নরওয়ে ম্যাচে কিংবদন্তিকে ছোঁয়ার সুযোগ ব্রুনোর সামনে

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
নরওয়ে ম্যাচে কিংবদন্তিকে ছোঁয়ার সুযোগ ব্রুনোর সামনে
ব্রুনো গিমারায়েস। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের আক্রমণভাগে আলোটা সাধারণত ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, নেইমার, মাথেউস কুনিয়া বা রায়ানদের ওপরই পড়ে। গোল যার, শিরোনামও অনেক সময় তার। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণের পেছনে সবচেয়ে ধারাবাহিক কারিগর হয়ে উঠেছেন ব্রুনো গিমারায়েস।

নিউক্যাসল ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডার চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৪টি গোলে সহায়তা করেছেন। জাপানের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির জয়সূচক গোলেও শেষ পাসটি ছিল তার। সেই গোলে সহায়তাই ব্রুনোকে ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসের বিশেষ এক আলোচনায় তুলে দিয়েছে।

পরিসংখ্যানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম গাতো মেস্ত্রের হিসাব অনুযায়ী, এক বিশ্বকাপে ৪টি গোলে অ্যাসিস্ট করে ব্রুনো ছুঁয়েছেন জিকো, তোস্তাও ও আদেমির মেনেজেসকে। ১৯৮২ বিশ্বকাপে জিকো, ১৯৭০ বিশ্বকাপে তোস্তাও এবং ১৯৫০ বিশ্বকাপে আদেমির ৪টি করে গোলে সহায়তা করেছিলেন। এবার সেই তালিকায় নাম লিখিয়েছেন ব্রুনো।

তার সামনে এখন মারিও জাগালো। ১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের পথে জাগালো করেছিলেন ৫টি গোলে সহায়তা। সেই আসরে গারিঞ্চা ও আমারিলদোকে দুবার করে এবং ভাভাকে একবার গোলের পাস দিয়েছিলেন ‘ওল্ড উলফ’ নামে পরিচিত ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেই তাই জাগালোকে ছোঁয়ার সুযোগ ব্রুনোর সামনে।

জাগালোকে ছুঁলে ব্রুনো শুধু আরেকটি ব্যক্তিগত মাইলফলকেই পৌঁছাবেন না, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসের আরও উঁচু স্তরে উঠে যাবেন। জাগালোর সঙ্গে ৫ গোলে সহায়তার তালিকায় আছেন আরও কয়েকজন বড় নাম। ১৯৯৪ সালে জার্মানির থমাস হ্যাসলার, ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনার দিয়েগো মারাদোনা, ১৯৮২ সালে জার্মানির পিয়েরে লিটবারস্কি এবং ১৯৭৪ সালে পোল্যান্ডের রবার্ট গাডোচাও এক আসরে ৫টি করে গোলে সহায়তা করেছিলেন।

এর পরের ধাপ আরও বড়। সেখানে ব্রাজিলের তিন কিংবদন্তি পেলে, দিদি ও জাইর। গাতো মেস্ত্রের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৭০ বিশ্বকাপে পেলে করেছিলেন ৬টি গোলে সহায়তা। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে দিদি এবং ১৯৫০ বিশ্বকাপে জাইরের গোলে সহায়তার সংখ্যাও ছিল ৬।

বিশ্বকাপে এক আসরে গোলে অ্যাসিস্টের সর্বোচ্চ রেকর্ড অবশ্য এখনো বেশ দূরে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের রেমঁ কোপা করেছিলেন ৯টি গোলে সহায়তা। সেই আসরে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ ছিল ভয়ংকর। ১৩ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন জুস্ত ফঁতেন, আর পেছন থেকে সেই আক্রমণের অন্যতম সৃজনশীল চালক ছিলেন কোপা।

চলতি বিশ্বকাপের গোলে সহায়তার দৌড়েও ব্রুনোর সামনে একজন ফরাসি। মাইকেল ওলিসে এখন পর্যন্ত ৫ গোলে সহায়তা করে তালিকার শীর্ষে আছেন। ব্রুনো ৪ গোলে সহায়তা নিয়ে তার ঠিক পেছনে। ব্রাজিল যত দূর যাবে, ব্রুনোর সামনে তত সুযোগ থাকবে এই দৌড়ে আরও ওপরে ওঠার।

এই পরিসংখ্যানের বাইরেও ব্রুনোর গুরুত্ব বড়। তিনি শুধু শেষ পাস দিচ্ছেন না, ব্রাজিলের মাঝমাঠে ভারসাম্যও রাখছেন। কাসেমিরোর পাশে থেকে কখনো বল পুনরুদ্ধার করছেন, কখনো আক্রমণের গতি বাড়াচ্ছেন, কখনো আবার বক্সের বাইরে দাঁড়িয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার সঠিক মুহূর্ত খুঁজছেন।

জাপানের বিপক্ষে তার গোলে অ্যাসিস্টে এর বড় উদাহরণ। ম্যাচ তখন শেষের দিকে, ব্রাজিল চাপের মধ্যে। সামান্য ভুল সিদ্ধান্তে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে যেতে পারত। কিন্তু ব্রুনো ঠান্ডা মাথায় জায়গা চিনেছেন, মার্তিনেল্লিকে পাস দিয়েছেন, আর সেখান থেকেই এসেছে জয়সূচক গোল।

কার্লো আনচেলত্তিও ব্রুনোর গুরুত্ব আগেই বলেছেন। ব্রাজিল কোচের চোখে তিনি শুধু সৃজনশীল খেলোয়াড় নন, রক্ষণ ও আক্রমণ দুই দিকেই ধারাবাহিক অবদান রাখা একজন নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার। আনচেলত্তি ব্রুনোকে বড় হৃদয়ের খেলোয়াড়ও বলেছেন।

নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে ব্রুনোর সামনে তাই দ্বিগুণ পরীক্ষা। একদিকে আর্লিং হালান্ড ও মার্টিন ওডেগার্ডের নরওয়েকে থামাতে মাঝমাঠে লড়তে হবে। অন্যদিকে আক্রমণে ভিনিসিয়ুস, কুনিয়া, মার্তিনেল্লিদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে হবে। এই ম্যাচে আর একটি গোলে সহায়তা করলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন জাগালোকে।

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলের গল্প অনেক আছে। পেলে, রোনালদো, রোমারিও, রিভেলিনো, রোনালদিনিওদের আলোয় ভরা সেই ইতিহাসে এবার একজন মিডফিল্ডার নিজের জায়গা তৈরি করছেন শেষ পাসের শিল্পে। ব্রুনো গিমারায়েসের বিশ্বকাপ এখন সেই গল্পই বলছে।