চলতি মৌসুমে এক দিনে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ ৫ জনের মৃত্যু

বর্ষা পুরোপুরি জেঁকে বসার আগেই সারা দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গত ২৪ ঘণ্টায় মশাবাহিত এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও পাঁচজন। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১২৪ জন রোগী।
সোমবার (২৯ জুন) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো নিয়মিত ডেঙ্গুবিষয়ক প্রেস রিলিজ থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুইজন চট্টগ্রাম বিভাগের। বাকিদের মধ্যে একজন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), একজন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এবং একজন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা।
নতুন আক্রান্ত ১২৪ জনের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৭০ জন এবং নারী ৫৪ জন। বর্তমানে ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০২ জন ডেঙ্গু রোগী।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫ হাজার ৯২৪ জন। এর মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৫ হাজার ৪৫৫ জন।
অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ জনে। সামগ্রিক মৃত্যু ও আক্রান্তের হারে নারীদের তুলনায় পুরুষদের সংখ্যা কিছুটা বেশি। মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিকি ১ শতাংশ পুরুষ ও ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। অন্যদিকে, মোট মৃত্যুর ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ নারী।
বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের ডেঙ্গু সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন তরুণ ও যুবকেরা। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সিরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন, যার সংখ্যা ৮০০ জন। এর পরেই রয়েছে ২১ থেকে ২৫ বছর (৭৫৯ জন) এবং ২৬ থেকে ৩০ বছর (৭৩২ জন) বয়সিরা।
জুনেই ভয়াবহ লাফ
বছরের প্রথম পাঁচ মাস (জানুয়ারি থেকে মে) পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুন মাসে এসে ডেঙ্গু আক্রান্ত যেন লাফ দিয়ে বেড়েছে। আগের মাসগুলোতে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৭০০-এর ঘরে সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে কেবল জুন মাসেই রেকর্ড ২ হাজার ৭২৭ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ১৩ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এর আগে গত শুক্রবার (২৬ জুন) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানান, ঢাকা ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা এখন অত্যন্ত উদ্বেগজনক (অ্যালার্মিং) অবস্থায় রয়েছে। পরশু আমরা সাতটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে একটি রেস্টুরেন্টসহ তিনটি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছি। এমনকি ঢাকা দক্ষিণেরও প্রায় অর্ধেক বাসাবাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে। বহুতল ভবনের বেসমেন্ট ও সরকারি কোয়ার্টারগুলোর অবস্থা আরও ভয়াবহ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সচেতনতা বাড়াতে লিফলেট বিতরণ করছি এবং যেসব বাড়িতে লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে সতর্কতামূলক স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তবে বারবার সতর্ক করার পরও নির্মাণাধীন যেসব ভবনে লার্ভা মিলছে, তাদের আমরা আর্থিক জরিমানা করছি এবং অনাদায়ে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে।’
সাংবাদিকদের মাধ্যমে নগরবাসীর উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মূল উদ্দেশ্য কাউকে জরিমানা বা জেল দেওয়া নয়, বরং মানুষের জীবন বাঁচানো। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তা আপনাদের মাধ্যমে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে।’
মীর শাহে আলম উল্লেখ করেন, সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নিয়মিত সরকারি অভিযান চললেও এটি সফল করতে নগরবাসীর সক্রিয় অংশগ্রহণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর সঙ্গে প্রতিটি পরিবার ও সন্তানের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি সরাসরি জড়িত।
তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাড়ির ছাদ, আঙিনা, বেসমেন্ট, ফুলের টব, ডাবের খোসা, রঙের কৌটা, পুরোনো টায়ার বা যে কোনো পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে। প্রতি তিন দিন পরপর জমে থাকা পানি ফেলে দিতে হবে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিয়মিত বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা না ফেলারও আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিমন্ত্রী জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আঞ্চলিক ও ওয়ার্ড কার্যালয়গুলো থেকে বিনামূল্যে মশার লার্ভা ধ্বংসকারী ট্যাবলেট সংগ্রহ করা যাবে। নাগরিকদের নিজ উদ্যোগে এসব ট্যাবলেট ব্যবহার করে জমে থাকা পানিতে লার্ভা ধ্বংসের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি গণমাধ্যমের প্রতি ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক প্রচার জোরদারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশকে (রিহ্যাব) নির্মাণাধীন ও আবাসিক ভবনগুলোতে পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সদস্যদের নোটিশ দেওয়ার অনুরোধ করেন।






