শেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ ৮৩ ওভারে ৩ উইকেটে ৩৪৫ রান। বাংলাদেশের চেয়ে ৩১৫ রানে এগিয়ে সফরকারীরা। ১৮৯ বলে ১৭টি চার ও একটি ছক্কায় ১৪০ রান নিয়ে অপরাজিত কাভেম হজ। তার সঙ্গে ৪৯ বলে ২০ রান করে ক্রিজে আছেন আমির জাঙ্গু।

আগের দিন বিনা উইকেটে ৭ রান নিয়ে খেলা শেষ করেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের লিড থেকে ২৩ রান পিছিয়ে ছিল ক্যারিবীয়রা। চতুর্থ দিনের শুরুতে দ্রুত কয়েকটি উইকেট তুলে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার সুযোগ ছিল স্বাগতিকদের সামনে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা সফল হতে দেননি ব্র্যান্ডন কিং ও জশুয়া ডা সিলভা।

দিনের শুরু থেকেই বাংলাদেশের পেসারদের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং করেন দুই ওপেনার। তাসকিন আহমেদ ও হাসান মাহমুদের আলগা বলগুলো কাজে লাগিয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন তাঁরা। উদ্বোধনী জুটিতে ৮৫ রান যোগ করার পর অবশেষে বাংলাদেশকে প্রথম সাফল্য এনে দেন তাইজুল ইসলাম। তার বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ৭০ বলে ৩৬ রান করে ফেরেন ডা সিলভা।

তবে অন্য প্রান্তে আক্রমণ চালিয়ে যান কিং। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে চার মেরে ৬২ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত মিরাজের বলেই স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ক্যারিবীয় ওপেনার। ৮৪ বলে ১০টি চার ও একটি ছক্কায় ৬১ রান করেন কিং।

মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২ উইকেটে ১২৮ রান। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ৩০ রানের লিড তখনই মুছে গেছে। উল্টো ৯৮ রানে এগিয়ে যায় সফরকারীরা।

প্রথম সেশনে দুটি উইকেট পেলেও দ্বিতীয় সেশনে পুরোপুরি ব্যর্থ হন বাংলাদেশের বোলাররা। কাভেম হজ ও অভিষিক্ত কেভিন উইকহ্যাম মিলে গড়ে তোলেন বড় জুটি। স্পিনারদের বিপক্ষে যেমন আত্মবিশ্বাসী ছিলেন তারা, তেমনি পেসারদেরও সুযোগ দেননি ম্যাচে ফেরার।

বিশেষ করে হজের ব্যাটিংয়ে ছিল ধৈর্য ও আক্রমণের দারুণ সমন্বয়। প্রথম ইনিংসে মাত্র ১ রান করে ফিরে যাওয়া এই ব্যাটার দ্বিতীয় ইনিংসে শুরু থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। উইকহ্যামকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের বোলারদের ওপর চাপ বাড়াতে থাকেন তিনি।

দ্বিতীয় সেশনে কোনো উইকেট না হারিয়ে ১৩১ রান যোগ করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চা-বিরতিতে তাদের সংগ্রহ পৌঁছে যায় ২ উইকেটে ২৫৯ রানে। হজ তখন ৯৩ এবং উইকহ্যাম ৬৩ রানে অপরাজিত। দুজনের জুটি পৌঁছে যায় ১৪০ রানে।

এই সেশনে বাংলাদেশের বোলিংয়ে ধারাবাহিকতার অভাব ছিল স্পষ্ট। উইকেট থেকে কিছুটা টার্ন পাওয়া গেলেও ব্যাটারদের চাপে ফেলার মতো কার্যকর বোলিং করতে পারেননি স্পিনাররা। পেসাররাও নতুন কিংবা পুরোনো বলে নিয়মিত সুযোগ তৈরি করতে ব্যর্থ হন।

শেষ সেশনে তাইজুলের বলে সুইপ করে এক রান নিয়ে ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হজ। ১৪২ বলে শতক ছুঁয়ে উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন ক্যারিবীয় ব্যাটার।

অন্য প্রান্তে উইকহ্যামও এগোচ্ছিলেন শতকের দিকে। তবে ৬৮তম ওভারে তাকে ফিরিয়ে অবশেষে দীর্ঘ জুটি ভাঙেন তাইজুল। নিজের বলে নিজেই ক্যাচ নেন বাঁহাতি এই স্পিনার। ১০৭ বলে সাতটি চার ও দুটি ছক্কায় ৭৮ রান করেন উইকহ্যাম। হজের সঙ্গে তৃতীয় উইকেটে তার জুটিতে আসে ১৬৫ রান।

অভিষেক টেস্টে দুই ইনিংসেই অর্ধশতক তুলে নিলেন উইকহ্যাম। প্রথম ইনিংসে করেছিলেন ৬১ রান। এবার দ্বিতীয় ইনিংসেও বাংলাদেশের বোলারদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেন তিনি।

উইকহ্যামের বিদায়ের পরও বাংলাদেশের স্বস্তি ফেরেনি। আমির জাঙ্গুকে সঙ্গে নিয়ে আরও ৬১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন হজ। এর মধ্যেই দলীয় তিনশ পেরিয়ে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংগ্রহ। একপর্যায়ে লিডও ছাড়িয়ে যায় তিনশ।

শেষ বিকেলে আলোকস্বল্পতায় খেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর মাঠে ফিরতে পারেননি ক্রিকেটাররা। ফলে দিনের খেলা শেষ হয় নির্ধারিত সময়ের আগেই।

বাংলাদেশের হয়ে তাইজুল ২৯ ওভারে ১১৮ রান দিয়ে দুটি এবং মিরাজ ২২ ওভারে ৫৮ রান দিয়ে একটি উইকেট নিয়েছেন। তাসকিন, হাসান ও নাঈম কেউই দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট পাননি।

এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ শেষ দিনের সমীকরণ। টেস্ট ক্রিকেটে তাদের সর্বোচ্চ সফল রান তাড়ার লক্ষ্য ২১৫, যা ২০০৯ সালে গ্রেনাডায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষেই পেরিয়েছিল বাংলাদেশ। সেবার ২১৫ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৬ উইকেটে ২১৭ রান তুলে জয় পেয়েছিল সাকিব আল হাসানের দল।

অথচ সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই মুহূর্তে ইনিংস ঘোষণা করলেও বাংলাদেশের লক্ষ্য হবে ৩১৬ রান। অর্থাৎ জিততে হলে নিজেদের আগের রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়তে হবে স্বাগতিকদের। ক্যারিবীয়রা আরও ব্যাট করলে সেই লক্ষ্য আরও বড় হবে।

তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ কখন ইনিংস ঘোষণা করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ঘোষণা করলে বাংলাদেশের সামনে বড় লক্ষ্য তাড়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত সময় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ থাকবে। অন্যদিকে দেরিতে ঘোষণা করলে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সময় কমে আসবে। সেক্ষেত্রে ড্রয়ের সম্ভাবনাও বাড়বে।

মিরপুরে প্রথম টেস্ট আট উইকেটে হেরে ইতোমধ্যে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে পিছিয়ে বাংলাদেশ। ফলে সিলেটে জয় ছাড়া সিরিজ হার এড়ানোর সুযোগ নেই। তবে চতুর্থ দিনের ব্যাটিং ব্যর্থতার পর সেই লক্ষ্য অর্জন এখন অনেক কঠিন।

হৃদয়ের ঐতিহাসিক ২৪২ রানের ইনিংসে যে আশার আলো জ্বলেছিল, হজের সেঞ্চুরিতে তা অনেকটাই ম্লান। শেষ দিনে বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমে যত দ্রুত সম্ভব ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস শেষ করা কিংবা ঘোষণার অপেক্ষা করা, এরপর বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করা।

নুরসাদ আমিন

সম্পাদনা

নুরসাদ আমিন

স্পোর্টস রিপোর্টার | এশিয়া পোস্ট