১৭ বছরেও শেষ হয়নি ঢাকার ৪ নদীর সীমানা পিলার বসানো

ঢাকার চার প্রধান নদী রক্ষায় ২০০৯ সালে এক ঐতিহাসিক আদেশ দেন হাইকোর্ট। এতে নদীগুলোর আদি সীমানা চিহ্নিত করে পাড়ে স্থায়ী সীমানা পিলার স্থাপনের কথা বলা হয়। সেই আদেশের ১৭ বছর পরও বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যার ২২০ কিলোমিটার তীর পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। এখনও প্রায় এক হাজার সীমানা পিলার বসানো বাকি।
১৪৮ কিলোমিটার তীরে নেই কোনো স্থায়ী সুরক্ষা দেয়াল। ফলে নদীর বিশাল অংশ পুনরায় অবৈধ দখলের ঝুঁকিতে পড়েছে।
এই প্রকল্পের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। পরিকল্পনা অনুযায়ী, তিন ধাপে ২২০ কিলোমিটার বৃত্তাকার ওয়াকওয়ে ও সীমানা পিলার বসিয়ে নদী তীর সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করার কথা ছিল।
প্রথম পর্যায়ে ১৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্যামপুর ও নারায়ণগঞ্জে ২০ কিলোমিটার স্থায়ী গাইড ওয়াল (সুরক্ষা দেয়াল), দুটি ইকোপার্ক ও জেটি নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০১৮ সালে অনুমোদিত প্রকল্পে ৭ হাজার ১০০টি পিলার এবং ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে ২০১০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিআইডব্লিউটিএ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গী নদীবন্দর এলাকায় মোট ১৭ হাজার ৮২৯টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিশাল পরিমাণ তীরভূমি অবমুক্ত করেছিল।
বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, দ্বিতীয় পর্যায়ে এ পর্যন্ত তারা প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি পিলার এবং ৪২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে সম্পন্ন করেছেন। তবে ফতুল্লা, গাবতলী, আমিনবাজার, রায়েরবাজার, কামরাঙ্গীরচর, টঙ্গী ও আশুলিয়ায় এখনও এক হাজারেরও বেশি সীমানা পিলার স্থাপন বাকি আছে। তিনটি জেটি নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে।
কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পের ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে পরিবেশবাদীরা বলছেন, বাকি ৯ শতাংশ কাজই সবচেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ ও সমন্বয়হীনতা
প্রকল্পে ধীরগতির পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা।
প্রকল্প পরিচালক আবু জাফর মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কবির বলেন, ‘কিছু জায়গা নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের বিরোধ ছিল। এটির সমাধান করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত ভূমি মালিকদের আইনি জটিলতা ও মামলার কারণেও অনেক জায়গায় কাজ থমকে গেছে।’
তৃতীয় পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকাসহ আইনি জটিলতায় আটকে থাকা স্থানগুলোতে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে নতুন করে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক বলেন, এই ধাপে কেরানীগঞ্জ, পাগলা, মদনগঞ্জ, ডেমরা, কাঞ্চন ও পূর্বাচল এলাকায় অবশিষ্ট ১৪৮ কিলোমিটার তীরভূমিতে কাজ করা হবে। তবে বিদ্যমান ঘরবাড়ি ও স্থায়ী কাঠামোর কারণে অনেক জায়গায় অবিচ্ছিন্ন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ব্যয় বাড়লেও অর্জন সীমিত
২০১৮ সালে অনুমোদিত দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পটি ইতিমধ্যে দুইবার সংশোধন হয়েছে। প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৮৪৮ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা। সংশোধনের পর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও ভেস্তে গেছে। প্রকল্প পরিচালক জানান, সরকার এটিকে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রামের অধীনে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু সেখানে কোনো অগ্রগতি হয়নি। তাই এখন আমাদের ডিপিপি সংশোধন করছি এবং এটি পুনরায় মন্ত্রণালয়ে জমা দেব।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পরিবেশবাদীরা আদালতে যাওয়ার পর এই ঐতিহাসিক আদেশ এসেছিল। কিন্তু সরকার প্রথমে সীমানা চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পিলার বসাতে দেরি করে এবং যেখানে পিলার বসানো হয়েছে সেখানেও অবৈধ দখল ঠেকাতে পারেনি।’
তিনি বলেন, ‘আদালত এই চার নদীকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো নদীগুলোকে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সীমানা পিলার স্থাপন একটি দারুণ উদ্যোগ ছিল; এ জন্য বিআইডব্লিউটিএকে ধন্যবাদ। কিন্তু ব্যক্তিগত মালিক ও ব্যবসায়ীদের বাধার কারণে কাজগুলো আটকে আছে। তাদের উচিত দ্রুত বাকি কাজ শেষ করা।’
তিনি বলেন, ‘শুধু সীমানা রক্ষা করলেই নদী বাঁচবে না। নদীগুলোকে বাঁচানোর জন্য দূষণমুক্ত করতে হবে। কারণ দূষণের ফলে এগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।’







