logo

অলিম্পিক না খেলেও ঋতুপর্ণা করলেন ‘অলিম্পিক গোল’

অলিম্পিক না খেলেও ঋতুপর্ণা করলেন ‘অলিম্পিক গোল’
ঋতুপর্ণা চাকমা। ছবি: সংগৃহীত

অলিম্পিকে খেলেননি ঋতুপর্ণা চাকমা। তবু নেপালের বিপক্ষে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে তার করা গোলটি এখন আলোচনায় ‘অলিম্পিক গোল’ হিসেবে। শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতেই পারে। অলিম্পিকের মঞ্চে নয়, সাফের সেমিফাইনালে করা একটি গোলের নাম কেন অলিম্পিক গোল?

উত্তরটা লুকিয়ে আছে ফুটবলের শত বছরের পুরোনো এক ইতিহাসে। তবে তার আগে ফিরে যেতে হয় গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে, বাংলাদেশ-নেপাল সেমিফাইনালের সেই মুহূর্তে।

ম্যাচের প্রথমার্ধের যোগ করা সময়। বাংলাদেশ তখন ১-০ গোলে পিছিয়ে। শুরু থেকে নেপালের চাপ সামলাতে ব্যস্ত থাকা বাংলাদেশ খুব বেশি পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না। এমন সময় কর্নার পায় লাল-সবুজের মেয়েরা। কর্নার নিতে এগিয়ে যান ঋতুপর্ণা।

এরপর যা হলো, সেটিই ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দেয়। ঋতুপর্ণার বাঁকানো কর্নার সরাসরি জালে জড়িয়ে যায়। বলটি কোনো সতীর্থ, প্রতিপক্ষ বা গোলকিপারকে স্পর্শ করেনি। কর্নার থেকেই সরাসরি গোল। স্কোরলাইন ১-১। বিরতির আগে সেই গোল বাংলাদেশকে শুধু ম্যাচে ফেরায়নি, মানসিকভাবেও নতুন করে জাগিয়ে তোলে।

ফুটবলের ভাষায় কর্নার কিক থেকে বল সরাসরি জালে গেলে তাকে বলা হয় অলিম্পিক গোল। শর্ত একটাই—বলটি পথে কোনো খেলোয়াড়কে স্পর্শ করতে পারবে না। কর্নার থেকে সরাসরি গোল হলেই সেটি অলিম্পিক গোল, স্প্যানিশ ভাষায় যার পরিচিত নাম গোল অলিম্পিকো।

এই নামের পেছনে আছে ১৯২৪ সালের গল্প। সেই বছর প্যারিস অলিম্পিকে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে। অলিম্পিক শেষ হওয়ার পর আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ের মধ্যে একটি প্রীতি ম্যাচ হয়। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার সেসারেও ওনজারি কর্নার কিক থেকে সরাসরি গোল করেন। গোলটি হয়েছিল তখনকার অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ের বিপক্ষে। সেখান থেকেই স্প্যানিশ ভাষায় গোলটির নাম হয়ে যায় অলিম্পিকো। পরবর্তীতে ফুটবল দুনিয়ায় কর্নার থেকে সরাসরি গোলের নাম হয়ে যায় অলিম্পিক গোল।

এই গোলের বৈধতা নিয়েও শুরুর দিকে আলোচনা ছিল। কারণ এক সময় কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। পরে ফুটবলের নিয়ম নির্ধারণকারী সংস্থা আইএফএবি স্পষ্ট করে দেয়, কর্নার কিক থেকে সরাসরি গোল বৈধ। তাই ঋতুপর্ণার গোলও নিয়মের দিক থেকে নিখুঁত একটি গোল।

তবে নিয়মে বৈধ হলেও মাঠে কাজটি সহজ নয়। কর্নারের জায়গা গোলপোস্টের পাশে, প্রায় শূন্য কোণ থেকে। সেখান থেকে সরাসরি বল জালে পাঠাতে হলে নিখুঁত কার্ভ, সঠিক গতি এবং গোলকিপারের অবস্থান বোঝার ক্ষমতা দরকার। গোলমুখে সাধারণত অনেক খেলোয়াড় থাকে। ডিফেন্ডার, অ্যাটাকার, গোলকিপার—সবাই বলের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই কর্নার থেকে সরাসরি গোল ফুটবলে বিরল দৃশ্য।

ঋতুপর্ণার গোলটিকে বিশেষ করে তুলেছে আরেকটি বিষয় ম্যাচের প্রেক্ষাপট। এটি কোনো সহজ সময়ে করা গোল ছিল না। বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল, প্রথমার্ধ প্রায় শেষ, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তখনও পুরোপুরি বাংলাদেশের হাতে আসেনি। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি কর্নার থেকে সরাসরি গোল করে দলকে ফিরিয়ে আনা বড় মানসিক শক্তিরও প্রমাণ।

এই গোলের পর বাংলাদেশকে আরও প্রাণবন্ত দেখা যায়। দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচে ওঠানামা থাকলেও শেষ পর্যন্ত নেপালের আত্মঘাতী গোলে ২-১ ব্যবধানে জয় পায় বাংলাদেশ। টানা তৃতীয়বারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ওঠে লাল-সবুজের মেয়েরা। তবে ম্যাচের গল্পে আলাদা জায়গা করে নেয় ঋতুপর্ণার সেই বাঁকানো কর্নার।