জুলাই অভ্যুত্থান একক দল বা ব্যক্তির নয়: প্রধানমন্ত্রী

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
সম্মেলনে বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত যোদ্ধারা উপস্থিত থেকে তাদের দুঃখ-কষ্ট ও প্রত্যাশার কথা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘পাঁচ আগস্টের এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি দল-মত নির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে ৬৫ জন শিশুসহ প্রায় ১৪০০ মানুষ শহীদ হয়েছেন। কিন্তু শত বাধা-বিপত্তির মাঝেও আমি আমার নেতাকর্মী ও বন্ধুদের মাধ্যমে যে হিসাব পেয়েছি, তাতে শুধু জুলাই আন্দোলনেই শহীদ হয়েছেন অন্তত ২ হাজার মানুষ এবং ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ নানাভাবে আহত ও পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন।’
স্বৈরাচার ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা প্রতিহিংসা নয়, জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে নেওয়াই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানে যারা শাহাদাত বরণ করেছেন কিংবা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের এই ত্যাগের মূল উদ্দেশ্যই ছিল এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা।’
এসময় আবেগঘন কণ্ঠে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি যখন এই মঞ্চে বসে আপনাদের কথা শুনছিলাম, তখন ভাবছিলাম যদি এই মুহূর্তে আমি আমার মাকে (বেগম খালেদা জিয়া) জিজ্ঞেস করতে পারতাম, মা, গত ১৭ বছর আপনার ওপর যে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হয়েছে, আপনি কি চান আমি তার প্রতিশোধ নিই? কারণ সেই প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা ও শক্তি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এখন আমাকে দিয়েছেন। কিন্তু আমি নিশ্চিত, আমার মায়ের সন্তান হিসেবে তিনি আমাকে বলতেন তোমার দায়িত্ব দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে সামনে এগিয়ে নেওয়া, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।’
একইভাবে নিজের প্রয়াত ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি যদি আমার ভাইটিকে জিজ্ঞেস করতাম, সে-ও একই উত্তর দিত। কারণ আমরা একই মায়ের সন্তান, আমাদের শরীরে একই রক্ত প্রবাহিত।
নিজের প্রবাস জীবনের কষ্টের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৭ বছর আগে যখন আমি দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলাম, কী অবস্থায় গিয়েছিলাম সেই বিবরণে আজ যাব না। তবে তখন অনেক সুস্থ-সবল সহকর্মীকে রেখে গিয়েছিলাম, যাদের অনেককেই পাঁচ আগস্টের পর ফিরে এসে আর পাইনি। ছাত্রদল ও বিএনপিসহ আমার দলের বহু নেতাকর্মী আজ আমাদের মাঝে নেই, তারা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আর অনেকে ফিরে এসেছেন পঙ্গুত্ব বরণ করে, অঙ্গহানি নিয়ে। পাঁচ আগস্টের আগে ও পরেও একই নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছে।
তিনি আরও যোগ করেন, মঞ্চের সামনে বসা খোকন, রাকিব, আবিদ কিংবা সাত্তার পাটোয়ারীদের যখন শারীরিক যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখি, তখন কষ্ট পাই। সারা দেশে বিএনপির প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মী বিগত স্বৈরাচারের আমলে গায়েবি ও মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে নির্যাতিত হয়েছেন।
বিচারের প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের ওপর যে অন্যায় হয়েছে, আপনাদের আপনজনকে যারা পুড়িয়ে বা গুলি করে হত্যা করেছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের সঠিক বিচার হবে। ইতোমধ্যে নিম্ন আদালতে কিছু বিচার প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। তবে আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, স্বৈরাচার আমাদের ওপর যেভাবে অবিচার করেছিল, আমরা বিচারের নামে কারও প্রতি কোনো ধরনের অবিচার করব না। প্রয়োজনে আইনি নিয়মকানুন মেনে কিছুটা সময় নেওয়া হবে, কিন্তু কোনো অপরাধী যেন পার পেয়ে না যায় এবং কোনো নির্দোষ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন থাকবো।
আহত ও শহীদ পরিবারের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র তার সাধ্যমতো আপনাদের পাশে থাকবে এবং সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে। কিন্তু আমরা যদি সব দাবিও পূরণ করি, তবুও কি হারানো আপনজনকে বা চোখের দৃষ্টিকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব? সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি এই ত্যাগের বিনিময়ে দেশকে স্বৈরাচারমুক্ত করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে পারি, তবে ওপার থেকে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে। আপনাদের ত্যাগের কারণেই আজ এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব হচ্ছে।
উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল সুদৃঢ় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। একটি জাতিকে বিভক্ত করে কখনোই সামনে এগিয়ে নেওয়া যায় না। তাই আমাদের মূল লক্ষ্য হলো দেশ এবং দেশের জনগণ। আসুন, আজকের এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা শপথ নিই যে লক্ষ্য ও আদর্শের জন্য আমাদের ভাইয়েরা, শিশুরা রক্ত দিয়েছেন, তা বাস্তবায়নে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকবো। কোনো অপশক্তিই যেন আমাদের এই অর্জন থেকে বিচ্যুত করতে না পারে।




