ইন্দোনেশিয়ার বিশ্বকাপ সরিয়েছিল ফিফা, যুক্তরাষ্ট্রের বেলায় কেন ভিন্ন সুর?

বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি মাত্র এক দিন তবে তার আগেই বড় এক প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। প্রশ্নটা শুধু একজন রেফারির যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে না পারা নিয়ে নয়। প্রশ্নটা আরও বড়: বিশ্বকাপ আসলে কার নিয়ন্ত্রণে? ফিফার, নাকি আয়োজক দেশের সীমান্ত কর্তৃপক্ষের?
সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য নির্বাচিত ম্যাচ অফিসিয়ালদের একজন ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি হতে যাচ্ছিলেন বিশ্বকাপের মূল পর্বে দায়িত্ব পাওয়া প্রথম সোমালি রেফারি। আফ্রিকান ফুটবলে তাঁর অবস্থানও ছোট নয়। ২০২৫ সালে কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবল তাঁকে বর্ষসেরা পুরুষ রেফারি হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়।
কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই ঐতিহাসিক উপস্থিতির আগেই থেমে গেল তাঁর যাত্রা। বৈধ ভিসা থাকার পরও মায়ামি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে সোমালিয়ার সরকারি ও ফুটবল সূত্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, যাচাইসংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তাঁকে প্রবেশের অযোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। ফিফার অবস্থান আরও সংক্ষিপ্ত: অভিবাসন সিদ্ধান্ত আয়োজক দেশের কর্তৃপক্ষের বিষয়, ফিফার নয়।
আইনগতভাবে কথাটা ভুল নয়। কোনো দেশে কে ঢুকবে, কে ঢুকবে না, তা শেষ পর্যন্ত সেই দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিশ্বকাপ সাধারণ কোনো পর্যটন আয়োজন নয়। এখানে শুধু দর্শক নয়, খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তা, রেফারি, প্রযুক্তি কর্মী, সম্প্রচার দল, সংবাদমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবক—হাজারো মানুষকে নির্ধারিত সময়ে সীমান্ত পেরিয়ে কাজে নামতে হয়। তাই বিশ্বকাপের আয়োজক বেছে নেওয়ার সময় ফিফা শুধু স্টেডিয়াম দেখে না; দেখে প্রবেশাধিকার, ভিসা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও বৈষম্যহীনতার নিশ্চয়তাও। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বকাপের মতো ইভেন্টের আয়োজক স্বত্ত্ব পেতে হলে ফিফাকে সব অংশগ্রহণকারীদের জন্য সহজেই ভিসার নিশ্চয়তা দিতে হয়। তবে এবারের বিশ্বকাপে ব্যাপারটি আর সেই জায়গায় সীমাবদ্ধ নেই।
আর সেখানেই আরতানের ঘটনা ফিফার নীতিগত অবস্থানকে অস্বস্তিতে ফেলছে। কারণ এর আগেই অন্য রকম ফিফাকে দেখেছে ফুটবল বিশ্ব।
২০২৩ সালে একই রকম ঘটনার জন্য ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের আয়োজকত্ব কেড়ে নিয়েছিল ফিফা। আনুষ্ঠানিক ভাষায় কারণ বলা হয়েছিল “বর্তমান পরিস্থিতি”। কিন্তু সেই পরিস্থিতির কেন্দ্রে ছিল ইসরায়েল দলকে নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক আপত্তি। ইন্দোনেশিয়ার কিছু প্রাদেশিক ও রাজনৈতিক মহল ইসরায়েলকে খেলতে দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল। শেষ পর্যন্ত ফিফা পুরো টুর্নামেন্ট সরিয়ে নেয়। বার্তা ছিল পরিষ্কার: আয়োজক দেশ হলে সব যোগ্য দলকে গ্রহণ করতে হবে।
তাহলে ২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা উঠবেই। যদি আয়োজক দেশের দায়িত্ব হয় সব যোগ্য অংশগ্রহণকারীর প্রবেশ নিশ্চিত করা, তাহলে একজন নির্বাচিত বিশ্বকাপ রেফারি বৈধ ভিসা থাকা সত্ত্বেও ঢুকতে না পারলে ফিফার ভূমিকা কী? যদি ইন্দোনেশিয়া একটি দলের অংশগ্রহণ ঘিরে রাজনৈতিক আপত্তির কারণে আয়োজকত্ব হারাতে পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ফিফা শুধু “এটি অভিবাসন কর্তৃপক্ষের বিষয়” বলে পাশ কাটাতে পারে কি?
অবশ্য দুটি ঘটনা পুরোপুরি এক নয়। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ছিল একটি জাতীয় দলের অংশগ্রহণ ঘিরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক আপত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রশ্ন। একদিকে দল, অন্যদিকে ম্যাচ অফিসিয়াল। একদিকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই আয়োজকত্ব সরিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে বিশ্বকাপ শুরুর মুখে নির্দিষ্ট একজন রেফারির প্রবেশ আটকে যাওয়া।
তবু নীতির জায়গায় মিল আছে। বিশ্বকাপে যোগ্যতার ভিত্তিতে জায়গা পাওয়া কেউ কি আয়োজক দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা নিরাপত্তা নীতির কারণে অংশ নিতে না পারবে? ফিফার টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের অধিকার কি ফিফা নিশ্চিত করতে পারে, নাকি শেষ কথা বলবে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন ডেস্ক?
ফিফার জন্য সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ এখানেই। ছোট বা রাজনৈতিকভাবে কম প্রভাবশালী আয়োজক দেশের ক্ষেত্রে ফিফা কঠোর হতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে সেটাই দেখা গেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী আয়োজক দেশের ক্ষেত্রে ফিফার ভাষা অনেক নরম, অনেক সতর্ক। এই পার্থক্যই দ্বিচারিতার অভিযোগকে শক্তি দিচ্ছে।
ফিফা নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন বাতিল করতে পারে না। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার দেওয়ার আগে ফিফা যে নিশ্চয়তা চায়, সেই নিশ্চয়তার মূল্য কত? যদি কোনো নির্বাচিত রেফারি, কর্মকর্তা বা অংশগ্রহণকারী বৈধ প্রক্রিয়া মেনেও প্রবেশ করতে না পারেন, তাহলে ফিফার আয়োজন কাঠামো কোথায় দাঁড়ায়?
আরতানের ঘটনা শুধু সোমালিয়ার জন্য আঘাত নয়। এটি আফ্রিকান ফুটবলের জন্যও একটি প্রতীকী ধাক্কা। একজন রেফারি, যিনি যোগ্যতা দিয়ে বিশ্বকাপের তালিকায় জায়গা পেয়েছিলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত মাঠে নামার সুযোগ পেলেন না। তাঁর দেশ, তাঁর মহাদেশ, তাঁর ব্যক্তিগত যাত্রা সবকিছুই থেমে গেল সীমান্ত সিদ্ধান্তের সামনে।
বিশ্বকাপ নিজেকে সব সময় বৈশ্বিক উৎসব বলে। ফিফা বলে, ফুটবল সবার। কিন্তু সেই “সবার” ফুটবলে যদি একজন নির্বাচিত রেফারিই প্রবেশাধিকার না পান, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। এই প্রশ্ন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের দিকে নয়, ফিফার দিকেও।
কারণ আয়োজক দেশের সার্বভৌমত্ব যেমন বাস্তব, তেমনি বিশ্বকাপের ন্যায্যতা নিশ্চিত করাও ফিফার দায়িত্ব। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে ফিফা বলেছিল, বৈশ্বিক ফুটবলের নিয়মের সামনে স্থানীয় রাজনীতি চলবে না। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ফিফাকে দেখাতে হবে, সেই নীতি শুধু দুর্বল আয়োজকদের জন্য নয়, শক্তিশালী আয়োজকদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
না হলে ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুর আগেই এক অস্বস্তিকর বার্তা থেকে যাবে: মাঠে সবাই সমান হতে পারে, কিন্তু সীমান্তে নয়।
.png)






