চব্বিশের ক্ষত না শুকাতেই ফেনীতে ফের বন্যা আতঙ্ক

মিজানুর রহমান, ফেনী
চব্বিশের ক্ষত না শুকাতেই ফেনীতে ফের বন্যা আতঙ্ক
চব্বিশের বন্যায় ভেঙে যায় ফেনীর বেশির ভাগ বাঁধ ও সড়ক। ছবি: সংগৃহীত

ফেনীর মানুষকে এখনও তাড়া করে ফিরছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের বন্যার ভয়াবহ স্মৃতি। সেই দুর্যোগের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকায়নি; ঘরবাড়ি, ফসলি জমি আর অবকাঠামোর ক্ষতি কাটিয়ে যখন সাধারণ মানুষ একটু একটু করে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ফের বন্যা আতঙ্ক ভর করেছে।

টানা ভারী বর্ষণ আর ভারতের ত্রিপুরা থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী মানুষের মনে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর মুহুরী নদীর ফুঁসে ওঠা পানি দেখে ফেনীর লাখো মানুষের এখন একটাই প্রার্থনা—২০২৪ সালের সেই দুঃস্বপ্নের পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে।

গত রোববার (৫ জুলাই) বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে, ৫ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া দেশের পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বান্দরবান, কক্সবাজার, ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ি জেলার নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এ সতর্কসংকেত পাওয়ার পর আবারও বন্যা আতঙ্কে রয়েছে ফেনীবাসী।

এর আগে গত ২০২৪ সালের আগস্টে ফেনীর ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী বন্যায় জেলার ছয়টি উপজেলায় প্রায় ১৮ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিল। প্রাণ হারিয়েছিলেন অন্তত ২৯ জন। বিদ্যুৎহীন, নেটওয়ার্কহীন অবস্থায় লাখ লাখ মানুষ যেভাবে জীবনযুদ্ধ চালিয়েছিল, সেই ট্রমা এখনও স্থানীয়দের মন থেকে মুছে যায়নি। বিশেষ করে ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার মানুষ নদীর সামান্য পানি বাড়লেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

পরশুরামের সাতকুচিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, ‘গতবারের বন্যায় ঘরবাড়ি সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। ধার-দেনা করে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু কোনোমতে ঠিক করেছি। দুই দিন ধরে যেভাবে মেঘ ডাকছে, আর বৃষ্টি হচ্ছে—বুকটা কাঁপছে। আবার যদি পানি ঢোকে, তবে আমাদের আর বেঁচে থাকার উপায় থাকবে না।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বন্যায় মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীরক্ষা বাঁধের যেসব জায়গায় ভাঙন ধরেছিল, তার অনেকগুলোই এখনও স্থায়ী ও টেকসইভাবে সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। সাময়িকভাবে জোড়াতালি দেওয়া বাঁধগুলো এবারের পাহাড়ি ঢলের চাপ কতটা সইতে পারবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েছে। বাঁধ ভেঙে আবারও লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার আশঙ্কায় নদীপাড়ের মানুষ এখন নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন।

ফেনীবাসীর দাবি, প্রতি বছর বর্ষা এলেই ভারতের উজান থেকে আসা পানির ঢলে তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে নদীগুলোর ড্রেজিং (খনন) এবং সীমান্ত সংলগ্ন নদীগুলোতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা জরুরি।

বিগত বন্যায় ঘর হারানো ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার বাসিন্দা সাংবাদিক সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ‘আমি বিগত বন্যায় সবর্স্ব হারিয়েছি। এখন যদি আবার বন্যা হয় তবে শেষ হয়ে যাব।’

এদিকে নতুন করে বন্যার আশঙ্কার মুখে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে জানা গেছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা, শুকনা খাবার মজুত করা এবং জরুরি উদ্ধারকাজের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাহাড়ি ঢল ও পানি বৃদ্ধির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুজিবুর রহমান বলেন, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় ফেনীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৬১ মিলিমিটার। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে বৃষ্টিপাত আরও বাড়বে। এ ক্ষেত্রে যদি অতিবৃষ্টিপাত বা পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবেশ করে, হয়ত নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, ফেনীসহ পাঁচ জেলায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের একটি পূর্বাভাস রয়েছে। জেলায় বৃষ্টিপাত হচ্ছে। যদি অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢল নামে তবে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আমরা সতর্ক রয়েছি। যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি।

বিষয় :ফেনী