জুনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত বেড়েছে চার গুণ, ঝুঁকিতে তরুণরা

বর্ষা পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। বছরের প্রথম পাঁচ মাস পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, চলতি জুন মাসে এসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা যেন লাফিয়ে বেড়েছে। বিগত মাসগুলোর তুলনায় কেবল এই জুন মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে তরুণরা।
সোমবার (২৯ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশজুড়ে আরও পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও ১২৪ জন ডেঙ্গু রোগী।
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের। বাকিদের মধ্যে একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং অন্যজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
এ ছাড়া নতুন আক্রান্ত ১২৪ জনের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭০ এবং নারী ৫৪ জন। বর্তমানে আক্রান্তদের মধ্যে শুধু ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০২ জন।
জুনেই ভয়াবহ লাফ
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। আগের মাসগুলোতে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৭০০-এর ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে কেবল জুন মাসেই রেকর্ড ২ হাজার ৭২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ, আগের মাসগুলোর গড় হিসাবের তুলনায় কেবল জুনেই আক্রান্তের সংখ্যা চার গুণ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ হাজার ৪৫৫ জন। আর চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে।
আক্রান্ত ও মৃত্যুতে এগিয়ে পুরুষ, ঝুঁকিতে তরুণরা
সামগ্রিক মৃত্যু ও আক্রান্তের হারে নারীদের তুলনায় পুরুষদের সংখ্যা কিছুটা বেশি। মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, মোট মৃত্যুর ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ নারী।
বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের ডেঙ্গু সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণ ও যুবকেরা। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সিরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন, যার সংখ্যা ৮০০ জন। এর পরেই রয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সি (৭৫৯ জন) এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সিরা (৭৩২ জন)।
এর আগে, গত শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঢাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক (অ্যালার্মিং) অবস্থায় রয়েছে। পরশু আমরা সাতটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে একটি রেস্টুরেন্টসহ তিনটি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছি। এমনকি ঢাকা দক্ষিণেরও প্রায় অর্ধেক বাসাবাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে। বহুতল ভবনের বেসমেন্ট ও সরকারি কোয়ার্টারগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করছি এবং যেসব বাড়িতে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সতর্কতামূলক স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে বারবার সতর্ক করার পরও নির্মাণাধীন যেসব ভবনে লার্ভা মিলছে, তাদের আমরা আর্থিক জরিমানা করছি এবং অনাদায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।’
সাংবাদিকদের মাধ্যমে নগরবাসীর উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য কাউকে জরিমানা বা জেল দেওয়া নয়, বরং মানুষের জীবন বাঁচানো। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তা আপনাদের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।’
মীর শাহে আলম উল্লেখ করেন, সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত সরকারি অভিযান চললেও এটি সফল করতে নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সঙ্গে প্রতিটি পরিবার ও সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সরাসরি জড়িত।
তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাড়ির ছাদ, আঙিনা, বেসমেন্ট, ফুলের টব, ডাবের খোসা, রঙের কৌটা, পুরোনো টায়ার বা যে কোনো পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে। প্রতি তিন দিন পরপর জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলারও আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আঞ্চলিক ও ওয়ার্ড কার্যালয়গুলো থেকে বিনামূল্যে মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ট্যাবলেট সংগ্রহ করা যাবে। নাগরিকদের নিজ উদ্যোগে এসব ট্যাবলেট ব্যবহার করে জমে থাকা পানিতে লার্ভা ধ্বংসের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি গণমাধ্যমের প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার জোরদারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে (রিহ্যাব) নির্মাণাধীন ও আবাসিক ভবনগুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সদস্যদের নোটিশ দেওয়ার অনুরোধ করেন।






