Advertisement

খুলনায় চার মাসে ২৬ খুন, দৌরাত্ম্যে কিশোর গ্যাং

এশিয়া পোস্ট নিউজ, খুলনা
খুলনায় চার মাসে ২৬ খুন, দৌরাত্ম্যে কিশোর গ্যাং
ছবি : সংগৃহীত

খুলনা মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক, ছিনতাই এবং তুচ্ছ ঘটনার জেরে কিশোর গ্যাংগুলো প্রকাশ্যেই খুনসহ নানা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে জেলাজুড়ে অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে মাঠপর্যায়ে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসী।

গত কয়েক মাসে নগরীর লবণচরা, খানজাহান আলী, সোনাডাঙ্গা, দৌলতপুর ও খালিশপুর থানা এলাকায় একের পর এক গুলিবর্ষণ, সশস্ত্র হামলা, ছিনতাই ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। কোথাও আধিপত্য বিস্তার, কোথাও মাদক ব্যবসা, আবার কোথাও চাঁদাবাজির বিরোধকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে প্রকাশ্যে গুলি চালানোর একাধিক ঘটনায় নগরবাসীর উদ্বেগ নতুন মাত্রা পেয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে খুলনা জেলায় অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মহানগরীতে আটটি এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ১৩টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এর মধ্যে রূপসায় পাঁচজন, দিঘলিয়ায় তিনজন, ডুমুরিয়ায় দুজন এবং তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রায় একজন করে নিহত হয়েছেন। এছাড়া এপ্রিল পাঁচ হত্যার শিকার হয়েছেন। এ সময়ে গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক মানুষ।

সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ডগুলোর একটি ছিল রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সভাপতি ও রূপসা-বাগেরহাট আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহ হত্যা। গত ৪ মার্চ রাতে নগরীর ডাকবাংলা মোড়ে তাকে প্রকাশ্যে গুলি করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করতে ধারালো অস্ত্র দিয়েও কুপিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় অশোক ঘোষ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও জনবহুল এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল দেখা গেলেও এখন সেই উপস্থিতি অনেকটাই কমে গেছে। রাতে জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হয়। একই সঙ্গে মোটরসাইকেলে মহড়া দিয়ে কয়েকটি কিশোর গ্যাং বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে।

যদিও গত দুই মাস ধরে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে, তবে সাধারণ মানুষের দাবি—এর দৃশ্যমান প্রভাব এখনো তেমনভাবে চোখে পড়ছে না।

নগরীর শিববাড়ি এলাকার মোবাইল ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন বলেন, রাতের পর দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরতে ভয় লাগে। প্রধান সড়কের তুলনায় গলিপথে ছিনতাই বেড়েছে। এসব এলাকায় পুলিশকে খুব একটা দেখা যায় না।

খালিশপুর এলাকার অভিভাবক মনোয়ারুল কবির বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করছে। অনেকেই মাদকাসক্ত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, খুন, গুলিবর্ষণ আর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় মানুষ আতঙ্কে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে— মাদক ব্যবসা, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা এবং সক্রিয় অপরাধী চক্রগুলোর দ্বন্দ্বের জেরেই অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, খুলনা মহানগরী ও আশপাশে বর্তমানে অন্তত ছয় থেকে নয়টি অপরাধী চক্র সক্রিয় রয়েছে।

খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। প্রতিটি অপরাধের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে জেলা পুলিশ আন্তরিকভাবে কাজ করছে।

কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত তিন মাসে মহানগরীর লবণচরা, খানজাহান আলী, সদর ও দৌলতপুর এলাকায় গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় অন্তত ৩০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

কেএমপির পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেন, আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। খুলনায় মিল-কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাদক সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে। চলতি বছর কেএমপি এলাকায় ১৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৪টিরই রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, খুলনা আগে থেকেই অপরাধপ্রবণ নগরী। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে বেড়েছে। তারা খুন, ছিনতাই ও মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা নগরীর প্রতিটি এলাকা নিরাপত্তার আওতায় আনতে কাজ করছি। ব্যক্তিস্বার্থকে কেন্দ্র করে অপরাধী গ্রুপগুলোর মধ্যে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তবে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জাহিদুল হাসান আরও বলেন, সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চলছে। আশা করছি, অভিযান শেষ হওয়ার আগেই খুলনার ছোট-বড় সব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

বিষয় :খুলনা