আলজাজিরার বিশ্লেষণ/ইসরায়েলে ভোটগ্রহণ হয় কীভাবে, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা, লেবানন ও ইরানের ওপর যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পার্লামেন্ট (নেসেট) নির্বাচন। আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ২৬তম নেসেট নির্বাচনের সব প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন। ভোটদানের অপেক্ষায় ইসরায়েলি নাগরিকরা।
দীর্ঘ ১৯ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অথচ তিনি দুর্নীতি ও জননিরাপত্তায় গাফিলতির অভিযোগে ইতোমধ্যে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন।
ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের এই প্রধানমন্ত্রীর দল লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন কট্টর-ডানপন্থি জোট ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে রয়েছে। ১২০ আসনের ইসরায়েলের নেসেটে (পার্লামেন্ট) কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পথে আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ৬১টি আসন (ম্যাজিক ফিগার) পাওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সি প্রায় ৭৩ লাখ মানুষ এ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার সময়ও যারা লাইনে থাকবেন, তারা ভোট দিতে পারবেন। নির্বাচনের দিন দেশটিতে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে যেসব দল মোট ভোটের অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ পাবে, তারাই সংসদে আসন পাওয়ার যোগ্য হবে। নেসেটের মেয়াদ চার বছর। তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদসীমা নেই।
ভোটদানের পদ্ধতি
ইসরায়েলিরা সরাসরি কোনো প্রার্থীকে নয়, বরং একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। দেশটির ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো দল এককভাবে এত আসন পায়নি।
নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেই ক্ষমতায় যাওয়া নিশ্চিত হয় না। নির্বাচনের পর দলগুলোকে ৬১ আসনের জোট গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়। প্রয়োজনে এই সময় সর্বোচ্চ ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে। নির্ধারিত সময়ে কোনো পক্ষ সরকার গঠন করতে না পারলে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় নির্বাচনে প্রতিটি দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে সংসদে আসন বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ, কোনো দল ৩০ শতাংশ ভোট পেলে সাধারণত প্রায় ৩০ শতাংশ আসন পায়। যেসব দল ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট পেতে ব্যর্থ হয়, তাদের ভোট আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে গণনা করা হয় না। এ কারণেই নির্বাচনের আগে ছোট দলগুলো প্রায়ই একীভূত হয়ে জোট গঠন করে।
কারা ভোট দিতে পারবেন, কারা পারবেন না
নেসেট নির্বাচনে প্রায় ৭৩ লাখ ইসরায়েলি নাগরিক ভোট দিতে পারবেন। তবে ইসরায়েলি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বসবাসকারী সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভোটাধিকার নেই।
গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী প্রায় ৩০ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনি ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। অথচ তাদের সীমান্ত, চলাচল ও আইনি অবস্থার ওপর ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্তের প্রভাব রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রায় ১২ লাখ ইহুদি ও ফিলিস্তিনি নাগরিক ভোট দিতে পারেন। একইভাবে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে বসবাসকারী সাড়ে সাত লাখের বেশি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীও ভোট দিতে পারবেন। তারা এমন একটি পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন, যে সংসদ তাদের বসবাসের ভূখণ্ডের ওপর আইন প্রণয়ন করে।
অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের অধিকাংশ ফিলিস্তিনির ইসরায়েলি নাগরিকত্ব নেই। তাদের রয়েছে বসবাসের অনুমতিপত্র। তারা জেরুজালেমের নগর পরিষদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেও নেসেট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না।
এর ফলে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ভোটাধিকার নিয়ে বৈষম্যের চিত্র দেখা যায়। সেখানে একজন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ভোট দিতে পারেন, অথচ একই সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কাছাকাছি বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পরিবারটি তা পারে না।

বিদেশে বসবাসকারী অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিকও ভোট দিতে পারেন না। কারণ, দেশটিতে সাধারণ অনুপস্থিত ভোটের ব্যবস্থা নেই। ভোটারদের নির্বাচনের দিন সশরীরে ইসরায়েলে উপস্থিত থাকতে হয়। তবে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা ব্যতিক্রম। তারা ২০ অক্টোবর ইসরায়েলি দূতাবাসে ভোট দেন।
নির্বাচনের প্রধান ইস্যু
এবারের নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা ব্যর্থতা, সামরিক বাহিনীতে অতি-গোঁড়া ইহুদিদের অংশগ্রহণ, বিচার বিভাগীয় সংস্কার, যুদ্ধ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়।
৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতা: ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে চালানো হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং প্রায় ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়। ঘটনার তিন বছর পরও সরকার এ হামলার তদন্তে রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠন করেনি। হামলার পর গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হয়। এতে অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং অবরুদ্ধ উপত্যকার বড় অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
অতি-গোঁড়া ইহুদিদের সামরিক বাহিনীতে যোগদানের অব্যাহতি: এ অব্যাহতির সমর্থকেরা মনে করেন, এর মাধ্যমে পূর্ণকালীন তোরাহ অধ্যয়নের সুযোগ সুরক্ষিত থাকে। তবে সমালোচকদের যুক্তি, এতে অন্য নাগরিকদের ওপর সামরিক দায়িত্বের অসম বোঝা চাপানো হয়।
বিচার বিভাগীয় সংস্কার: সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা সীমিত করার জন্য নেতানিয়াহুর সরকারের উদ্যোগ গাজা যুদ্ধের আগে ইসরায়েলে ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল। বিষয়টি এখনও দেশটির রাজনীতিতে গভীর বিভাজনের কারণ। সমালোচকেরা এসব উদ্যোগকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করেন। অন্যদিকে সমর্থকদের দাবি, আদালত তার ক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
যুদ্ধ ও নিরাপত্তা: ইসরায়েলিরা স্থিতিশীলতা চান। তবে গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও লেবাননের বিষয়ে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। নেতানিয়াহু ‘পূর্ণাঙ্গ বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি দিলেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লাহ এখনও সক্রিয় রয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়: প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল ব্যয়ের কারণে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কম মজুরির চাপ বেড়েছে। ২০২৩ সালের পর থেকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণ হয়েছে, যা সরকারি অর্থায়নের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিদায়ী সরকার ও সংসদের আসনবিন্যাস
গত জুলাইয়ে সংসদ ভেঙে দেওয়ার সময় নেতানিয়াহুর জোটের হাতে নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে ৬০টি ছিল। জোটে ছিল লিকুদ পার্টির ৩২টি, শাসের ১১টি, রিলিজিয়াস জায়োনিজমের ৭টি, ইতামার বেন-গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিৎ পার্টির ৬টি এবং নিউ হোপের ৪টি আসন। তবে শাস ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকার ছেড়ে গেলেও জোটে থেকে যায়। এবারের নির্বাচনে নিউ হোপ লিকুদ পার্টির সঙ্গে জোটের যুক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর হাতে ছিল ৫৯টি আসন। এর মধ্যে ইয়েশ আতিদের ২৪টি, ব্লু অ্যান্ড হোয়াইটের ৮টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের ৭টি, ইসরায়েল বেইতেইনুর ৬টি, হাদাশ-তালের ৫টি, ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা'আমের ৫টি এবং লেবার পার্টির ৪টি আসন ছিল। একটি মাত্র আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নোয়াম কোনো জোটেই নেই।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা
দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চললেও পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু। তার নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোটের মুখোমুখি হয়েছে চারটি প্রধান ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের জোট। নির্বাচনের আগে দলগুলোর নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণ না করা এবং নির্বাচনের পর সরকার গঠনে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একটি ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে বিরোধী শিবিরের প্রধানমন্ত্রী পদের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে। জনমত জরিপে তার নতুন দল ইয়াশার পার্টি লিকুদের সঙ্গে প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছে।
বিরোধী জোটে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট ও ইয়ার ল্যাপিদের নেতৃত্বাধীন ‘টুগেদার’, আভিগডর লিবারম্যানের ‘ইসরায়েল বেইতেইনু’ এবং ইয়ার গোলানের ‘ডেমোক্র্যাটস’।
অন্য প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোট্রিচ। এ ছাড়া নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে অতি-গোঁড়া ইহুদি দলগুলো এবং আরব-সংখ্যাগরিষ্ঠ তালিকারা'আম ও জয়েন্ট লিস্ট।
গত মাসে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা'আম ও জয়েন্ট লিস্টকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে ভোট দেয়। তবে ২ অক্টোবর দেশটির সর্বোচ্চ আদালত সর্বসম্মতিক্রমে ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন। আদালত জানান, দল দুটিকে বাদ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি শর্ত পূরণ হয়নি।
জয়েন্ট লিস্টের অন্যতম দল বালাদের নেতা ও ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি নাগরিক সামি আবু শেহাদেহ নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। আদালতের অধিকাংশ বিচারক তার অযোগ্যতা বহাল রাখার ইঙ্গিত দেওয়ার পর তিনি এ সিদ্ধান্ত নেন।
নির্বাচনের পর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা এসব দলের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন।
সাত বছরে ষষ্ঠ নির্বাচন
আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনটি ২০১৯ সালের পর ইসরায়েলের ষষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন। তবে ৩৮ বছরের মধ্যে এই প্রথম পূর্ণ নেসেটের মেয়াদ স্বাভাবিকভাবে শেষ হওয়ার পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বর্তমান ধারার শুরু ২০১৯ সালের এপ্রিলে। সে সময় নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও বেনি গান্টজের ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি উভয়েই ৩৫টি করে আসন পায়। একই বছরের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় নির্বাচনেও অচলাবস্থা তৈরি হয়। ওই নির্বাচনে ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট ৩৩টি এবং লিকুদ ৩২টি আসন পায়। দুই দফাতেই কোনো পক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো জোট গঠন করতে পারেনি।
২০২০ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত তৃতীয় নির্বাচনে লিকুদ ৩৬টি এবং ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট ৩৩টি আসন পায়। পরে নেতানিয়াহু ও গান্টজের নেতৃত্বে ঐক্য সরকার গঠিত হলেও এক বছরের মধ্যে তা ভেঙে পড়ে।
২০২১ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে লিকুদ ৩০টি এবং ইয়েশ আতিদ ১৭টি আসন পায়। এরপর নাফতালি বেনেট ও ইয়ার ল্যাপিদের নেতৃত্বে আট দলের একটি জোট সরকার গঠন করে। ওই জোটে আরব দল রা'আমও ছিল। এর মধ্য দিয়ে নেতানিয়াহুর ১২ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তবে নতুন সরকার মাত্র এক বছর টিকে থাকে পেরেছিল।
২০২২ সালের নভেম্বরে আবার ক্ষমতায় ফেরেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ওই নির্বাচনে লিকুদ ৩২টি এবং ইয়েশ আতিদ ২৪টি আসন পায়। এরপর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে ডানপন্থি সরকার হিসেবে পরিচিত একটি জোটের নেতৃত্ব দেন। এবারের জনমত জরিপগুলোতেও কোনো দলের এককভাবে ৬১টি আসন পাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীদের ইতিহাস
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটিতে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। তিন দফায় তিনি মোট ১৯ বছর এ পদে ছিলেন। তার প্রথম মেয়াদ ছিল ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত, দ্বিতীয় মেয়াদ ২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এবং তৃতীয় মেয়াদ ২০২২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
এ ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর সবচেয়ে কাছাকাছি ছিলেন ডেভিড বেন-গুরিয়ন। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এবং পরে ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের নেতৃত্ব দেন। আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে যে ফলই আসুক না কেন, নতুন সরকার শপথ নেওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৩ সালে গাজায় যুদ্ধ শুরু, লেবানন ও ইরানে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইসরায়েলের নেসেট নির্বাচন। যুদ্ধকালে দেশটিতে নেতানিয়াহু সরকারবিরোধী বিক্ষোভ বেশ তীব্র হয়েছিল। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিক চাপের মুখে এই নির্বাচন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যত: দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার দল লিকুদ পার্টি চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছে। দুর্নীতি মামলা এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার দায় তার ওপর বর্তানো নিয়ে ভোটারদের মধ্যে তীব্র বিভক্তি রয়েছে।
গণতন্ত্র ও বিচার বিভাগীয় সংস্কার: বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন কেবল সরকার বদলের লড়াই নয়, বরং ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও বিতর্কিত বিচার বিভাগীয় সংস্কার আইন বজায় রাখা বা বাতিলের ওপর এক ধরণের গণভোট।
জোট গঠন ও ম্যাজিক ফিগার: ১২০ আসনের নেসেটে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে দরকার হয় ৬১ আসন। ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন ছাড়া সরকার তৈরি সম্ভব নয়, যা উগ্র-ডানপন্থি এবং অতি-ধর্মীয় দলগুলোর রাজনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।
অভ্যন্তরীণ ও সামরিক নীতি: অতি-অর্থোডক্স (Haredi) ইহুদিদের সামরিক সেবা থেকে ছাড় দেওয়া হবে কি না, স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন হবে কি না, এবং পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বা ফিলিস্তিন নীতি কেমন হবে, তা এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব: এই নির্বাচন মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক মহলে গভীর নজর কেড়েছে। নির্বাচনে নেতানিয়াহু জিতলে অতি-ডানপর্ন্দেিথর প্রভাব বাড়বে, আর বিরোধী জোট জয়ী হলে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা আসতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
লেখক পরিচিতি:
মোহাম্মদ হাদ্দাদ আলজাজিরার ডিজিটাল ইন্টারঅ্যাকটিভ টিমের লিডার। ২০১৫ সালে তিনি ‘প্যালেস্টাইন রিমিক্স’ সহ-প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এডওয়ার্ড আর. মুরো অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সিলেন্স ইন ইনোভেশন, অনলাইন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড, সিগমা অ্যাওয়ার্ডস, ওয়েবি অ্যাওয়ার্ডস এবং ওয়ান ওয়ার্ল্ড মিডিয়া অ্যাওয়ার্ডস অর্জন করেছেন।
হানা দুগগাল লন্ডন-ভিত্তিক ‘এজে ল্যাবস’-এর ইন্টারঅ্যাক্টিভ টিমের সদস্য। ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে তিনি জটিল তথ্যকে প্রাণবন্ত করে তোলেন এবং সমসাময়িক ঘটনা ও প্রবণতা সম্পর্কে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন। অর্থব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং তথ্য-নির্ভর অনুসন্ধানী প্রকল্পের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।





