পেঁয়াজের আড়তে আটকে আছে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প

পেঁয়াজের আড়তে আটকে আছে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প
ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের নির্মাণাধীন পেঁয়াজের আড়ত। ছবি : এশিয়া পোস্ট

পুরান ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঔপনিবেশিক আমলের অনন্য স্থাপনা নর্থব্রুক হল—লাল ইটের গাঁথুনিতে নির্মিত এ দালান লালকুঠি নামেই বেশি পরিচিত। ঢাকার প্রথম টাউন হল হিসেবে এটি নির্মাণ করা হয় ১৮৭৪ সালে। দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি ২০২৪ সালে সংস্কারের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। অর্থায়নে এগিয়ে আসে বিশ্বব্যাংক। ওই বছরের জুনে শুরু হওয়া সংস্কারকাজের বেশির ভাগ সঠিকভাবে সম্পন্ন হলেও শেষপর্যায়ে এসে ঘটেছে বিপত্তি। 

Advertisement

লালকুঠি সংস্কার প্রকল্পের আওতাধীন জমিতে গায়ের জোরে পেঁয়াজের আড়ত নির্মাণ করছে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব। এ আড়তের কারণে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে প্রকল্পটি। বাধ্য হয়ে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা সিটি নেবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট (ডিসিএনইউপি) শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ডিএসসিসি লালকুঠি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এ প্রকল্পের আওতায় টাউন হল, প্রদর্শনী ও সেমিনার হল, লাইব্রেরি, বুক ক্যাফে এবং ডিজিটাল আর্কাইভ নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু জটিলতা দেখা দিয়েছে প্রকল্পের আওতাধীন কমিউনিটি সেন্টার ও গাড়ি পার্কিং নিয়ে। এ জটিলতার সৃষ্টি করেছে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাব। লালকুঠির গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে পেঁয়াজের আড়ত নির্মাণ করছে তারা। তাদের বাধায় দীর্ঘসময় আটকে ছিল কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের কাজও। 

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ক্লাবের কর্মকর্তা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চাপে প্রকল্পের নকশা পরিবর্তন করে পার্কিংয়ের জায়গায় আড়ত নির্মাণের সুযোগ করে দিয়েছে খোদ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। অথচ আইন অনুযায়ী ঐতিহাসিক এ দালানের ৯ মিটার এলাকার মধ্যে কোনো স্থাপনা নির্মাণের সুযোগই নেই। 

ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের দখলবাজি 
ডিএসসির প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, লালকুঠি সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ। এখন ফিনিশিং চলছে। সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রকল্পের অংশ হিসেবে নর্থব্রুক হল ও জনসন হলের সংস্কারকাজ প্রায় শেষের দিকে। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে ব্রেঞ্চ সাইটের অর্ধেক কাজও শেষ। বাকি কাজ শেষ করতে ওয়াসার একটি পানির পাম্পও সরানো হয়েছে। 

ভবনের উত্তর পাশের সামনে নির্মাণ করা হয়েছে মার্বেল পাথরের ফোয়ারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, লালকুঠির পাশে ফরাশগঞ্জ ক্লাবঘেঁষে একটি ছোট পার্কিং আর দুটি গেট নির্মাণের কথা। কিন্তু ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের খামখেয়ালির কারণে সে কাজ সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। শুরু থেকেই ক্লাবটির নেতারা এ প্রকল্পের কাজে পদে পদে বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ মিলেছে। 

ডিএসসিসি সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের জুনে সংস্কারকাজ শুরুর পর ডিসেম্বরে ফরাশগঞ্জ ক্লাব কমিটির নেতাদের বাধার মুখে প্রকল্পের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য কাজ শুরু হলেও প্রায় ১৮ মাস বন্ধ ছিল কমিউনিটি সেন্টারের কাজ। পরে ক্লাবের দাবি অনুযায়ী নকশা ও পরিকল্পনা পরিবর্তন করে চারতলার পরিবর্তে দুইতলাবিশিষ্ট কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একইসঙ্গে বাদ পড়ে সেন্টারের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজও। 

এছাড়া ফরাশগঞ্জ ক্লাব এবং লালকুঠি ভবনের মাঝখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারের বেড়াও নির্মাণ করতে দেয়নি তারা। এমনকি গত বছরের সেপ্টেম্বরে দালানের দক্ষিণ পাশে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণে হাত দেন ক্লাবের নেতারা। একতলা পর্যন্ত ছাদ ঢালাই সম্পন্ন হওয়ার পর ডিএসসিসির ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে সেটি উচ্ছেদ করেন। 

কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের আগে ক্লাবের লোকজন নতুন করে তৎপর হয়ে ওঠেন এবং ক্লাবের সামনে থেকে সড়ক পর্যন্ত জায়গায় পেঁয়াজের আড়ত বসাতে এবার একতলা ভবন নির্মাণের কাজে হাত দেন। পার্কিং ও গেট নির্মাণের জন্য ওই স্থানটি নির্ধারণ করা ছিল। 

আইন অনুযায়ী, ওই এলাকায় স্থাপনা নির্মাণেরও নিয়ম নেই। কিন্তু ফরাশগঞ্জ ক্লাবের দাপটের মুখে নকশা পরিবর্তন করে ডিএসসিসিই তাদের আড়ত নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

এ বিষয়ে লালকুঠি সংস্কারকাজের ঠিকাদার ঢালী কনস্ট্রাকশনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মো. মেজবাহউদ্দিন ভূঁইয়া মুরাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফরাশগঞ্জ ক্লাব মূল ভবনের সংস্কারকাজে কয়েকবার বাধা দেয়। তাদের বাধায় কার পার্কিংয়ের জায়গা থেকেও এক দিনের মধ্যে সাইট অফিস সরাতে হয়েছে। এ সময় ভারত থেকে আনা মার্বেল পাথরও চুরি গেছে। এরপর থেকে কাজের গতি কমে গিয়েছিল।’

অসহায় কর্মকর্তারা, উল্টো সুর ফরাশগঞ্জের
লালকুঠি সংস্কারে ফরাশগঞ্জ ক্লাবের বাধার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিসিএনইউপি প্রকল্পের পরিচালক রাজিব খাদেম এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের লোকজন তাদের ক্লাবের আয় বৃদ্ধির জন্য লালকুঠির মূল ভবনের এলাকাতেই আড়ত, আটতলা ভবন আর ক্লাব সংস্কারের দাবি করে। পাশের নির্মিত কমিউনিটি সেন্টারটি আরও বর্ধিত করার দাবিতে কাজ বন্ধ ছিল। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এটির কাজ শুরু হয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘চার-পাঁচ মাস আগে লালকুঠির মূল ভবনের সামনে আটতলা ভবনের উদ্দেশ্যে একতলা ছাদ করে ফেলে। তখন করপোরেশনের ম্যাজিস্ট্রেট সেটি ভেঙে ফেলে। এখন আবার জোর করে ক্লাবের সামনে সরকারি জায়গা দখল করে একতলা মার্কেট করে ফেলেছে। সেখানে আমাদের নকশা অনুযায়ী পার্কিং ছিল। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়ে জানানো হবে। তবে লালকুঠির ৯ মিটারের মধ্যে কোনো স্থাপনা করার সুযোগ নেই।’

সংস্কারকাজের মূল দায়িত্বে থাকা স্থপতি ও স্থাপত্য সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ বিষয়টি নিয়ে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের চাওয়া তাদের আয় বৃদ্ধি। সেখানকার কমিউনিটি সেন্টার আর প্লাজাগুলো পরিচালনা করে বা যে কোনোভাবে এটা হতে পারে। কিন্তু আইন অমান্য করে কোনোভাবেই হ্যারিটেজের ৯ মিটারের মধ্যে স্থাপনা করা যাবে না। এটি দ্রুত উচ্ছেদ করতে হবে।’

তবে ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্য সচিব ও সূত্রাপুর থানা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আজিজুল ইসলাম এসব অভিযোগ মানতে নারাজ। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন তাদের নকশা পরিবর্তন করে জায়গাটি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। এটি ক্লাবের জায়গা। আগেও এখানে পেঁয়াজের আড়ত ছিল। তারা তাদের গেট সরিয়ে নেওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করেছি। তাদের অনুমতি নিয়েই ভবনের দক্ষিণ পাশে একটি হোটেল নির্মাণ শুরু করেছিলাম। কিন্তু তারাই আবার এটি ভেঙে দিয়েছে। এতে ক্লাবের সাড়ে ৪ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।’

সিটি করপোরেশনকে দোষারোপ করে তিনি আরও বলেন, ‘পাশের কমিউনিটি সেন্টারটির নকশায় ভুল আছে। সেখানে পার্কিংয়ের জায়গা নেই। এটি নিয়ে এলাকবাসীর ক্ষোভ আছে। ক্লাবটির অনেক সমস্যা, করপোরেশন এটি সংস্কার করে দিতে চাইলেও সেটি করে দেয়নি।’