ধ্বংসের মুখে ২৫০ বছরের প্রাচীন বোয়ালিয়া জমিদার বাড়ি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চাঁদপুর
ধ্বংসের মুখে ২৫০ বছরের প্রাচীন বোয়ালিয়া জমিদার বাড়ি
২৫০ বছরের প্রাচীন বোয়ালিয়া জমিদার বাড়ি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

হাতি নেই, ঘোড়া নেই, নেই সিংহাসন আর জমিদারি প্রথা; কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের আনুমানিক ২৫০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। ১৭ শতকের শেষভাগে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৭৯৩ সালে নির্মিত ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও শিল্প-কুশলতার এক অপূর্ব নিদর্শনসমৃদ্ধ এই প্রাচীন স্থাপনাটি বর্তমানে চরম অবহেলা আর সংস্কারের অভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। স্থানীয় বাসিন্দা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের দাবি, দেশের অন্যতম এই গৌরবময় অতীতকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে এটিকে সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ করে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক।

জানা গেছে, ১৭ শতকের শেষের দিকে রায় মজুমদার ও দে চৌধুরী যৌথভাবে চাঁদপুর জেলার মতলব দক্ষিণ উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামে এই ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি স্থাপন করেন এবং এখানে জমিদারিত্ব শুরু করেন। তৎকালীন এই দুই জমিদারই ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও মানবতাবাদী। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে তাদের অকাতরে দেওয়া দানে গড়ে উঠেছে এলাকার মসজিদ, মন্দির, বাজার, ডাকঘর ও স্কুলসহ অসংখ্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান।

ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও শিল্পকুশলতার এক অপূর্ব নিদর্শন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদার বাড়িটি হতে পারে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন স্পট। সুবিশাল পরিসরে প্রায় ৩৫০ বিঘা জমির ওপর এই প্রাসাদটি নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে বাড়িটি কারও দখলে না থাকলেও এটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়—ইট, সুরকি, রড, কাস্ট আয়রনের ভেন্টিলেটর ও গ্রিল, সিরামিক টাইলস, মোজাইক মেঝে আর নিখুঁত নকশা, খিলান, কার্নিশ ও ছাদের কারুকাজ বাড়িটিকে দিয়েছে অনন্য শৈল্পিক মর্যাদা। দোতলা বিশিষ্ট এই ভবনে রয়েছে ৫০টিরও বেশি কক্ষ। এখানে একসময় ছিল মন্দির, গোসলখানা, নাচঘর, আঁতুড়ঘর, বৈঠকখানা, খাজাঞ্চিখানা, চিত্রশালা, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ ও পান্থশালা। বাড়ির ভেতরে অন্তঃপুরবাসিনীদের জন্য ছিল তিন দিক ঘেরা পুকুরঘাট, খাল ও কূপ থেকে পানি সরবরাহের আধুনিক ব্যবস্থা, বিশাল ফুলের বাগান এবং খেলার মাঠ; যা একে পরিণত করেছে এক অনন্য সাধারণ স্থাপনায়। ভবনের প্রতিটি পরতে পরতে কারিগরি দক্ষতার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

জমিদার বাড়িটি মতলব পৌরসভার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, শতাব্দী প্রাচীন এই নিদারুণ নিদর্শন আজ চরম অযত্ন ও অবহেলায় ধ্বংসের মুখে। প্রতিনিয়ত ভেঙে পড়ছে এর দেয়াল, কার্নিশ আর শৈল্পিক কারুকাজ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনতিবিলম্বে এটি সংরক্ষণ করা না হলে অমূল্য এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে যাবে। ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িটি দেখতে এখনও প্রতিদিন বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত দর্শনার্থী ভিড় জমান।

ফরিদগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থী খোরশেদ আলম বলেন, আমি অনেক দূর থেকে এখানে ঘুরতে এসেছি। সুবিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি এই বাড়িটিতে এসে শত বছরের পুরোনো ইতিহাস ও স্মৃতি দেখলাম। সরকারের কাছে জোর দাবি, এই অতীত ঐতিহ্য যেন বিলীন না হয়ে যায়, সেজন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হোক।

স্থানীয় ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা শিবুল গোস্বামী বলেন, আমার জন্মের পর থেকেই এই বাড়িটি এভাবে দেখে আসছি। এটি অত্যন্ত পুরোনো ও ঐতিহাসিক বাড়ি। শুনেছি, জমিদাররা ঘোড়ায় চড়ে চলাচল করতেন এবং যে পথ দিয়ে তারা চলতেন, সেটিই পরে রাস্তায় রূপান্তরিত হতো। বাবা-দাদার মুখে শুনেছি, এই বাড়ির জমিদাররা খুব দানশীল ছিলেন। অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকা এই পরিত্যক্ত বাড়িতে প্রতিদিনই বিভিন্ন জায়গা থেকে শত শত মানুষ ঘুরতে আসেন। অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাড়িটি সংস্কারের জন্য আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে মতলব দক্ষিণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কেএম ইশমাম বলেন, ইতিহাস থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এই জমিদার বাড়িটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে ব্যাপারে দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে।

বিষয় :চাঁদপুর