Advertisement

জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথম গুমের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান এইচআরডব্লিউর

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথম গুমের অভিযোগ তদন্তের আহ্বান এইচআরডব্লিউর
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডব্লিউ) লোগো। ছবি: সংগৃহীত

সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকা থেকে মিরাজ শেখ নামের ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গুম করার যে অভিযোগ উঠেছে, তা হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অবিলম্বে তদন্ত করার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, মিরাজ শেখকে সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল কোস্টগার্ডের হেফাজতে, যাতে প্রতীয়মান হচ্ছে এটাই গত দুই বছরে বাংলাদেশে প্রথম গুমের ঘটনা হতে পারে।

লন্ডনের স্থানীয় সময় রোববার রাতে এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, গুম প্রতিরোধের লক্ষ্যে যে সংস্কার প্রস্তাব হয়েছিল, তা বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারের সরে আসা উচিত। সেখানে তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আগের সরকারের আমলে ‘গুম’ ব্যাপক আকার নিয়েছিল; আর তার থেকেই ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ শাসন করা অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং আদালতের আদেশ ছাড়াই যেকোনো বন্দিশালা পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। তবে নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ওই অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দিয়েছে। এর বদলে তারা নতুন একটি আইনের প্রস্তাব করেছে, যাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে মানবাধিকার কমিশনকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে না।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং সর্বশেষ এ ঘটনা দেখাচ্ছে যে যথাযথ সংস্কার ছাড়া এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে এ ধরনের চর্চা গভীরভাবে গেঁথে গেছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের (নাগরিকদের) সুরক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।’

যেভাবে নিখোঁজ হন মিরাজ শেখ

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল রাতে মোংলার সুন্দরবনসংলগ্ন জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা জেলে মিরাজ শেখকে আটক করে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান। পরদিন তার পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্টগার্ডের কার্যালয়ে গেলে প্রথমে বলা হয়, মিরাজ একটি ‘অভিযানে’ আছেন এবং তাদের বিকেলে আসতে বলা হয়; কিন্তু বিকেলে গেলে কোস্টগার্ড জানায়, মিরাজ কখনোই সেখানে ছিলেন না।

যে চায়ের দোকান থেকে মিরাজকে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হচ্ছে এবং যেখানে তার মোটরসাইকেলটি ফেলে রাখা হয়েছিল, সেই দোকানের মালিক জানান, ২১ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সদস্য পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি এসে মোটরসাইকেলের তালা খুলে সেটি নিয়ে যান। কোস্টগার্ডের সদস্যরাই পরদিন আবার সেটি ফেরত দিয়ে যান।

মিরাজ শেখের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা গুম করার সময় ও পরিস্থিতি এবং কোস্টগার্ডের সদস্যরা কীভাবে তাকে তুলে নিয়ে গেছেন, তার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।’

মিরাজের পরিবার এ বিষয়ে একটি অভিযোগ করেছে, তারা সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং একাধিক সরকারি কর্মকর্তাকে চিঠি দিয়েও কোনো ফল পায়নি। পরে মিরাজের বাবা আবেদন করলে হাইকোর্ট ১২ জুলাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ওই জেলেকে খুঁজে বের করে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।

কোস্টগার্ডের পশ্চিমাঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন মিরাজ শেখকে আটকের কথা বারবার অস্বীকার করেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন যে তার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

আইনি সংস্কার নিয়ে উদ্বেগ

নতুন সরকার গুম ঘটনা তদন্তের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি স্বাধীন সংস্থা গঠন করবে বলে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল। এই দুই অধ্যাদেশের মাধ্যমে গুমের ঘটনার স্বাধীন তদন্ত এবং প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ ছিল।

তবে নবনির্বাচিত সরকার অধ্যাদেশগুলোর মেয়াদ শেষ হতে দিয়ে এমন আইনের প্রস্তাব করেছে, যেখানে পুলিশই গুমের তদন্ত চালিয়ে যাবে। এতে মানবাধিকার কমিশনের কাজ হবে কেবল ‘সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছে তদন্তের প্রতিবেদন চাওয়া’। প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধি–বিধান প্রণয়নে সরকারের প্রভাব আরও বাড়বে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘নতুন সরকারের উচিত তাদের প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করে মানবাধিকার কমিশনের ওপর যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ দূর করা এবং কমিশনকে গুমের ঘটনা তদন্তের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়া।’ সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘পুলিশকে দিয়ে গুমের ঘটনার তদন্ত করালে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এই চর্চা বন্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও তৈরি হবে না।’