অসহায় সিফাতের আর রইল না কেউ

এশিয়া পোস্ট নিউজ, লক্ষ্মীপুর
অসহায় সিফাতের আর রইল না কেউ
সিফাত হোসেন। ছবি : সংগৃহীত

সাত বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে স্বামী কামাল হোসেনকে হারান শাহিনুর বেগম। তিন মেয়ে ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে বহু কষ্টে সংসার টেনে নিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু জীবনে সুখের দেখা আর দেখে যেতে পারেননি। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে অভাবের এই সংসারে নেমে আসে কালো মেঘ। একে একে তিন মেয়ে সায়মা আক্তার (২১), ইকরা আক্তার (১৭) ও শিফা আক্তারসহ (৯) শাহিনুরকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তবে বাসায় না থাকায় বেঁচে যান একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন (১৮)।

Advertisement

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে।

১৮ বছর বয়সেই পড়ালেখার পাশাপাশি সিফাত রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এখানে কর্মরত। সকালবেলায় সিফাত তার বাসার অদূরেই কর্মস্থলে চলে যান।

সিফাতের বরাত দিয়ে রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সকালে সিফাত দোকানে আসে। পরে বেলা ১১টার দিকে তার মা ও বোনদের কুপিয়ে হত্যার খবর আসে। আমার দোকানের পেছনেই তাদের বাসা। লোকজন জড়ো হয়ে ঘাতক যুবককে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এদিকে বাবার শোক না কাটতেই একসঙ্গে মা ও তিন বোনের মৃত্যুতে এখন বাকরুদ্ধ সিফাত। প্রথমে ঘটনা শুনে বাসায় গিয়ে বুক চাপড়ে তিনি কান্নাকাটি করতে থাকেন। তার কান্নায় পরিবেশ বা চারপাশ ভারী হয়ে ওঠে। উপস্থি কেউ কান্না থামাতে পারেননি।

স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা গেছে সিফাতের গগনবিদারি কান্নার দৃশ্য। পরে তাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে বণিক সমিতির নেতার বাসায় নিয়ে রাখা হয় তাকে। সেখান থেকে তাকে একবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে গাড়িতে নিয়ে এসে ফের বণিক সমিতির নেতার বাসায় রাখা হয় সিফাতকে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে সিফাতের বাবা বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তখন পরিবারের বড় মেয়ে রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। অন্যরা বিভিন্ন শ্রেণিতে পড়ালেখা করতেন। এ ছাড়া ছোট মেয়ে শিফা প্রায় দুই বছর বয়সী ছিলেন। এর মধ্যে বড় মেয়ে সায়মা এসএসসি পাস করে আদমজী ক্যান্টমেন্ট কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করেন। সবশেষ কোথাও ভর্তি হননি তিনি। মেজ মেয়ে স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন বলে জানা গেছে। আর ছোট মেয়েও স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিল। একমাত্র ছেলে সিপাত পড়ালেখার পাশাপাশি মাকে সাহায্য করতে একটি দোকানে চাকরি নেন।

নিহত সায়মার একসময়ের সহপাঠী প্রমি আক্তার বলেন, সাইমা মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। সে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে। এর মধ্যে সে মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টাও করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়-ভর্তি পরীক্ষাও দিয়েছে। তবে ভর্তি হয়েছে কি না, আমি জানি না।

সিফাতের বরাত দিয়ে বণিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মুরাদ বলেন, সিফাতের বাবা মারা যাওয়ার পর তা মা খুব কষ্টে সংসার চালিয়েছেন। বছরখানেক ধরে সিফাত আমার এখানে কাজ করে। এখন তার তিন বোনসহ মাকেও কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ছেলেটির আর কেউ রইল না এই পৃথিবীতে। গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন কে আছে, তা বলতে পারেননি তিনি।

রায়পুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, একই পরিবারের চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বাড়ি কুমিল্লায়। পরিবারের একমাত্র ছেলে বেঁচে আছে। স্বজনদের খবর দিতে বলা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে আছে। আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে স্বজনরা এসে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ বুঝে নেবেন।

ওসি আরও বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রতন মজুমদার (২৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করেছে ক্ষুব্ধ জনতা। তার বাড়ি শুনেছি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। তবে সঠিক ঠিকানা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।