প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখার অভ্যাসে মিলতে পারে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখার অভ্যাসে মিলতে পারে যেসব স্বাস্থ্য উপকারিতা
গবেষণা বলছে, প্রকৃতিই সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে মানুষকে। ছবি : সংগৃহীত

একটি দিনের শেষ মুহূর্ত। পশ্চিম আকাশ ধীরে ধীরে সোনালি, কমলা আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে উঠছে। ব্যস্ততা থেমে যায়, কথাবার্তা কমে আসে, অনেকেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য উপভোগ করেন। মনে হয়, সারা দিনের ক্লান্তি যেন একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

অনেকেই সূর্যাস্ত দেখতে ভালোবাসেন শুধুই এর সৌন্দর্যের জন্য। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এই কয়েক মিনিটের অভিজ্ঞতা শুধু মন ভালো করে না, বরং মস্তিষ্ক, ঘুম, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় দেখার অভ্যাস মানুষের উদ্বেগ কমাতে, মনকে শান্ত রাখতে এবং জীবনকে অন্যভাবে দেখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

সূর্যাস্ত কেন এত গভীর অনুভূতি তৈরি করে?

কখনো নিশ্চয়ই এমন হয়েছে, সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে নিজের সব দুশ্চিন্তা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গেছেন। মনোবিজ্ঞানীরা এই অনুভূতির একটি নাম দিয়েছেন। সেটি হলো ‘অ’ (Awe) যার অর্থ বিস্ময়বোধ।

‘অ’ বলতে এমন এক অনুভূতিকে বোঝায়, যখন মানুষ এমন কোনো বিশাল, সুন্দর বা অসাধারণ দৃশ্যের মুখোমুখি হয়, যা তাকে মুহূর্তের জন্য অভিভূত করে দেয়।

এটি হতে পারে পাহাড়, সমুদ্র, তারাভরা আকাশ, অসাধারণ কোনো শিল্পকর্ম কিংবা সূর্যাস্তের মতো প্রাকৃতিক দৃশ্য।

যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং দীর্ঘদিন ধরে ‘অ’ (awe) অনুভূতি নিয়ে গবেষণা করা অধ্যাপক মিশেল শিওটা বলেন, ‘অ’ অনুভব করার সময় মানুষ নিজের সমস্যাগুলোকে তুলনামূলক ছোট বলে মনে করতে শুরু করে। এতে মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায় এবং জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা সহজ হয়।

তার মতে, মানুষ যখন নিজের চিন্তার ভেতর আটকে থাকে, তখন উদ্বেগ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। কিন্তু সূর্যাস্তের মতো মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সেই চিন্তার চক্র ভেঙে মানুষকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনে।

প্রকৃতিই সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে মানুষকে

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ বিভিন্ন কারণে ‘অ’ অনুভব করতে পারে। ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, সংগীত, শিল্প কিংবা অসাধারণ কোনো মানবিক কাজ থেকেও এই অনুভূতি আসতে পারে।

তবে জরিপে সবচেয়ে বেশি মানুষ জানিয়েছেন, প্রকৃতির সৌন্দর্যই তাদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করে।

২০২৩ সালের একটি গবেষণায় আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষের ওপর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি দেখিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত সবচেয়ে বেশি বিস্ময় জাগানো দৃশ্য হিসেবে উঠে আসে।

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান গবেষক জেনিফার স্টেলার বলেন, সূর্যাস্তের সৌন্দর্য মানুষকে চারপাশে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেয়। আকাশের বিশালতা এবং রঙের পরিবর্তন এমন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা সহজেই মানুষের মধ্যে গভীর বিস্ময় সৃষ্টি করে।

স্মৃতিশক্তিও বাড়তে পারে

শুধু মন ভালো করাই নয়, সূর্যাস্তের মতো বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা মস্তিষ্কের কাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের তিনটি ভিডিও দেখানো হয়। এর মধ্যে একটি ছিল বিজ্ঞানভিত্তিক এমন একটি ভিডিও, যা মানুষের মধ্যে অ অনুভূতি তৈরি করে।

ভিডিও দেখার পর তাদের একটি গল্প শোনানো হয় এবং পরে সেই গল্পের বিভিন্ন তথ্য মনে করতে বলা হয়। যারা বিস্ময় জাগানো ভিডিওটি দেখেছিলেন, তারা অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি তথ্য সঠিকভাবে মনে রাখতে পেরেছিলেন।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এমন অভিজ্ঞতা মানুষের মনোযোগকে পুরোপুরি বর্তমানের দিকে নিয়ে আসে। ফলে নতুন তথ্যও ভালোভাবে মনে থাকে।

নিয়মিত সূর্যাস্ত দেখলে মানসিক স্বাস্থ্যের উপকার হতে পারে

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত অ অনুভব করা মানুষের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। কোভিড মহামারির সময় পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, যারা নিয়মিত এমন অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করেছেন, তাদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তুলনামূলক কম ছিল।

আরেকটি গবেষণায় বয়স্ক একদল মানুষকে প্রতি সপ্তাহে ছোট ছোট হাঁটার সময় প্রকৃতির এমন দৃশ্য খুঁজে বের করতে বলা হয়, যা তাদের বিস্মিত করতে পারে। আট সপ্তাহ পর দেখা যায়, তারা নিজেদের অনুভূতি বর্ণনা করার সময় নিজের কথা কম বলেছেন, বরং চারপাশের প্রকৃতি নিয়ে বেশি কথা বলেছেন।

গবেষকরা তাদের তোলা ছবিও বিশ্লেষণ করেন। দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের চেয়ে চারপাশের প্রকৃতিকেই ছবিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

মানুষকে আরও সহানুভূতিশীল করে তুলতে পারে

‘অ’ অনুভূতির আরেকটি মজার দিক হলো, এটি মানুষকে অন্যের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল করে তুলতে পারে।

একটি গবেষণায় কিছু শিক্ষার্থীকে বিশাল ইউক্যালিপটাস গাছের দিকে তাকাতে বলা হয়। অন্য একটি দলকে একটি ভবনের দিকে তাকাতে বলা হয়। পরে একজন গবেষক ইচ্ছা করে অনেকগুলো কলম মাটিতে ফেলে দেন।

যারা বিশাল গাছ দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন, তারা অন্য দলের তুলনায় অনেক বেশি কলম কুড়িয়ে দিতে এগিয়ে আসেন। গবেষকদের মতে, যখন মানুষ নিজের চেয়ে অনেক বড় ও সুন্দর কিছু দেখে, তখন অন্যদের সাহায্য করার প্রবণতাও বাড়তে পারে।

শরীরের প্রদাহও কমতে পারে

জেনিফার স্টেলারের আরেকটি গবেষণায় ২০০ জন মানুষের ওপর পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। যারা নিয়মিত আনন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অ অনুভব করতেন, তাদের শরীরে সাইটোকাইন নামের প্রদাহের সূচক তুলনামূলক কম পাওয়া যায়।

উচ্চ মাত্রার সাইটোকাইন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও জানা যায়নি, গবেষকদের ধারণা, মানসিক চাপ কমে যাওয়া এবং অন্যদের সঙ্গে সংযোগের অনুভূতি বাড়ার কারণেই এমনটা হতে পারে।

সূর্যাস্ত ভালো ঘুমেও সাহায্য করতে পারে

শুধু মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নয়, সূর্যাস্ত শরীরের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গেও জড়িত। দিনের আলো থেকে রাতের অন্ধকারে পরিবর্তন শরীরকে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে সংকেত দেয়। এই পরিবর্তনের ফলে মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্রন্থি মেলাটোনিন নামের হরমোন তৈরি করতে শুরু করে, যা ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে দিনের আলো শরীরে কর্টিসল তৈরি করে, যা মানুষকে সতেজ ও কর্মক্ষম রাখে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের আইকাহন স্কুল অব মেডিসিনের আলো ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক মারিয়ানা ফিগেইরো বলেন, শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা প্রাকৃতিক জৈবিক ঘড়ির ভারসাম্য নষ্ট হলে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে।

তার মতে, নিয়মিত সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আলো দেখা শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে থাকতে সাহায্য করে।

কৃত্রিম আলো কেন সমস্যা তৈরি করে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর অতিরিক্ত মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের নীল আলো ব্যবহার করলে শরীর বিভ্রান্ত হয়ে যায়। ফলে মেলাটোনিন উৎপাদন কমে যেতে পারে এবং কর্টিসলের মাত্রা অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেড়ে যেতে পারে।

দীর্ঘদিন এমন হলে ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তবে ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের আলোর মতো রঙ তৈরি করতে পারে এমন বিশেষ এলইডি আলোও কিছু ক্ষেত্রে শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখতে সহায়তা করতে পারে।

ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ সবার হয়তো হয় না। তবু সপ্তাহে কয়েক দিন হলেও যদি কিছু সময়ের জন্য খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দিনের শেষ আলোটুকু উপভোগ করা যায়, তাহলে তা শুধু চোখের জন্য নয়, মন ও শরীরের জন্যও উপকারী হতে পারে।

গবেষণা বলছে, সূর্যাস্তের কয়েক মিনিটের নীরব সৌন্দর্য উদ্বেগ কমাতে, মনকে শান্ত রাখতে, স্মৃতিশক্তি বাড়াতে, ভালো ঘুমে সাহায্য করতে এবং অন্যের প্রতি সহমর্মিতা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

হয়তো তাই প্রকৃতির এই প্রতিদিনের বিদায়বেলাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যস্ততার মাঝেও একটু থেমে চারপাশের সৌন্দর্য দেখার মূল্য কতটা।

সূত্র: বিবিসি