খামেনির জানাজা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে কঠিন পরীক্ষায় মোদি

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
খামেনির জানাজা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে কঠিন পরীক্ষায় মোদি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তেহরানের আমন্ত্রণ নয়দিল্লিকে কঠিন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষায় ফেলেছে।

Advertisement

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলার প্রথম দিনে নিহত হন খামেনি। আগামী ৪ থেকে ৯ জুলাইয়ের মধ্যে তেহরান, কোম এবং ইরাকের কিছু অংশে শোকমিছিল শেষে ইরানের মাশহাদ শহরে তাকে সমাহিত করা হবে। কূটনৈতিক কারণে ভারতের এই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তকে বিশ্বনেতারা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ভূরাজনীতি ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই আমন্ত্রণ বহুমুখী বিশ্বে ভারতের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। ঐতিহাসিক ও কৌশলগত কারণে ভারতের কাছে ইরান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চাবাহার বন্দর প্রকল্প—যা আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ায় যাওয়ার জন্য ভারতের একটি ফ্ল্যাগশিপ কৌশলগত বিনিয়োগ—তা ২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণারিতে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উপসাগরজুড়ে কর্মরত লাখ লাখ ভারতীয় প্রবাসীর স্বার্থ জড়িয়ে রয়েছে ইরানের স্থিতিশীলতার সঙ্গে।

আবার অন্য মেরুতে, আমেরিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নতুন দিল্লির জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এই পটভূমিতে খামেনির জানাজায় ভারতের উপস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্র ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। কৌশল ও ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ ব্রহ্মা চেলানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, জুলাই মাসে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এই আসন্ন রাষ্ট্রীয় শোক অনুষ্ঠান নয়াদিল্লিকে এক ব্যতিক্রমী জটিল কূটনৈতিক অবস্থানে ফেলেছে। একদিকে, ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন-ইসরায়েলি গুপ্তহত্যার পর স্পষ্ট নীরবতা বজায় রাখার কারণে ভারতের একটি সম্ভাব্য ‘কূটনৈতিক ঋণ’ রয়েছে। অন্যদিকে, শেষকৃত্যে অতিরিক্ত হাই-প্রোফাইল উপস্থিতি ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলকে ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি তৈরি করে।’

তিনি আরও বলেন, তবে একজন সিনিয়র প্রতিনিধি পাঠানো এটিই সংকেত দেবে যে নতুন দিল্লি তার ইরান নীতি সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল দ্বারা পরিচালিত হতে দিতে রাজি নয়, বিশেষ করে ইরানের চাবাহার বন্দরে ভারতের বড় ধরনের বিনিয়োগের কারণে—যা আফগানিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য পথ।

শোক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত কেমন হবে, তা একাধিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী মোদি নিজে এই অনুষ্ঠানে ইরান যাচ্ছেন না, কারণ একই সময়ে তার আগে থেকে একটি বহুজাতিক সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে, ভারত তেহরানে একজন সিনিয়র স্তরের প্রতিনিধি পাঠানোর কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং আগামী দিনগুলোতে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও লেখক প্রবীণ সাহনি একে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদি ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির শোক অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন কি দেবেন না তা হবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য একটি লিটমাস পরীক্ষা, যা বিশ্ব নেতারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন। আমি নিশ্চিত, মোদি এতে যোগ দেবেন না (ভুল প্রমাণিত হলে খুশি হব)...।

এর আগে ২০২৪ সালের মে মাসে যখন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান, তখন নয়াদিল্লি একদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিল এবং তৎকালীন উপ-রাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়কে শেষকৃত্যের জন্য তেহরানে পাঠিয়েছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। ইরানের পর ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে, যাদের ধর্মীয় আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন আয়াতুল্লাহ খামেনি। খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর ভারত সরাসরি কোনো নিন্দা না জানিয়ে কেবল নীরবতা বজায় রেখেছিল এবং প্রথম আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরি ইরানি দূতাবাসে গিয়ে শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদিও বারবার সংঘাত এড়াতে সংলাপ ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ন রেখে ভারত কীভাবে এই প্রতিদ্বন্দ্বী আন্তর্জাতিক স্বার্থগুলোকে সামাল দেয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে