হাওরে নিষিদ্ধ জালের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য

এশিয়া পোস্ট নিউজ, হবিগঞ্জ
হাওরে নিষিদ্ধ জালের দৌরাত্ম্য, হুমকিতে দেশীয় মাছ ও জীববৈচিত্র্য
হবিগঞ্জ হাওর। ছবি: এশিয়া পোস্ট

একসময়ের দেশীয় মাছের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার হবিগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওর, নদী ও খাল-বিল এখন নিষিদ্ধ জালের থাবায় বিপন্ন। কারেন্ট জাল, রিং জাল ও চায়না দুয়ারির অবাধ ব্যবহারে একদিকে যেমন বিলুপ্ত হচ্ছে শোল, গজার, পাবদা, বোয়াল ও আইড়ের মতো সুস্বাদু দেশীয় মাছ, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে জলজ জীববৈচিত্র্য।

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ—জেলার বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই, নবীগঞ্জ, চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার ছোট-বড় জলাশয়গুলোতে রাতের আঁধারে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে মাছ শিকার করছে। ফলে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, ডিমওয়ালা মা মাছ, এমনকি মাছের ডিমও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক প্রজননচক্র।

বানিয়াচং উপজেলার জেলে আরব আলী বলেন, আগে বর্ষায় একবার জাল ফেললেই শোল, গজার, পাবদা, কৈসহ নানা মাছ জালে উঠে আসত। এখন নিষিদ্ধ কারেন্ট জালের কারণে পোনা পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। মাছ কমে যাওয়ায় আমাদের জীবিকাও সংকটে পড়েছে।

আরেক জেলে আব্দুল করিম বলেন, রাতের বেলা অসাধু ব্যক্তিরা অবাধে কারেন্ট ও রিং জাল ব্যবহার করছে। অভিযান কম হওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আগে মাছ ধরেই সংসার চলত, এখন অনেকেই অন্য পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার শুধু মাছের উৎপাদন কমাচ্ছে না, পুরো জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় পরিবেশ, খাদ্যনিরাপত্তা এবং অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ জালের ব্যবহার চললেও তা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান দৃশ্যমান নয়। ফলে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারকারীরা প্রায় নির্বিঘ্নেই তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বানিয়াচং উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বোরহান উদ্দিন বলেন, নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি প্রতাপপুর ও ভবানীপুর হাওরে অভিযান চালিয়ে অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সচেতনতামূলক কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলম জানান, জেলার প্রায় সব উপজেলাতেই নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জনবল ও লজিস্টিক-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না হলেও অভিযান ও তদারকি আরও জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে হবিগঞ্জসহ দেশের সাতটি জেলাকে হাওর জেলা হিসেবে গেজেটভুক্ত করেছে। হাওরের মাছের প্রজনন রক্ষায় ৩০ মে থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এই সময়ে জেলেদের জন্য কোনো প্রণোদনা নেই। ভবিষ্যতে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি বছর হাওরে প্রচুর পোনা মাছের জন্ম হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সার্বিকভাবে মাছের উৎপাদন কিছুটা কম হতে পারে।

বিষয় :হবিগঞ্জ