ফুটবলারের মৃত্যুতে মানবিক উদ্যোগ রোনালদোর ক্লাবের

মাঠে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন স্প্যানিশ ফুটবলার জেসুস দে মিগুয়েল। মাত্র ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ফুটবল বিশ্ব। শোক প্রকাশ করেছেন লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ অসংখ্য তারকা। তবে শুধু সমবেদনা জানিয়েই থেমে থাকছে না রোনালদোর আংশিক মালিকানাধীন স্প্যানিশ ক্লাব আলমেরিয়া। প্রয়াত ফুটবলারের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে তারা। টেনেরিফের বিপক্ষে নিজেদের ঘরের মাঠের ম্যাচ থেকে টিকিট বিক্রির পুরো অর্থ মিগুয়েলের পরিবারকে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ক্লাবটি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব আলমেরিয়া। ক্লাব সভাপতি মোহাম্মদ আল খেরেইজির উদ্যোগে এই অর্থসহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়াত ফুটবলারের পরিবারের সদস্যদের সেই ম্যাচে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণও জানিয়েছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ৩৪তম রাউন্ডে টেনেরিফের মুখোমুখি হবে আলমেরিয়া। নিজেদের মাঠে অনুষ্ঠিতব্য সেই ম্যাচের টিকিট বিক্রি থেকে পাওয়া পুরো অর্থই দেওয়া হবে মিগুয়েলের পরিবারকে। তবে ঠিক কত অর্থ সংগ্রহ হতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো ধারণা দেয়নি ক্লাবটি। ম্যাচটির নির্দিষ্ট তারিখও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
আলমেরিয়ার সঙ্গে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সম্পর্কও বেশ গভীর। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ক্লাবটির ২৫ শতাংশ মালিকানা কিনেছেন পর্তুগিজ এই মহাতারকা। নিজের প্রতিষ্ঠান সিআর সেভেন স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টসের মাধ্যমে স্প্যানিশ ক্লাবটির অংশীদার হন তিনি। সৌদি বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী এসএমসি গ্রুপের নেতৃত্বাধীন মালিকানা কাঠামোর অংশ হিসেবে এই বিনিয়োগ করেন রোনালদো।
তবে পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার উদ্যোগটি সরাসরি রোনালদোর নয়, ক্লাব সভাপতি আল খেরেইজির। আলমেরিয়া জানিয়েছে, সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এবং কঠিন সময়ে ফুটবল পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর বিশ্বাস থেকেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে ক্লাবটি স্বীকার করেছে, প্রিয়জন হারানোর ক্ষতি কখনো পূরণ করা সম্ভব নয়। আর্থিক কিংবা মানসিক কোনো সহায়তাই এমন বিয়োগান্তক ঘটনার যন্ত্রণা দূর করতে পারে না। তারপরও কঠিন সময়ে একটি পরিবারের পাশে দাঁড়ানো নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করছে তারা।
আলমেরিয়ার ভাষায়, ফুটবল শুধু মাঠের খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সহমর্মিতা, সংহতি এবং কঠিন সময়ে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাই ফুটবল পরিবারকে ঐক্যবদ্ধ রাখে।
শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, মিগুয়েলের পরিবারের সদস্যদের প্রতি বিশেষ আমন্ত্রণও জানিয়েছে আলমেরিয়া। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে টেনেরিফের বিপক্ষে ম্যাচটি মাঠে বসে দেখার সুযোগ করে দিতে চায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ। শোকাহত পরিবারের প্রতি সম্মান ও সংহতি প্রকাশের অংশ হিসেবেই এই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
গত সোমবার (২ নভেম্বর) স্পেনের দ্বিতীয় বিভাগের ম্যাচে এফসি আন্দোরার মুখোমুখি হয়েছিল টেনেরিফে। ম্যাচের যোগ করা সময়ে একটি বলের দখল নিতে গিয়ে আন্দোরার গোলরক্ষক জেসুস ওওনোর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয় মিগুয়েলের। নিজের পেনাল্টি বক্স ছেড়ে বল বিপদমুক্ত করতে এগিয়ে আসা ওওনোর হাঁটুর আঘাত লাগে তার বুকে।
সংঘর্ষের পর মাঠেই হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায় মিগুয়েলের। জরুরি চিকিৎসায় তার হৃদ্স্পন্দন ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলেও জ্ঞান ফেরেনি। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যায় রাখা হয় তাকে। কিন্তু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় ৩০ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের মৃত্যু হয়। আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে টেনেরিফে।
মিগুয়েলের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক প্রকাশ করেন রোনালদোও। প্রয়াত ফুটবলারের একটি ছবি প্রকাশ করে পর্তুগিজ তারকা লিখেছিলেন, ‘একটি মর্মান্তিক ঘটনা। বলার মতো কোনো ভাষা নেই। পরিবারের জন্য অনেক শক্তি কামনা করছি। শান্তিতে ঘুমাও।’
শুধু রোনালদো নন, শোক প্রকাশ করেছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসিও। ইনস্টাগ্রামে মিগুয়েলের একটি ছবি প্রকাশ করে তার পরিবার ও বন্ধুদের প্রতি সমবেদনা জানান বিশ্বকাপজয়ী এই ফুটবলার। শোক প্রকাশ করেছে রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনাসহ ইউরোপের অসংখ্য ক্লাব ও ফুটবল সংস্থা।
এদিকে মিগুয়েলের প্রতি সম্মান জানাতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে টেনেরিফের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী লাস পালমাসও। আগামী রোববার (৮ নভেম্বর) এলদেনসের বিপক্ষে ম্যাচে নিজেদের তৃতীয় জার্সি পরে মাঠে নামবে ক্লাবটি। সাদা ও নীল রঙের সেই জার্সির সঙ্গে টেনেরিফের ঐতিহ্যবাহী জার্সির মিল রয়েছে।
চলতি মৌসুমের শুরুতেই নিজেদের তৃতীয় জার্সি উন্মোচন করেছিল লাস পালমাস। তখন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী টেনেরিফের জার্সির সঙ্গে মিল থাকায় কিছু সমর্থকের সমালোচনার মুখেও পড়েছিল তারা। তবে এবার সেই জার্সিই হয়ে উঠছে প্রয়াত ফুটবলারের প্রতি সম্মান জানানোর মাধ্যম।
লাস পালমাস জানিয়েছে, মিগুয়েলের পরিবারের পাশাপাশি টেনেরিফের খেলোয়াড়, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই এমন সিদ্ধান্ত। ফুটবল মাঠের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়েও মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি, সেই বার্তাই দিতে চায় ক্লাবটি।



