রিয়েলিটি শোতে একাধিক প্রতিযোগীকে ধর্ষণের অভিযোগ

যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকেতে (এমএএফএস ইউকে) অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের ওপর যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্যানোরামার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। এরপর থেকে ব্রিটেনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাজনৈতিক মহলে এক ধরনের তৎপরতা দেখা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ ওই শোতে অংশ নেওয়া অন্য ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তার জন্য এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবিসি প্যানোরামার অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই রিয়েলিটি টিভি শোর চিত্রগ্রহণের সময় দুজন নারীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে তৃতীয় একজন নারী বলেছেন, তিনি তার অভিনয়ের সঙ্গী স্বামীর সম্মতিহীন যৌন আচরণের শিকার হয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর সরকারি মুখপাত্র এর আগে এই দাবিগুলোকে ‘অত্যন্ত গুরুতর বলে অভিহিত করেছেন। ঘটনার তদন্তের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
মেট্রোপলিটন পুলিশের একজন মুখপাত্র জানান, এই বিষয়ে তারা এখনও কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ পাননি। মেট্রোপলিটন পুলিশ যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এমন যে কাউকে যোগাযোগ বা অভিযোগ করার আহ্বান জানিয়েছে। পুলিশও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে।
প্যানোরামা অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর থেকে চ্যানেল৪ নিজেদের সফল শো ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফকম বলেছে, অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের কল্যাণের বিষয়ে সম্প্রচারকদের যত্নবান হওয়া উচিত।
ছুটিসংক্রান্ত কোম্পানি টুই বিবিসি নিউজকে জানিয়েছে, তারা এই শো’র স্পনসরশিপ বা পৃষ্ঠপোষকতা সাময়িকভাবে স্থগিত করছে।
চ্যানেল৪-এর পদক্ষেপ ও সমালোচনা
চ্যালেন৪ এখন তাদের স্ট্রিমিং এবং লিনিয়ার সার্ভিস ও সেইসঙ্গে এমএএফএস ইউকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চ্যানেলগুলো থেকে এই অনুষ্ঠানের সব পর্ব সরিয়ে নিয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) বিবিসি নিউজ এই খবরটি প্রকাশ করার পর দেওয়া এক বিবৃতিতে চ্যানেল৪ জানিয়েছে, গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার পর তারা গত মাসে এই শোর অংশগ্রহণকারীদের কল্যাণের বিষয়ে একটি বাহ্যিক পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছিল।
এই শো’র ইউকে সংস্করণ তৈরি করা একটি স্বাধীন প্রোডাকশন কোম্পানি সিপিএলের আইনজীবীরা বলেছেন, তাদের কল্যাণ ব্যবস্থা ছিল ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ বা স্বর্ণমান এবং শিল্প-নেতৃত্বস্থানীয়। তারা সব ক্ষেত্রে যথাযথভাবে কাজ করেছেন।
শোতে অংশ নেওয়ার পর ধর্ষণের শিকার হওয়া অংশগ্রহণকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন চ্যানেল৪-এর প্রধান নির্বাহী প্রিয়া ডোগরা। তিনি বলেন, অভিযুক্তরা এই অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। উদ্বেগের পাশাপাশি সম্প্রচারকারী এই প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে যথাযথ ও সংবেদনশীল কাজ করছে বলে জানান তিনি।
তবে এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারীদের কাছে ক্ষমা চাইবেন কি না জানতে চাইলে তিনি তা করতে অস্বীকৃতি জানান।
মঙ্গলবার (১৯ মে) এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং গুরুতর অভিযোগ বলে বর্ণনা করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র।
মঙ্গলবার রাতে প্যানোরামা অনুসন্ধানটি প্রচার হওয়ার পর থেকে বিবিসির সঙ্গে সরাসরি ওই শো’র সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন সাবেক অভিনয়শিল্পী যোগাযোগ করে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ ঘটনা বেশ ছাড়া ফেলেছে। অভিনয়শিল্পীরা মুখ খোলা নারীদের প্রতি তাদের সমর্থন প্রকাশ করছেন এবং ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে অনেকে তাদের শোতে অভিজ্ঞতা ইতিবাচক ছিল বলেও জানান।
এর আগে নিরাপত্তামন্ত্রী ড্যান জারভিস বলেছেন, তিনি বিবিসি অনুসন্ধানে উত্থাপিত অভিযোগগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন। চ্যানেল৪ ও সিপিএলকে এগুলো পুরোপুরি তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চ্যানেল৪-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা অ্যালেক্স মাহন মঙ্গলবার কালচার, মিডিয়া অ্যান্ড স্পোর্ট কমিটির একটি পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে এমপিদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন।
চ্যানেল৪ ঘোষিত পর্যালোচনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমি মনে করি এ ঘটনায় একটি তদন্ত হওয়া দরকার। তারপর আমাদের দেখা উচিত তদন্তে কী ফলাফল আসে এবং সেই ফলাফলের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
এ বিষয়ে গঠিত কমিটির চেয়ারপারসন ক্যারোলিন ডিনেনেজ বিবিসিকে জানান, একটি শো হিসেবে এমএএফএস ইউকেতে ঝুঁকির কারণ ছিল। এটি এমন একটি টিভি শো যেখানে প্রত্যাশা থাকে যে, সবেমাত্র পরিচিত হওয়া মানুষগুলোকে একে অপরের সঙ্গে সত্যিই বেশ ঘনিষ্ঠ হতে হবে।
ম্যারিড অ্যাট ফার্স্ট সাইট ইউকে (এমএএফএস) কী
অনেকে বলেন, এমএএফএস অনুষ্ঠানটি একটি ‘সাহসী সামাজিক পরীক্ষা’। এ অনুষ্ঠানে একজন অবিবাহিত ব্যক্তি সম্পূর্ণ অপরিচিত আরেক ব্যক্তিকে ‘বিয়ে’ করতে সম্মত হন। এরপর সাজানো বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো তারা একে অপরকে দেখেন।
সাজানো এই বিয়ে আইনগতভাবে বৈধ নয়, তবে দম্পতিরা মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছেন, একসঙ্গে বসবাস শুরু করছেন এবং তাদের সম্পর্ক সামলানোর চেষ্টা করছেন এমন সব দৃশ্য দেখতে পান দর্শকেরা। এ সবকিছুই হয় ক্যামেরার সামনে। তাদের প্রায় প্রতিদিনের জীবনযাপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ
বিবিসির প্রতিবেদনে তিনজন নারী প্রতিযোগীর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজন অভিযোগ করেছেন, শোয়ের চিত্রগ্রহণের (শুটিং) সময় তাদেরকে ধর্ষণ করা হয়েছে।
তৃতীয় প্রতিযোগী শোনা ম্যান্ডারসন অভিযোগ করেছেন, তার অনস্ক্রিন স্বামী ব্র্যাডলি স্কেলি তার অনুমতি না নিয়েই তার সঙ্গে জোরপূর্বক অনিচ্ছাকৃত যৌন আচরণ করেছেন। এমনকি একজন নারীকে অ্যাসিড হামলার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
হেনস্তার শিকার হওয়া অভিযোগকারী তিন নারীই বলছেন, চ্যানেল৪ তাদের সুরক্ষায় যথেষ্ট কাজ করেনি। সম্প্রচারের আগেও কর্তৃপক্ষ কিছু অভিযোগ সম্পর্কে জানত। গত সোমবার নিজেদের লাইভ স্ট্রিমিংয়ে চলা বেশকিছু পর্ব সরিয়ে নিয়েছে।
এর আগে প্যানোরামাকে চ্যানেল৪ বলেছিল, সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অসমর্থিত এবং বিতর্কিত।


