ঝুপড়ি ঘরে বন্দি সাজুর ৭০ বছর, ভরসা কেবল ভাই-ভাবি

আল আমিন ভূঁইয়া, চাঁদপুর
ঝুপড়ি ঘরে বন্দি সাজুর ৭০ বছর, ভরসা কেবল ভাই-ভাবি
প্রতিবন্ধী নারী সাজুর পাশে তার ভাবি । ছবি: এশিয়া পোস্ট

জন্মের পর থেকেই পৃথিবীর আলো-বাতাস তার কাছে কেবলই ঝুপড়িঘরের চার দেয়াল। দীর্ঘ ৭০টি বছর ধরে একটি কাঠের খাটেই কেটে গেছে জীবনের পুরোটা সময়। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের জন্মগত প্রতিবন্ধী নারী সাজুর জীবন যেন এক দীর্ঘ ও নীরব কষ্টগাথা। চরম দারিদ্র্য, জরাজীর্ণ এক ঝুপড়ি ঘর আর একাকিত্ব— সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তার। তবে এই অন্ধকার জীবনেও মানবতার আলো জ্বেলে রেখেছেন তার ভাই ও ভাবি।

ঝুপড়ি ঘর আর কাঠের খাটই যার পৃথিবী

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাজু জন্ম থেকেই মারাত্মক শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার। বিছানা থেকে নিজে ওঠার ক্ষমতাটুকুও তার নেই। বহুকাল আগে বাবা-মা মারা যাওয়ার পর সাজুর পুরো পৃথিবীটাই থমকে যেতে পারত, কিন্তু তা হতে দেননি তার একমাত্র ভাই শামসুল কবিরাজ ও ভাবি পারুল বেগম। অভাবের সংসার হলেও গত ৭০ বছর ধরে এই নিঃসন্তান ও অসহায় বোনটিকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন তারা।

তার ভাবি পারুল বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিয়ের পর এই বাড়িতে এসে ননদকে নিজের বোনের মতোই দেখেছি। সে এই কাঠের খাট ছাড়া অন্য কোথাও থাকতে পারে না। মাথায় একটা বালিশ পর্যন্ত দেয় না, কাঠের ওপর মাথা রেখেই ৭০ বছর কেটে গেল। আমরা গরিব মানুষ, মনের টানে যা পারি সেবা করি।

তিনি আরও বলেন, সরকারের কাছে শুধু অনুরোধ, জীবনের শেষ সময়ে ওর জন্য যদি একটা ভালো থাকার ঘরের ব্যবস্থা হতো, তবে একটু শান্তিতে মরতে পারতো।

নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সংসারেও বোনকে কখনও বোঝা মনে করেননি শামসুল কবিরাজ। প্রতিদিন নিয়ম করে খাওয়ানো, গোসল করানো থেকে শুরু করে সব পরিচর্যা ভাই-ভাবি মিলেই করেন। শামসুল কবিরাজ আবেগময় কণ্ঠে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই বোনটাকে দেখছি। যতদিন শ্বাস আছে, ওর দায়িত্ব আমি পালন করব। কিন্তু আমার সামর্থ্য তো সীমিত। সমাজের বিত্তবান বা সরকার একটু হাত বাড়ালে বোনটার জন্য ভালো কিছু করতে পারতাম।

স্থানীয়দের আকুতি, প্রশাসনের আশ্বাস

সাজুর এই মানবিক কষ্টের কথা এতকাল আড়ালে থাকলেও সম্প্রতি তা নজরে এসেছে স্থানীয় প্রশাসনের। সাবেক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ বাবুল বেপারী এশিয়া পোস্টকে জানান, আমি মেম্বার থাকাকালে তার জন্য একটি প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করেছিলাম। ভবিষ্যতে গ্রামবাসী মিলে আমরা সবসময় তার পাশে থাকব।

একটি জরাজীর্ণ ঝুপড়িতে ৭০ বছর ধরে চলা এই কষ্টের অবসান চান এলাকাবাসী। মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকা শামসুল-পারুল দম্পতির এই লড়াইয়ে এখন প্রয়োজন সমাজের বিত্তবান ও মানবিক সংস্থাগুলোর একটুখানি সহানুভূতি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে প্রতিবন্ধী সাজুর প্রয়োজন একটি নিরাপদ মাথা গোঁজার ঠাঁই। এই আশাতেই দিন গুনছে পরিবারটি।

মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা বাহাদুরপুরের এই অসহায় নারীর বিষয়টি জানতে পেরেছি। ঘরটি সত্যিই অত্যন্ত জীর্ণ ও বসবাসের অযোগ্য। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ঘরটি মেরামত করে বাসযোগ্য করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি তার পরিবারকে সাধ্যমতো সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে।

বিষয় :চাঁদপুর