২৫ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে ব্যালন ডি’অর জিতলেন কেইন
-704934-720x405.webp)
দীর্ঘ ২৫ বছরের অপেক্ষার অবসান। মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতলেন হ্যারি কেইন। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে অবিশ্বাস্য ৭৩ গোল করা বায়ার্ন মিউনিখের এই স্ট্রাইকার অবশেষে পেলেন ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। বিশ্বকাপজয়ী লামিনে ইয়ামাল ও ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে প্রথমবারের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পেলেন ৩৩ বছর বয়সী ইংল্যান্ড অধিনায়ক।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরে পুরুষ বিভাগের সেরা ফুটবলার হিসেবে কেইনের নাম ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোরে ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওর কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন তিনি। এর আগে ২০০১ সালে ইংল্যান্ডের সর্বশেষ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন লিভারপুলের মাইকেল ওয়েন।
এবারের পুরস্কারের লড়াই ছিল বেশ জমজমাট। কেইনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায় ছিলেন বার্সেলোনা ও স্পেনের তরুণ তারকা ইয়ামাল এবং রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি ফরোয়ার্ড এমবাপ্পে। গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয়ের পাশাপাশি স্পেনকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন ইয়ামাল। অন্যদিকে লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত গোলের রেকর্ড গড়ে আলোচনায় ছিলেন এমবাপ্পে। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বসেরার স্বীকৃতি উঠেছে কেইনের হাতেই।
ইংল্যান্ড অধিনায়কের এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা গত মৌসুমের অসাধারণ গোল করার ধারাবাহিকতা। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫১ ম্যাচে ৬১ গোল করেছেন কেইন। ইংল্যান্ডের জার্সিতে করেছেন আরও ১২ গোল। সব মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তার গোলসংখ্যা ৭৩। ২০১১-১২ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে লিওনেল মেসির ৮২ গোলের পর আর কোনো ফুটবলার এক মৌসুমে এত গোল করতে পারেননি।
বুন্দেসলিগায় ৩১ ম্যাচে ৩৬ গোল করে টানা তৃতীয়বারের মতো সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন কেইন। চ্যাম্পিয়নস লিগে করেছেন ১৪ গোল। জার্মান কাপেও ছিলেন দুর্দান্ত, ছয় ম্যাচে করেছেন ১০ গোল। জার্মান সুপার কাপেও একবার লক্ষ্যভেদ করেছেন তিনি। তার এমন নৈপুণ্যে বায়ার্ন জিতেছে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ। পাশাপাশি ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো গোল্ডেন শুও জিতেছেন কেইন।
জাতীয় দলের হয়েও স্মরণীয় সময় কাটিয়েছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। ২০২৬ বিশ্বকাপে ছয় গোল করে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবারের তৃতীয় স্থানই ছিল প্রতিযোগিতায় ইংল্যান্ডের সেরা অর্জন।
কেইনের ব্যালন ডি’অর জয় ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওয়েনের পর পঞ্চম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই পুরস্কার জিতলেন তিনি। অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৪৫ বছর পর কোনো ফুটবলার ব্যালন ডি’অর পেলেন। সবশেষ ১৯৮১ সালে জার্মান ক্লাবটির হয়ে এই পুরস্কার জিতেছিলেন কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে।
পুরস্কার গ্রহণের পর উচ্ছ্বাস লুকাতে পারেননি কেইন। বক্তব্যের শুরুতেই আয়োজক, ভোট দেওয়া সাংবাদিক এবং সতীর্থদের ধন্যবাদ জানান তিনি। বিশেষ করে বায়ার্নে তার সাফল্যের পেছনে সতীর্থদের অবদানের কথা তুলে ধরেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তার মতে, এত গোল করার পেছনে পুরো দলের অবদান রয়েছে। অনুশীলনে দাইয়োত উপামেকানোর মতো ডিফেন্ডারদের বিপক্ষে খেলা তাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো হতে সাহায্য করেছে বলেও জানান।
বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির কথাও আলাদাভাবে উল্লেখ করেন কেইন। অসুস্থতার কারণে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি বেলজিয়ান এই কোচ। তার দ্রুত সুস্থতা কামনা করে কেইন আশা প্রকাশ করেন, এই অর্জন কোচকে কিছুটা আনন্দ দেবে।
ইংল্যান্ড জাতীয় দলের কোচ টমাস টুখেলকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন কেইন। বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত শিরোপা জিততে না পারলেও পুরো দলের প্রচেষ্টা নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, জাতীয় দলের হয়ে অধিনায়কত্ব করা যেমন সম্মানের, তেমনি বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাও বিশেষ অর্জন।
পুরোনো ক্লাব টটেনহাম হটস্পারকেও ভুলে যাননি কেইন। মাত্র ১১ বছর বয়সে ক্লাবটির একাডেমিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ সময় সেখানে কাটিয়ে হয়েছেন ক্লাবের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ব্যালন ডি’অর জয়ের মঞ্চে টটেনহামের কোচ, কর্মকর্তা ও সমর্থকদের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক।
নিজের ক্যারিয়ারে অবদান রাখা সাবেক কোচদের নামও উল্লেখ করেন কেইন। সেই তালিকায় ছিলেন মরিসিও পচেত্তিনো, হোসে মরিনহো, আন্তোনিও কন্তে ও রয় হজসনের মতো পরিচিত মুখ। তার বিশ্বাস, ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে এসব কোচের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।
বক্তব্যের শেষ দিকে পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান কেইন। বিশেষ করে স্ত্রী কেট, বাবা-মা ও ভাই চার্লির অবদানের কথা তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, মাঠের বাইরের মানুষের সমর্থন এবং পরিবারের ত্যাগ ছাড়া এত দূর আসা সম্ভব হতো না। ছোটবেলা থেকে কঠোর পরিশ্রম, উন্নতি ও নতুন কিছু শেখার যে শিক্ষা পেয়েছেন, সেটিই তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
টটেনহামে দীর্ঘ সময় কাটিয়েও কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেননি কেইন। সেই আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্যেই ২০২৩ সালে যোগ দেন বায়ার্ন মিউনিখে। জার্মান ক্লাবটিতে গিয়ে শুধু দলীয় শিরোপাই নয়, ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও ক্যারিয়ারের সেরা সময় কাটাচ্ছেন তিনি। এবার ব্যালন ডি’অর জিতে সেই সাফল্যে যোগ করলেন নতুন মাত্রা।
এবারের অনুষ্ঠানে ব্যালন ডি’অরের পাশাপাশি বছরের সেরা স্ট্রাইকারের গার্ড মুলার ট্রফিও জিতেছেন কেইন। অন্যদিকে পুরুষদের সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার পেয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। টানা তৃতীয়বার এই স্বীকৃতি জিতেছেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ উইঙ্গার।
নারী বিভাগের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেলিয়াস। তৃতীয়বারের মতো এই পুরস্কার জিতে আইতানা বনমাতির রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে পুরুষদের সেরা ক্লাবের পুরস্কার পেয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)।
ব্যালন ডি’অরের প্রথম আসরের বিজয়ী স্ট্যানলি ম্যাথুসের প্রতি সম্মান জানিয়ে এবারই প্রথম লন্ডনে আয়োজন করা হয়েছে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ৭০ বছর আগে যে ইংলিশ ফুটবলারের হাত ধরে এই পুরস্কারের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই দেশেই এবার ২৫ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে বিশ্বসেরার মুকুট পরলেন কেইন।



