অচল ট্রাফিক সিগন্যাল সচলে উদ্যোগ নেই, বাড়ছে দুর্ভোগ

২০১৫ সালে ময়মনসিংহ বিভাগ ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ১৪ অক্টোবর গঠিত হয় সিটি করপোরেশন। তখন পুরোনো ২১টি ওয়ার্ডের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয় আরও ১২টি ওয়ার্ড। বিভাগীয় শহর হওয়ায় দিন দিন বেড়েছে মানুষের যাতায়াত ও যানবাহনের চাপ। বর্তমানে নিবন্ধিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। এ ছাড়া সাড়ে পাঁচ হাজারের বেশি মিশুক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে নগরীতে।
নিয়ম অনুযায়ী অটোরিকশা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে প্রতিদিন অর্ধেক চলাচলের অনুমতি থাকলেও বাস্তবে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যানবাহন সড়কে নামছে। ফলে বাড়ছে যানজট। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ বিশ্বের ১৫২ দেশের ১ হাজার ২০০ ধীরগতির শহরের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে যান চলাচলের ধীরগতির তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল শীর্ষে, আর নবম স্থানে ছিল ময়মনসিংহ।
নগরীর ব্যস্ত সড়কগুলোতে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা এখন নিত্যদিনের চিত্র। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনায় ট্রাফিক সিগন্যাল গুরুত্বপূর্ণ হলেও ময়মনসিংহে স্থাপন করা সিগন্যাল বাতিগুলো ৩৪ বছরেও কার্যকর হয়নি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, নজরদারির ঘাটতি ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় সেগুলো এখন পরিত্যক্ত অবকাঠামোয় পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কত টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছিল বা বর্তমান অবস্থা কী, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে নগরবাসীর অভিযোগ, কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও কখনোই জ্বলে ওঠেনি এসব সিগনাল বাতি।
জানা গেছে, ১৯৯২ সালে যানজট নিরসন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও ব্যস্ত সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইট স্থাপন করা হয়। সে সময় এটিকে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে এর কোনো সুফল পায়নি নগরবাসী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, স্থাপনের পর থেকে আজ পর্যন্ত কোনো দিনই এসব সিগন্যাল কার্যকরভাবে জ্বলতে দেখা যায়নি। বছরের পর বছর অযত্নে পড়ে থেকে সিগন্যাল পোস্ট, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও বাতিগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও চুরি হয়েছে তার, লাইট ও যন্ত্রাংশ। জং ধরে নষ্ট হওয়া
সিগন্যাল বাতিগুলো এখন পাখির বাসায় পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে ময়মনসিংহ শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা পুরোপুরি নির্ভর করছে ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর। যানজট নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন সড়কে কাজ করছেন ট্রাফিক পুলিশের ১২০ সদস্য। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাতের ইশারায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু যানবাহনের সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় এই পদ্ধতি আর কার্যকর থাকছে না।
বিশেষ করে স্টেশন রোড, গাঙ্গিনারপাড়, সি কে ঘোষ রোড, চরপাড়া, নতুন বাজার, টাউন হল, পাটগুদাম ব্রিজ মোড় ও শম্ভুগঞ্জ মোড়ে প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট তৈরি হচ্ছে। নগরবাসীর মতে, আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থা চালু থাকলে অন্তত যান চলাচলে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরত।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; এগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। নজরদারির অভাবে চুরি হয়ে গেছে অনেক খুঁটি, বৈদ্যুতিক তার ও লাইট। ফলে একদিকে বাড়ছে যানজট ও দুর্ঘটনা, অন্যদিকে নষ্ট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
চরপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী ইয়াসিন আহমেদ টুটুল বলেন, চরপাড়া মোড়ের পাশেই ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন অসংখ্য রোগী হাসপাতালে আসে। যানজটের কারণে অনেক সময় অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
গাঙ্গিনারপাড় এলাকার বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ পাল বলেন, অচল সিগন্যাল বাতিগুলো এখন শুধু ব্যর্থ প্রকল্পের প্রতীক নয়, বরং নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারও প্রতিচ্ছবি। দ্রুত এগুলো সংস্কার করে আধুনিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।
নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা মঈনুল হোসেন বলেন, রাজধানী ঢাকায় এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা চালুর পর সিগন্যাল অমান্য কমেছে। ময়মনসিংহেও এ ধরনের প্রযুক্তি চালু হলে বিশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ হবে।
সংগঠক ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন বলেন, কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হয়েছে। খুঁটি, বৈদ্যুতিক তার ও লাইট চুরি হয়ে যাচ্ছে। এসবের দায় নির্ধারণ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ময়মনসিংহ নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব সামসুদ্দোহা মাসুম বলেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। এতে দুর্ঘটনা ও যানজট অনেকাংশে কমবে।
ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, আধুনিক সিগন্যাল লাইট ও এআই প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা স্থাপন করা প্রয়োজন। এতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা সহজে শনাক্ত করা যাবে।
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, ১৯৯২ সালে ট্রাফিক সিগন্যাল লাইটগুলো স্থাপন করা হয়েছিল। এগুলো সচল করতে হলে আগে নাগরিক ও চালকদের সচেতন করতে হবে। সবাই সচেতন না হলে সিগনাল ব্যবস্থা কার্যকর হবে না।
.png)






