ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়ায় ট্রাম্পের নামে মামলা

গাজায় গণহত্যার দায়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। আর এতেই আইসিসির তিন বিচারকের ওপর চটে যান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মিত্র নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের প্রতিশোধ নিতে ওই তিন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল তার প্রশাসন।
এবার মার্কিন প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন আইসিসির ওই বিচারকেরা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন তারা। আইসিসির বিচারকদের দাবি, ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল। আমাদের শাস্তি দেওয়া ও চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
বুধবার (২৪ জুন) ম্যানহাটনের একটি ফেডারেল আদালতে দায়ের করা মামলায় কানাডার বিচারক কিম্বার্লি প্রোস্ট, উগান্ডার বিচারক সোলোমি বালুঙ্গি বোসা ও বেনিনের বিচারক রেইন অ্যাডেলেইড সোফি আলাপিনি-গানসু বলেন, বিচারকদের শাস্তি দেওয়া ও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য বিচারবহির্ভূত চাপ প্রয়োগের উদ্দেশ্যেই এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল।
২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির কয়েকজন বিচারকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পেছনে ছিল আদালতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একটি ছিল ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা। অন্যটি ছিল আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করা। বিচারকদের মতে, এসব সিদ্ধান্তের প্রতিশোধ নিতেই এই নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
নিষেধাজ্ঞার ফলে বিচারকদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পত্তি ও সম্পদ জব্দ করা হয়। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের লেনদেন করতে নিষেধ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অর্থ, পণ্য বা সেবা সরবরাহের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসির কাজ হলো গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার করা। আদালতটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধ অথবা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কোনো পরিস্থিতি আদালতে পাঠালে সেই বিষয়ে বিচারিক এখতিয়ার প্রয়োগ করতে পারে।
বর্তমানে আইসিসির ১২৫টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। এসব দেশে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার করার ক্ষমতা আদালতের আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ইসরায়েলসহ কয়েকটি দেশ আইসিসির কর্তৃত্ব স্বীকার করে না।
ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদকালেও তার প্রশাসন আফগানিস্তানসংক্রান্ত তদন্তের কারণে আইসিসির তৎকালীন প্রধান কৌঁসুলি ফাতু বেনসুদা এবং তার এক সহযোগীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
নতুন মামলায় বিচারকরা যুক্তি দিয়েছেন যে, এই নিষেধাজ্ঞাগুলো আইনবিরোধী ছিল। কারণ, এগুলো আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (আইইইপিএ) আওতার বাইরে গিয়ে আরোপ করা হয়েছে এবং এর পেছনে কোনো প্রকৃত জাতীয় জরুরি অবস্থা বা অসাধারণ হুমকি ছিল না।
মামলায় আরও বলা হয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল বিচারকদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এর মাধ্যমে বিচারকদের আগের সিদ্ধান্তের জন্য শাস্তি দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আইন ও প্রমাণের ভিত্তিতে নয়, বরং নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়েছে।
বিচারকদের ভাষায়, আইইইপিএর অধীনে এমন নিষেধাজ্ঞা কার্যত ‘আর্থিক মৃত্যুদণ্ড’-এর সমতুল্য। তাদের দাবি, এই নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারছেন না, ব্যাংকিং সেবা পাচ্ছেন না, অ্যামাজন ও গুগলের মতো সাধারণ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারছেন না, ভ্রমণের বুকিং দিতে পারছেন না এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিমার সুবিধাও পাচ্ছেন না।
তিন বিচারক আরও বলেছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের সামনে বিচারাধীন বা ভবিষ্যতের মামলাগুলোতে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আইনি যুক্তি উপস্থাপনের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা আদালতের স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।






