২৫ টাকায় রাবি শিক্ষার্থীদের প্রিয় খাবার মানিক মামার ‘সিস্টেম’

সবজির বাজারে আগুন, ডিমের দামে টানাপড়েন- এমন সময়ে এক প্লেট ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, অর্ধেক সিদ্ধ ডিম, পটলভাজি, মশলাদার আলু ভর্তা, মচমচে আলু ভাজি আর টাটকা শাক ভাজি মাত্র ২৫ টাকায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে এই অবিশ্বাস্য খাবারের নাম ‘সিস্টেম’।
বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন স্টেশন বাজারে হোটেল ব্যবসায়ী মানিক মিয়ার ‘হোটেল মাদারীপুর’-এ মিলছে এই অভাবনীয় খাবারের আয়োজন। শিক্ষার্থীরা তাকে মানিক মামা বলে ডাকেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সময় এটি রাবি শিক্ষার্থীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ।
দামে কম হলেও খাবারের মান নিয়ে শিক্ষার্থীদের রয়েছে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা। ফলে সকাল ও দুপুরে খাবারের সময় হোটেলটিতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের ভিড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘সিস্টেম’ নামে পরিচিত এই খাবারের আসল নাম ‘সিক্স আইটেম’। ছয়টি আইটেম দিয়ে খাবার পরিবেশন করা হয় বলেই মুখে মুখে এটি ‘সিস্টেম’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।

জানা গেছে, ‘সিস্টেম’-এর উদ্যোক্তা হোটেল ব্যবসায়ী মানিক মিয়া ছোটবেলায় জীবিকার সন্ধানে কুমিল্লার লাকসাম থেকে রাজশাহীতে যান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন মেহেরচণ্ডী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। বর্তমানে তার বয়স প্রায় ষাটের কোঠায়। একসময় রিকশা চালালেও প্রায় ৩৬ বছর ধরে হোটেল মাদারীপুরের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
মানিক মিয়ার সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, প্রায় ২৬ বছর ধরে হোটেল মাদারীপুরে সিস্টেম চালু আছে। ২০ বছর আগে সিস্টেম মিলত মাত্র ৬ টাকায়। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে ৬ টাকা থেকে ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২৫ টাকা হয়েছে। ছয় পদের খাবারের মধ্যে রয়েছে এক প্লেট ভাত, অর্ধেক ডিম, পটলভাজি, আলুভর্তা, শাকভাজি ও আলুভাজি। ডাল অবশ্য সবার জন্য ফ্রি। দোকানে মাছ-মাংস থাকলেও শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় সিস্টেমের কদরই সবচেয়ে বেশি বলেও জানান তিনি।
হোটেলটির নামকরণ নিয়ে জানতে চাইলে মানিক মিয়া বলেন, আগে এই দোকানের যিনি মালিক ছিলেন তার বাড়ি ছিল মাদারীপুর। তিনি জেলার নামেই খাবারের দোকানের নাম রেখেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ দোকান চালু করা হয় বলেও জানান তিনি।
প্রতিদিন প্রায় ৫০০-এর অধিক সিস্টেম ও সব মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয় বলে জানান মানিক মিয়া। সিস্টেম ছাড়াও হোটেলে রয়েছে বাহারি রকমের মাছ ও মাংসের আইটেম।
স্টেশন বাজারে অবস্থিত হোটেল মাদারীপুরে সকাল ও দুপুরে পাওয়া যায় এই খাবার। রাতেও বিক্রি হয় খিচুড়িসহ নানান আইটেম। হোটেলটির পাশেই রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আবাসিক হল মাদার বখ্শ ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল। কিছুটা দূরে রয়েছে শহীদ শামসুজ্জোহা ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল। আবাসিক হলগুলোর কাছাকাছি হওয়ায় শিক্ষার্থীরা সহজেই সেখানে গিয়ে খাবার খেতে পারেন।
সিস্টেম খেতে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী প্রান্ত কুমার দাশ বলেন, আমি প্রথম বর্ষ থেকেই সিস্টেম খেয়ে আসছি। খুবই ভালো লাগে। দ্রব্য মূল্যের চড়া বাজারে ২৫ টাকার মধ্যে ৫-৬টা আইটেম দিয়ে খাবার পাওয়া কল্পনাও করা যায় না। হোটেলের খাবারের মান ও অনেক ভালো।
আরেক শিক্ষার্থী সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি এখানে সাড়ে তিন বছর যাবৎ খাচ্ছি। এখানের বিশেষত্ব হচ্ছে কম টাকায় অনেকগুলো আইটেম দিয়ে খাবার খাওয়া যায়। স্টুডেন্টদের অনেক খরচ থাকে, কম টাকায় যেখানে ভালো খাবার পাওয়া যায় সেখানেই খাই। ওনি দীর্ঘদিন যাবৎ এই সার্ভিস দিয়ে আসছেন। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী এখানে খেতে আসেন৷ খাবারের মানটাও ভালো।
দামের বিষয়ে মালিকের মানবিক দিক উল্লেখ তারিফুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, সিস্টেম মিল যেন অমাবস্যায় এক আলোর মশাল। ক্রমাগত দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির ফলে সবকিছু জনসাধারণের ক্রয়সীমা অতিক্রম করেছে। ঠিক এ সময় ২০-২৫ টাকায় তৃপ্তিমতো খাওয়া যায়। এটি তো আমাদের কাছে মানবিক বটেই, হোটেল মালিকদের জন্য অনুকরণীয়। রাবি শিক্ষার্থীদের গল্প-কথায় হোটেলটি যুগ যুগ ধরে স্মরিত হবে এবং হচ্ছেও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুজ্জোহা হলে থাকেন জুবাইর হোসেন। তিনি মাঝেমধ্যেই খেতে যান ওই হোটেলে। বলেন, এত কম দামে এমন খাবার রাজশাহীর অন্য কোথাও পাওয়া যাবে না। কম দাম হলেও খাবারটি বেশ তৃপ্তিদায়ক। তাই আমরা সবাই মিলে খাই।
