রিয়ালের ১৫ বছরের রেকর্ড ভেঙে ভিয়ারিয়ালকে উড়িয়ে দিল পিএসজি

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোলের পর গোল করে নতুন ইতিহাস গড়ল প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। স্প্যানিশ ক্লাব ভিয়ারিয়ালের মাঠে মাত্র ১৬ মিনিট ২ সেকেন্ডে চার গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের ১৫ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙেছে ফরাসি জায়ান্টরা। শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে লুইস এনরিকের দল। জোড়া গোল করে জয়ের নায়ক হয়েছেন ফাবিয়ান রুইজ। এই জয়ে চলতি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের প্রথম চার ম্যাচেই জয়ের শতভাগ রেকর্ড ধরে রেখেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে স্পেনের এস্তাদিও দে লা সেরামিকায় উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের লিগ পর্বের চতুর্থ ম্যাচে মুখোমুখি হয় ভিয়ারিয়াল ও পিএসজি। ম্যাচের প্রথম ১৭ মিনিটেই চার গোল করে স্বাগতিকদের কার্যত ম্যাচ থেকে ছিটকে দেয় সফরকারীরা। বিরতির পর আরও দুই গোল করে বড় জয় নিশ্চিত করে ফরাসি ক্লাবটি।
চোটের কারণে উসমান দেম্বেলে, মারকুইনিয়োস, নুনো মেন্দেস ও খভিচা কাভারাৎস্খেলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারদের ছাড়াই মাঠে নেমেছিল পিএসজি। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে তাদের অনুপস্থিতি বুঝতে দেননি এনরিকের শিষ্যরা। বরং শুরু থেকেই প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে তীব্র চাপ তৈরি করে একের পর এক গোল আদায় করে নেন তাঁরা।
ম্যাচের নবম মিনিটেই গোল উৎসবের শুরু করেন জোয়াও নেভেস। বাঁ প্রান্ত থেকে নেওয়া কর্নারে উইলিয়ান পাচোর ছোঁয়ায় বল পেয়ে কাছ থেকে জালে পাঠান পর্তুগিজ মিডফিল্ডার। শুরুতেই এগিয়ে যায় পিএসজি।
প্রথম গোলের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই আবারও বিপদে পড়ে ভিয়ারিয়াল। এবার নিজেদের অর্ধে বল হারানোর খেসারত দিতে হয় স্বাগতিকদের। ১২তম মিনিটে মাগনেস আকলিউশের পাস থেকে বক্সের প্রান্তে বল পেয়ে দুর্দান্ত শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন দেজিরে দুয়ে।
এর ঠিক পরের মিনিটেই তৃতীয় গোল পেয়ে যায় সফরকারীরা। নেভেসের নেওয়া শট প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগার গায়ে লেগে ফিরে এলে সেই বল ভলিতে জালে পাঠান সেনি মায়ুলু। মাত্র ১৩ মিনিটেই তিন গোলে পিছিয়ে পড়ে হতভম্ব হয়ে যায় ভিয়ারিয়াল।
তবে পিএসজির আক্রমণ তখনো থামেনি। ১৭তম মিনিটে আকলিউশের আরেকটি পাস থেকে গোল করেন ফাবিয়ান রুইজ। বক্সের ভেতরে তার নিচু হাফ ভলি জালে জড়াতেই স্কোরলাইন হয়ে যায় ৪-০। আর এই গোলেই চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে নতুন রেকর্ড গড়ে পিএসজি।
পরিসংখ্যান সংস্থা অপটার তথ্য অনুযায়ী, ম্যাচ শুরুর মাত্র ১৬ মিনিট ২ সেকেন্ডের মধ্যে চার গোল করেছে ফরাসি ক্লাবটি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে এর আগে কোনো দল এত দ্রুত চার গোল করতে পারেনি।
আগের রেকর্ডটি ছিল রিয়াল মাদ্রিদের দখলে। ২০১১ সালের ২২ নভেম্বর ক্রোয়েশিয়ান ক্লাব দিনামো জাগরেবের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথম ২০ মিনিটের মধ্যে চার গোল করেছিল হোসে মরিনহোর দল। সেই ম্যাচে করিম বেনজেমা, হোসে কালেয়ন, গনসালো হিগুয়াইন ও মেসুত ওজিল গোল করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৬-২ ব্যবধানে জিতেছিল স্প্যানিশ জায়ান্টরা। প্রায় ১৫ বছর পর সেই রেকর্ড নিজেদের করে নিল পিএসজি।
শুরুর এই বিধ্বংসী আক্রমণের পরও প্রথমার্ধে আরও গোলের সুযোগ পেয়েছিল সফরকারীরা। ৩৬তম মিনিটে দুয়ের একটি প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন ভিয়ারিয়ালের গোলরক্ষক পেতের গুলাচি। যোগ করা সময়েও আশরাফ হাকিমির শট রুখে দেন তিনি। ফলে চার গোলে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় পিএসজি।
বিরতির পরও ম্যাচের চিত্র বদলায়নি। ৫০তম মিনিটে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান আরও বাড়ান রুইজ। ভিতিনিয়ার কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সে রেনাতো ভেইগাকে কাটিয়ে দারুণ দক্ষতায় গোলরক্ষকের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে পাঠান স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।
পাঁচ গোল হজমের পরও ম্যাচে ফেরার কার্যকর কোনো পথ খুঁজে পায়নি ভিয়ারিয়াল। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সের্হি কার্দোনার একটি শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরে পাপে গেয়ের একটি প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দেন পিএসজি গোলরক্ষক মাতভেই সাফোনভ। তবে ম্যাচে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা স্বাগতিকরা কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।
অন্যদিকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও আক্রমণের ধার কমায়নি পিএসজি। কয়েকটি পরিবর্তন এনে তরুণ ফুটবলারদেরও মাঠে নামান এনরিকে। সেই সিদ্ধান্তের সুফলও পেয়ে যান ফরাসি কোচ।
শেষ পর্যন্ত ৭৮তম মিনিটে ষষ্ঠ গোলটি করেন ডেভিড বলি। কিছুক্ষণ আগেই বদলি হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন ১৭ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার। জোয়াও নেভেসের পাস থেকে তার নেওয়া শট ভিয়ারিয়ালের ডিফেন্ডার রেনাতো ভেইগার গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেক ম্যাচেই গোল করে রাতটি স্মরণীয় করে রাখেন বলি। ১৭ বছর ২৮৫ দিন বয়সে পিএসজির ইতিহাসে এই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়েছেন তিনি। তার চেয়ে কম বয়সে পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে গোল করেছেন শুধু ওয়ারেন জাইরে-এমেরি।
এই জয়ে আরও কয়েকটি মাইলফলক স্পর্শ করেছে পিএসজি। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে নিজেদের সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ে জয় পেয়েছে ফরাসি ক্লাবটি। পাশাপাশি চলতি মৌসুমে প্রথম চার ম্যাচে তাদের গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০। নিজেদের প্রথম চার ম্যাচের প্রতিটিতেই অন্তত চারটি করে গোল করেছে এনরিকের দল।
চলতি আসরের শুরুতে স্লোভান ব্রাতিস্লাভাকে ৬-১ গোলে হারিয়েছিল পিএসজি। এরপর ম্যানচেস্টার সিটি ও বার্সেলোনার বিপক্ষে সমান ৪-২ গোলের জয় পায় তারা। এবার ভিয়ারিয়ালের জালে ছয় গোল দিয়ে নিজেদের দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক সামর্থ্যের আরেকটি প্রমাণ দিল ইউরোপের বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।



