নরওয়ে ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে ২৪ বছরের হিসাব মেলানোর সুযোগ

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
নরওয়ে ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে ২৪ বছরের হিসাব মেলানোর সুযোগ
ব্রাজিল ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

ব্রাজিলের সামনে আগামীকাল শুধু শেষ ষোলোর ম্যাচ নয়, আছে ২৪ বছরের এক অস্বস্তিকর হিসাব মেলানোর সুযোগও। প্রতিপক্ষ নরওয়ে, কিন্তু গল্পটা শুধু নরওয়েতে আটকে নেই। বিশ্বকাপের নকআউটে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে ২০০২ সালের পর আর যে জিততে পারেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

২০০২ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে শেষবার ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নকআউট জয় পেয়েছিল ব্রাজিল। সেই রাতেই রোনালদো নাজারিওর জোড়া গোলে পঞ্চম বিশ্বকাপ জিতেছিল সেলেসাওরা। এরপর থেকে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রতিটি বিদায়ই এসেছে ইউরোপীয় দলের হাতে।

২০০৬ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ১-০ গোলে হেরে থেমে যায় রোনালদো-রোনালদিনিও-কাকার ব্রাজিল। ২০১০ সালে নেদারল্যান্ডসের কাছে ২-১ গোলে হেরে শেষ আট থেকেই বিদায়। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের সেই দুঃস্বপ্ন। ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে ২-১ হার। এরপর ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে পেনাল্টি শুটআউটে বিদায়।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। কিন্তু এই পরিসংখ্যানই তাদের সাম্প্রতিক নকআউট বাস্তবতাকে অস্বস্তিকর করে তোলে। লাতিন আমেরিকার ছন্দ, ড্রিবল আর তারকা-সমৃদ্ধ আক্রমণের বিপরীতে ইউরোপীয় দলগুলোর শৃঙ্খলা, শারীরিক শক্তি, চাপ তৈরি করার ক্ষমতা ও ম্যাচ সামলানোর দক্ষতা বারবার ব্রাজিলকে আটকে দিয়েছে।

আজ রাত পেরিয়ে বাংলাদেশ সময় সোমবার ভোর ২টায় নরওয়ের বিপক্ষে সেই ইতিহাসই নতুন করে সামনে আসছে। কাগজে-কলমে নরওয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম বা ক্রোয়েশিয়ার মতো বিশ্বকাপ-ঐতিহ্যের দল নয়। কিন্তু এবারের নরওয়ে ভিন্ন। সামনে আছেন আর্লিং হালান্ড, পেছনে খেলার নির্মাতা মার্টিন ওডেগার্ড। দুজন মিলে যে কোনো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন।

তার ওপর নরওয়ের বিপক্ষেও ব্রাজিলের রেকর্ড স্বস্তির নয়। আগের চার দেখায় ব্রাজিল কখনো নরওয়েকে হারাতে পারেনি। দুই ড্র, দুই হার। ১৯৯৮ বিশ্বকাপেও নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরেছিল সেলেসাওরা। তাই এই ম্যাচে ব্রাজিলের সামনে দুটি ট্যাবু একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে, নরওয়েকে না হারানোর ইতিহাস এবং ২০০২-পরবর্তী ইউরোপীয় নকআউট ব্যর্থতা।

কার্লো আনচেলত্তির দলের জন্য ম্যাচটা তাই মানসিক পরীক্ষাও। ব্রাজিল শেষ ৩২-এ জাপানকে হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জয়টা এসেছে কষ্ট করে। পিছিয়ে পড়ার পর কাসেমিরো সমতা ফেরান, শেষ দিকে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির গোলে জেতে ব্রাজিল। ফল এসেছে, কিন্তু পারফরম্যান্স পুরোপুরি নিশ্চিন্ত করেনি।

নরওয়ের বিপক্ষে সেই ভুলের সুযোগ কম। হালান্ডকে একবার ফাঁকা জায়গা দিলেই বিপদ। ব্রাজিলের পরিকল্পনার বড় অংশ হবে, বল যেন তাঁর কাছে না পৌঁছায়। মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারায়েস ও কাসেমিরোর ওপর তাই চাপ থাকবে বেশি। ওডেগার্ডকে জায়গা দিলে হালান্ডের দিকে সেই শেষ পাস আসতেই পারে।

আনচেলত্তির আরেক দুশ্চিন্তা লুকাস পাকেতার অনুপস্থিতি। জাপানের বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিং চোট পাওয়া পাকেতাকে নরওয়ের বিপক্ষে পাওয়া যাচ্ছে না। তার জায়গায় গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির শুরু থেকে খেলার সম্ভাবনা বেশি। এতে ব্রাজিল পাবে গতি, কিন্তু মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে ব্রুনো ও কাসেমিরোকে।

রাফিনিয়ার ফেরা অবশ্য ব্রাজিলকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। তিনি শতভাগ ফিট নন, তবে বেঞ্চে থাকার মতো অবস্থায় আছেন। ম্যাচ যদি শেষ দিকে আটকে যায়, রাফিনিয়ার গতি ও অভিজ্ঞতা আনচেলত্তির জন্য কার্যকর অস্ত্র হতে পারে।

তবে সব হিসাবের বাইরে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় ভরসা তাদের আক্রমণভাগ। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, মাথেউস কুনিয়ার মুভমেন্ট, মার্তিনেল্লির সরাসরি দৌড়, রায়ানের সাহস, সব মিলিয়ে নরওয়ের রক্ষণকে কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। নেইমারও ফিট, যদিও তার ভূমিকা কতটা বড় হবে, সেটি নির্ভর করবে আনচেলত্তির ম্যাচ পরিকল্পনার ওপর।

ব্রাজিল জিতলে শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে উঠবে না, ভাঙবে দীর্ঘদিনের এক মানসিক বাধাও। ২০০২-এর পর প্রথমবার বিশ্বকাপ নকআউটে ইউরোপীয় দলকে হারাবে সেলেসাওরা। আর হারলে একই গল্প আবারও ফিরবে, ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন থামল ইউরোপের দেয়ালে।