ছয় মাসে ১০ মিলিয়ন ডলারের বিলাসবহুল বাড়ি বিক্রি দুবাইয়ে

চলতি বছরেরর শুরুতে দুবাইয়ের আবাসন বাজারে বড় ধরনের চমক দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক আবাসন গবেষণা সংস্থা নাইট ফ্রাংকের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম ছয় মাসে দুবাইয়ে ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের রেকর্ড ২৯৬টি বিলাসবহুল বাড়ি বিক্রি হয়েছে। এ হিসাব গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজ জানিয়েছে, ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য দুটি সংকেত নিয়ে দুবাইয়ের আবাসন বাজার এখন বছরের দ্বিতীয় বা শেষার্ধে প্রবেশ করছে। এখানে বিলাসবহুল বাড়ি এবং ভাড়া দেওয়ার বাজার এখনও নিত্যনতুন রেকর্ড তৈরি করছে। তবে সামগ্রিক বা সাধারণ আবাসিক বাজার গত বছরের তুলনায় কিছুটা ধীর দখা গেছে।
নাইট ফ্রাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে হওয়া এই কোটি ডলারের চুক্তির সংখ্যা ২০২৫ সালের প্রথমার্ধের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি। এমনকি এটি ২০২৪ সালের প্রথমার্ধের চেয়ে ৪৯ শতাংশ বেশি।
এই হিসাব প্রমাণ করে যে, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিমাণ সম্পদ এখনও দুবাইয়ের প্রধান আবাসিক বাজারে প্রবাহিত হচ্ছে।
নাইট ফ্রাংক জানিয়েছে, বছরের প্রথম প্রান্তিকে ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের ১৬৫টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় প্রান্তিকে বিক্রি হয়েছে আরও ১৩১টি বাড়ি। এছাড়া এই বছরের প্রথমার্ধের তালিকায় আড়াই কোটি (২৫ মিলিয়ন) ডলারের বেশি মূল্যের রেকর্ড ২৬টি অতি-বিলাসবহুল চুক্তিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সুপার-প্রাইম বাড়িগুলোর চাহিদা বেশি
চলতি বছরের প্রথমার্ধে দুবাই হিলস এস্টেট ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী পারফর্ম করা বিলাসবহুল এলাকা। এই এলাকায় ১০ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যে ৫১টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে। ৫০টি চুক্তি নিয়ে এর পরে অবস্থান করছে পাম জুমেইরাহ। অন্যদিকে পাম জেবেল আলী এলাকাটি ২০২৮ সালে নির্ধারিত সমাপ্তির আগে ইতোমধ্যে ৪০টি বিলাসবহুল লেনদেন রেকর্ড করেছে।
প্রথমার্ধের সবচেয়ে ব্যয়বহুল লেনদেনটি ছিল জুমেইরাহ সেকেন্ডের আমান রেসিডেন্সেসের একটি অ্যাপার্টমেন্ট। এইচঅ্যান্ডএইচ ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের তৈরি এই ছয় বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্টটি ১১৪ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার বা ৪২২ মিলিয়ন দিরহামে বিক্রি হয়েছে।
নাইট ফ্রাংকের মেনা অঞ্চলের পার্টনার এবং গবেষণা প্রধান ফয়সাল দুররানি বলেন, দুবাইয়ের বিলাসবহুল বাজার গত পাঁচ বছর ধরে ক্রমাগত রেকর্ড ভেঙেছে। সাম্প্রতিক রেকর্ড করা বেশিরভাগ চুক্তি আঞ্চলিক সংঘাতের আগে সম্পন্ন হয়। তবে সাধারণ চার থেকে ছয় সপ্তাহের প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে এগুলো পরে নিবন্ধিত হয়েছে।
তিনি জানান, বাজার স্থবির হয়ে যায়নি। কারণ দুবাইয়ের মূল শক্তিগুলো এখনও বজায় রয়েছে। এর মধ্যে উন্নত অবকাঠামো, বৈশ্বিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ, জীবনযাত্রা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা অন্যতম।
সামগ্রিক বাজার তুলনামূলক ধীর
দুবাইয়ের সামগ্রিক আবাসিক বাজার এখনও বেশ ব্যস্ত। তবে এর গতি গত বছরের সর্বোচ্চ অবস্থানের চেয়ে কিছুটা কমেছে। আবাসন বিশ্লেষক সংস্থা ক্যাভেন্ডিশ ম্যাক্সওয়েল জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে প্রায় ৭৯ হাজার ২০০টি লেনদেনের মাধ্যমে আবাসিক বিক্রি ২২১ দশমিক ৩ বিলিয়ন দিরহামে পৌঁছেছে। এটি সামগ্রিক প্রথমার্ধের আবাসিক বিক্রির তুলনায় গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ নিচে। এছাড়া মোট বিক্রির মূল্য গত বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম।
তবে মে মাসের ধীরগতির পর জুন মাসে বাজার আবার ভালোই ঘুরে দাঁড়ায়। ক্যাভেন্ডিশ ম্যাক্সওয়েল জানিয়েছে, মে মাসে ২২ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ৯ হাজার ৫০০টি ক্রয়ের তুলনা করা হলে, জুন মাসে ২৫ দশমিক ১৭ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের প্রায় ১২ হাজার ৩১৫টি আবাসিক লেনদেন রেকর্ড করা হয়েছে।
সংস্থার আবাসিক মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক এবং প্রধান রোনান আর্থারের মতে, মে মাসে ঈদুল ফিতরের ছুটির কারণে বাজার কিছুটা শান্ত ছিল। এরপর জুনে এই পুনরুদ্ধার আসে এবং লেনদেন মাস ভিত্তিক প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। এই বৃদ্ধিতে কিছুটা মে মাস থেকে স্থগিত হওয়া চুক্তিগুলোর প্রভাব ছিল। তবে আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেশ স্থিতিশীল ছিল।
জুনের সামগ্রিক কার্যকলাপে নির্মাণাধীন ভবন বা ফ্ল্যাট বিক্রি পুরোপুরি আধিপত্য বজায় রেখেছে। সেখানে ৯ হাজার ৪৪২টি লেনদেন একাই বাজারের ৭৬ শতাংশ দখল করেছে। নির্মাণাধীন ভবন বিক্রির মূল্য মে মাসের ১৫ দশমিক ২ বিলিয়ন দিরহাম থেকে বেড়ে জুনে ১৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন দিরহামে পৌঁছেছে।
জুন মাসে সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড
ডিএক্সবিইন্টারঅ্যাক্ট-এর ওপেন ডেটার ওপর ভিত্তি করে ফ্যাম প্রোপার্টিজের একটি পৃথক বাজার বিশ্লেষণে জুনের আরও শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখা গেছে। এই তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক বাজারে জুন মাসে ৩৩ দশমিক ২ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ১৩ হাজার ৯৩৩টি বিক্রয় লেনদেন হয়েছে। এটি লেনদেনের পরিমাণের ক্ষেত্রে মে মাসের চেয়ে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংম বৃদ্ধি এবং মূল্যের ক্ষেত্রে ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধির প্রতিনিধিত্ব করে।
ফলে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিক ১১০ দশমকি ২ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ৩৮ হাজার ১৫৭টি চুক্তির মাধ্যমে শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বছরের প্রথমার্ধে সব মিলিয়ে ২৮৬ দশমিক ২ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ৮৬ হাজার ৭৭টি বিক্রয় লেনদেন রেকর্ড করা হয়েছে।
জুন মাসে নতুন বা পুনঃবিক্রির চেয়ে বেশ এগিয়ে ছিল। এ সময় ২১ দশমিক ৬ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ১০ হাজার ৩৯৮টি পুনঃবিক্রি লেনদেন হয়েছে। তার তুলনায় পুনঃবিক্রি লেনদেন ছিল ১১ দশমকি ৬ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ৩ হাজার ৫৩৫টি। জুনে ভিলা বিক্রি মাস ভিত্তিক ৪৬ দশকি ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ১ হাজার ৪৭৪টি লেনদেনে পৌঁছেছে। অন্যদিকে অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি ৩২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ১৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ১১ হাজার ৬০৫টি চুক্তিতে উঠেছে।
বাণিজ্যিক সম্পত্তির বিক্রিও এই সময়ে বেড়েছে। অফিস এবং দোকানগুলোর ২ দশমকি ৩ বিলিয়ন দিরহাম মূল্যের ৪৭৮টি চুক্তি রেকর্ড করা হয়েছে। ফ্যাম প্রোপার্টিজের সিইও ফিরাস আল মুসাদ্দি বলেন, ক্রেতা এবং ভাড়াটিয়ারা ভাড়া, বিক্রি এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি খাতে ক্রমবর্ধমান আস্থা দেখাচ্ছেন।




